২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬ কার্তিক ১৪৩৩

আট মাসেও কাটেনি অস্থিরতা: জনমনে স্বস্তি ফেরানো জরুরি

মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ থেকে বিতর্কিতদের অপসারণের প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকট এখনও পিছু ছাড়েনি।

আট মাসেও কাটেনি অস্থিরতা: জনমনে স্বস্তি ফেরানো জরুরি

মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি পিআইডি

খায়রুল আনোয়ার খায়রুল আনোয়ার

Published : 21 Oct 2026, 03:23 PM

Updated : 21 Oct 2026, 03:24 PM

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর আট মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। পাঁচ বছর মেয়াদের সরকারের জন্য এই সময়টা একেবারে কম নয়। সরকারের শুরু থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনজীবনের নিরাপত্তা, জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতি, সংকুচিত হয়ে থাকা কাজের সুযোগ ইত্যাদি নিয়ে যেসব প্রশ্ন ছিল, দীর্ঘ আট মাস পরেও তা জারি আছে। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য অথবা নীরব চাঁদাবাজি, শিশু ও নারী ধর্ষণ ও হত্যা, অব্যাহত মব সন্ত্রাস, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার—এসব নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানুষ অনেক আশা ও আস্থা নিয়ে বিএনপিকে বিপুল ভোটে জয়ী করে। বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে এখন তাদের অনেকেই হতাশ। সরকারের প্রতি আস্থাতেও খানিকটা হলেও চিড় ধরেছে।

তবে অস্ত্র প্রদর্শন কাণ্ডে ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলার সিদ্ধান্ত যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এরকম আরও একটি সিদ্ধান্ত এর আগে প্রশংসিত হয়। গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার দায়ে দলের সংরক্ষিত নারী এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বলেন। এটি দলের সর্বস্তরের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন গত ১ অক্টোবর। আর অনেক বিতর্ক-সমালোচনার জন্ম দিয়ে এবং নাটকীয়তার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করলেন ১৯ অক্টোবর। দেখা যাচ্ছে, ১৮ দিনের ব্যবধানে সংরক্ষিত আসনের একজন নারী এমপি এবং একজন প্রতিমন্ত্রী তাদের পদ হারালেন। দুটি ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সময়োচিত ও সঠিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে দেশের বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে অনেক কিছু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পদত্যাগের ঘটনা দুটি তেমন বড় কোনো ইস্যু নয়।

আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকার এখনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ এবং তথ্য-পরিসংখ্যান পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা প্রমাণ করবে। শুধু গত মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্দলীয় সংঘর্ষে চারজন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। মব সন্ত্রাসের ৩৫টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত নয়জন এবং আহত হয়েছেন ৩২ জন। সেপ্টেম্বরে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাসন্তান নির্যাতনের শিকার হয়েছে; এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএস) তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দৈনিক সমকাল ৪ অক্টোবর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়ে নদী, খাল ও জঙ্গল থেকে ৬৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৩৫ জন সাংবাদিক।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ একটি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেলের নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। এছাড়া তিনি 'ডিটেকটিভ আর্টিকেল' নামে ফেইসবুক পেজে নানা অনিয়ম ও অপরাধ বিষয়ে লিখতেন এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন।

অপরাধের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, আরও কিছু পরিসংখ্যান থেকে তা স্পষ্ট হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত আট মাসে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে ৫০টি থানায় ১০ হাজার ৯০৫টি মামলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে থানাগুলোতে ১৬৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই এই চিত্র নয়, বিভিন্ন জেলায় খুনাখুনি, ধর্ষণের ঘটনা যেন বেড়েই চলছে। গত ১৮ অক্টোবর দৈনিক সমকালের শেষের পাতায় প্রধান শিরোনাম: 'কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ খুন, ১৩৯ ধর্ষণ। এছাড়া ২৩২টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৪টি অপহরণ এবং ৩৬টি ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়।'

