Published : 30 Aug 2026, 01:21 PM
বিশ্ব পুঁজিবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রের ধারণাটি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। অবশ্য সমাজতন্ত্র সেখানে নতুন কোনো শব্দ নয়; বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অর্থাৎ ১৯২৬ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ইউজিন ডেবস ছিলেন সেখানকার অত্যন্ত জনপ্রিয় কমিউনিস্ট নেতা। তবে এখনকার সমাজতান্ত্রিকরা ডেবসকে গভীর সম্মান করলেও নিজেদের কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দেন না; তারা নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’ বলে থাকেন। তাদের শত্রুদের কাছে অবশ্য তারা কমিউনিস্টই।
এসব গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের কাছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়নের জন্য যিনি লড়াই করেছিলেন। সেই প্রতিযোগিতায় তিনি হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে গেলেও সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রগতিশীল রাজনীতিতে শক্তিশালী আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তার নেতৃত্বের গুণে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) ছত্রছায়ায় জড়ো হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একঝাঁক শক্তিশালী তরুণ-তরুণী, যারা ভোটের রাজনীতিতে হারিয়ে দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠিত বাঘা বাঘা নেতাদের। এই নতুন শক্তির মধ্যে আছেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেস, ইলহান ওমর, রাশিদা তলাইব, কোরি বুশ ও জোহরান মামদানির মতো নেতানেত্রীরা। মিশিগানের আব্দুল আল-সাইয়েদ তাদের মাঝে তারকাতুল্য আরেকজন।
এবার মিশিগান থেকে সেনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র হওয়ার পর দেশটির প্রগতিশীল রাজনীতিতে এটি সবচেয়ে বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত। তবে এবারও মামদানির মতোই আল-সাইয়েদকেও মুখোমুখি হতে হয়েছে বিরাট প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির, যার অর্থ জোগান এসেছে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এইপ্যাক) থেকে। এছাড়াও আল-সাইয়েদকে মোকাবিলা করতে হয়েছে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের আক্রমণ। মামদানির মতো তাকেও তার মুসলিম নাম নিয়ে নানারকম বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে; তাকেও প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে ‘ইহুদি-বিদ্বেষী মুসলিম’ ও ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে। এসব বিপুল বাধাকে অতিক্রম করেই তাকে ছিনিয়ে নিতে হয়েছে ডেমোক্র্যাট পার্টির মনোনয়ন।
তার বাবা মিসরীয়। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ও বেড়ে উঠেছেন মিশিগানে। চিকিৎসক হিসেবে তিনি ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের পরিচালক। নিজের পরিচয় তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবেই দেন, সমাজতন্ত্রী হিসেবে নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতন্ত্রীদের পরিকল্পনা ও দাবিদাওয়ার সঙ্গে তার একাত্মতা স্পষ্ট। নিজের অবস্থান, পরিচয় ও মতামত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরতে তিনি দ্বিধাহীন। আগামী নভেম্বরের সেনেট নির্বাচনে জিতলে সাইয়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেনেটর। এই সম্ভাবনায় রীতিমতো বেকায়দায় পড়ে গেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রধান নেতৃত্ব আর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানরা। এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক মেহেদি হাসান একে ‘প্রায় ঐতিহাসিক’ বললেও বার্নি স্যান্ডার্স একে নির্দ্বিধায় ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেন।
এই বিজয় ছিনিয়ে নিতে তাকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরের ও বাইরের উভয় প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। পার্টির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব আল-সায়েইদের মতো বামপন্থি প্রার্থীদের নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছে, যাদের সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বের পার্থক্য নামমাত্র। এর বাইরে তাকে লড়তে হয়েছে এইপ্যাকের বিপুল আর্থিক বিনিয়োগের বিরুদ্ধে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসওম্যান হেলি স্টিভেনসকে সমর্থন করেছে ইসরায়েলি লবি এইপ্যাক, যা এই নির্বাচনে ব্যয় করেছে ৩ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ৭ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে স্টিভেনসের নির্বাচনে। অন্যদিকে সাইয়েদের নির্বাচনে অর্থ ব্যয় হয়েছে এর ১১ ভাগের এক ভাগ। এই বিপুল কালো টাকার পাহাড়ের বিরুদ্ধে লড়ে আল-সাইয়েদ পেয়েছেন ৪৮.৫ শতাংশ ভোট, যেখানে স্টিভেনস পেয়েছেন ৪৭.৫ শতাংশ।