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার

মাদকের নেশা সারাদেশে বিরাটসংখ্যক মানুষকে গ্রাস করছে। তারা এমনভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, এর নিরাময় দূরে থাক, বরং দিন দিন এর বিস্তার ঘটে চলেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সারাদেশের মহানগর, জেলা শহর, গ্রাম-গঞ্জে মাদকের নীল দংশনের শিকার কত যে মানুষ, তার পরিসংখ্যান হয়তো কোথাও নেই। এ যেন মরণব্যাধি ক্যান্সারের শেষ ধাপের মতো ছড়িয়ে পড়া। মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে শত শত কোটি টাকার মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সিন্ডিকেটের হোতাদের মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও থাকেন। যেমন—স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজারের একজন সংসদ সদস্য, যিনি 'বদি' নামেই ব্যাপক পরিচিত ছিলেন; তাঁকে মাদক কারবারের গডফাদার হিসেবেই সবাই জানত। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন গডফাদার কারা?

সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যে প্রকাশ করা হয় যে, মিয়ানমার থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে আসা ইয়াবার রুটকে বৃহত্তর 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল' মাদক পাচার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পথে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলের উৎপাদন কেন্দ্র থেকে মাদক সরাসরি ঢাকার বাজারে প্রবেশ করে। গবেষণার মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। এই রুটগুলো হচ্ছে—পাকিস্তানের লাহোর-ওয়াগা-পাটনা (ভারত)-বাংলাদেশ; ভারত, মিজোরাম-মেঘালয়-বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার-টেকনাফ-ঢাকা। বিদেশের কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীর করা গবেষণা নিয়ে এই বিষয়ে ৩ অক্টোবর দৈনিক সমকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে যেখানে সাঁড়াশি অভিযান এবং নেপথ্যের গডফাদারদের ধরা দরকার, সেখানে সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গেছে, তাতে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে কোনো ফল পাওয়া যাবে না।

এলোমেলো আরও অনেক কিছু

এলপিজির বাজার মাঝেমধ্যেই অস্থির হয়ে উঠছে। দাম বাড়িয়েও সংকট কাটছে না; নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়। মাসখানেক ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও হতে দেখা গেছে। সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, ডিলার নিয়োগের তদবিরে নেমেছেন অনেক এমপি। ইতিমধ্যেই কৃষিমন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে দেখা করেছেন অর্ধশতাধিক এমপি। কৃষিমন্ত্রী সুপারিশের চাপে বিব্রত। দৈনিক সমকালের (১ অক্টোবরের) প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক এলাকায় টাকা লেনদেন, বিভিন্ন জেলায় বাছাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সংবাদপত্রে ১২ অক্টোবর প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্য: বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতা, এমপিদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও আত্মীয়রা ডিলারশিপ পেয়েছেন। দলের প্যাডে দেওয়া তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকার নামেও রয়েছে মিল। জেলা থেকে পাঠানো তালিকা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কর্মসংস্থানেও নেই কোনো সুখবর

নির্বাচনে আসার আগে বিএনপি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিবছর ২০ লাখ চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। সরকারের আট মাসে কত লাখ চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। একথা ঠিক যে, সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সীমিত; মূলত কর্মসংস্থানের প্রধান খাত হচ্ছে বেসরকারি খাত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলে এবং দেশে স্থিতিশীলতা থাকলেই কর্মসংস্থানের দ্বার ভালোভাবে উন্মোচিত হয়। এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আইএমএফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

এসব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, আট মাসে সরকার জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ক্ষেত্রেই সফলতা দেখাতে পারেনি। এমন কোনো বড় কাজ করে দেখাতে পারেনি, যা জনগণের দ্বারা সমাদৃত হতে পারে। ফলে মানুষ হতাশ হচ্ছে, একই সঙ্গে আস্থাও হারিয়ে ফেলছে—যা সরকারের জন্য এক ধরনের অশনি সংকেত। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যা সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচিত হবে। এখন দেখার বিষয়, সামনের দিনগুলোতে কোন পথে হাঁটবে সরকার।

খায়রুল আনোয়ার: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: khairulmukul7@gmail.com