ভোটের হিসাবের বাইরেও এই নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা গাজায় সংঘটিত ইসরায়েলি গণহত্যায় সরাসরি মার্কিন সমর্থনের বিষয়টি ছিল নির্বাচনি প্রচারণার কেন্দ্রীয় বিষয়। ‘দ্য জর্ডান টাইমস’-এ জেমস জে. জোগবি লিখেছেন (আল-সাইয়েদ’স উইন ইন মিশিগান ইজ দ্য মোস্ট কনসিকুয়েনশাল ইলেকশন দিস ইয়ার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬): “এই প্রথমবারের মতো গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা ও ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সহায়তা দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য নির্বাচনি প্রতিযোগিতায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে, তবে এই সেনেট নির্বাচনটি ছিল আলাদা। এবার প্রতিদিন আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইসরায়েল রাষ্ট্রকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, যা ফিলিস্তিনি ও লেবাননিদের বিপুল প্রাণহানি ঘটিয়েছে। এই ফল থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইসরায়েল ও ইসরায়েল-সমর্থক প্রার্থী চারবারের কংগ্রেসসদস্য হেলি স্টিভেনস উভয়েই পরাজিত।”
এরপর ১৮ অগাস্ট আবার ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন ছিনিয়ে নিলেন কৃষ্ণাঙ্গ নেত্রী অ্যাঞ্জি নিক্সন। তাকেও একই রকম এক হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনের বিষয়টি তারও নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয় ছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী করপোরেট-সমর্থিত আলেকজান্ডার ভিন্ডম্যান ১৬ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও নিক্সনের কাছে হেরেছেন ১০ পয়েন্টের ব্যবধানে। নিক্সনকে সমর্থন করেছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স, ইলহান ওমর, রাশিদা তলাইবসহ প্রগতিশীল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা।
ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের প্রচারণা হচ্ছে—তারা আমেরিকাকে কমিউনিস্ট দেশে পরিণত করবেন। আবার আল-সাইয়েদের বিজয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সতর্কতা হচ্ছে—একজন মুসলমান যেন শেষ পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে না যান! প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তো আল-সাইয়েদের নাম বিকৃত না করে উচ্চারণই করতে পারেন না। তার ভাইস প্রেসিডেন্ট, যিনি ২০২৮ সালে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশী, সম্প্রতি বলেছেন: “এভাবে চললে—ঈশ্বর না করুন—আপনারা তিন বছরের মধ্যে আল-সাইয়েদকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাবেন।”
দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় গোষ্ঠিরর নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি ডিএসএ-র প্রার্থীদের সম্পর্কে নানারকম মিথ্যাচার ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ তারা কেউই কমিউনিস্ট নন, কিংবা কেউ জিহাদিও নন। তারা বলছেন সর্বজনীন স্বাস্থ্য অধিকার, বাসস্থানের অধিকার ও শিশু অধিকারের কথা। তারা বলছেন শ্রমজীবী মানুষের মনের কথা, আর তৃণমূলের মানুষ তা শুনছেনও। এটাই প্রতিপক্ষের গা জ্বালার মূল কারণ।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে নিক পপলি লিখেছেন: “এক দশক আগে যে আন্দোলনের সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার, তাদের এই পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। বার্নি স্যান্ডার্স লক্ষ লক্ষ আমেরিকানের কাছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কথা স্পষ্ট করেছেন; এওসি (আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেস) একে দিয়েছেন জাতীয় তারুণ্যের রূপ; মামদানি দেখিয়েছেন যে একজন সমাজতন্ত্রী কায়েমী স্বার্থবাদীদের পরাজিত করতে পারেন, দেশের প্রধান একটি নগর চালাতে পারেন এবং আরও সমাজতন্ত্রীদের নির্বাচিত হতে সাহায্য করতে পারেন। এখন মধ্যমেয়াদি নির্বাচন যখন সামনে, প্রশ্ন হচ্ছে এই মডেল তাদেরকে কতদূর নিয়ে যেতে পারবে।”
এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে স্যান্ডার্স, এওসি, ওমর, রাশিদা, মামদানি, কোরি বুশ, সাইয়েদ, নিক্সন প্রমুখের রাজনীতির ভবিষ্যৎ; সেই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিকল্পনায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভবিষ্যৎ।
আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com