১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

গুম প্রতিরোধে আইন, কিন্তু তদন্ত করবে কে?

অভিযুক্ত সংস্থাই যদি করে গুমের তদন্ত, তবে নিরপেক্ষতা মিলবে কতটুকু? গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

গুম প্রতিরোধে আইন, কিন্তু তদন্ত করবে কে?
আইন যেন কেবল কাগজের দলিল না হয়; ‘আমার স্বজন কোথায়’—এই বুকভাঙা অপেক্ষার অবসান ঘটুক চিরতরে। ফাইল ছবি

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

Published : 20 Aug 2026, 05:42 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন কিংবা নীরব সম্মতির মাধ্যমে তুলে নেওয়ার পর তার অবস্থান বা ভাগ্য সম্পর্কে তথ্য গোপন রাখা শুধু তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে তার পরিবারকে অনিশ্চয়তা, ভয় ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুমকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশ এখন আর এই বাস্তবতা অস্বীকার করার অবস্থানে নেই। বরং ২০২৪ সালের ৩০ অগাস্ট বাংলাদেশ ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ (International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। এর ফলে গুম প্রতিরোধ, প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু একটি আইন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা ভুক্তভোগীকে কার্যকর প্রতিকার দিতে পারে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রস্তাবিত আইনের কাঠামো কি সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছে?

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে গুমের অভিযোগের তদন্ত নিয়ে। খসড়ায় গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব মূলত পুলিশের ওপর রাখা হয়েছে। এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় গুমের অভিযোগের একটি বড় অংশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে উঠেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতেও বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের কথা এসেছে।

তাহলে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে, সেই অভিযোগের তদন্ত যদি আবার পুলিশের ওপরই ন্যস্ত হয়, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এখানে বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; এটি মূলত স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার হাতে থাকা প্রয়োজন, যার সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। কারণ তদন্ত শুধু মামলা রুজু বা সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয় নয়। গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা ও কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে শেষবার ভুক্তভোগীকে দেখেছে, কোন গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল, মোবাইল ফোনের অবস্থান কী ছিল, কোথায় সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, কোন কর্মকর্তা কী নির্দেশ দিয়েছিলেন—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

তদন্তের শুরুতেই যদি একটি নিরপেক্ষ সংস্থা ঘটনাটির নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনেক প্রমাণই অনেক সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে থাকে। ফলে এ ধরনের অভিযোগে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন আরও বেশি।

এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে—গুমের অভিযোগে পুলিশকে একমাত্র বা প্রধান তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ করার পরিবর্তে একটি স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা কেন রাখা হবে না?

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া যেত। বিশেষ করে প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনের জন্য আটকস্থল, কারাগার, হেফাজত কেন্দ্র এবং সম্ভাব্য গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রাখা হয়েছিল। নতুন খসড়ায় এসব ক্ষমতার কিছু অংশ বাদ পড়েছে বলে অংশীজনদের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি কার্যকর গুমবিরোধী আইনে শুধু অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান থাকলেই যথেষ্ট নয়। একজন মানুষ কোথায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য রাষ্ট্রের কী কী ক্ষমতা ও দায়িত্ব থাকবে, সেটিও আইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন।

খসড়া আইনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুক্তভোগীর পরিবার। গুমের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী শুধু নিখোঁজ ব্যক্তি নন; তার পরিবারও এই অপরাধের প্রত্যক্ষ শিকার। মা-বাবা জানেন না তার সন্তান বেঁচে আছেন কি না। স্ত্রী জানেন না তার স্বামী কোথায়। সন্তান জানে না তার বাবার কী হয়েছে। বছরের পর বছর এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করা কোনো সাধারণ মানসিক কষ্ট নয়। গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের আহাজারি, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তাই তদন্তের প্রতিটি পর্যায়ে পরিবারের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত করা, আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা বাধা না থাকার নিশ্চয়তা আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

প্রস্তাবিত আইনের আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবার দাবি রাখে—মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান। অভিযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইনের অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে এমন শাস্তির ভয় দেখানো হলে, যার কারণে তিনি অভিযোগ করতেই যদি ভয় পান, সেটি আইনের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।

একজন ব্যক্তি তার নিখোঁজ স্বজনের বিষয়ে থানায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে যদি আশঙ্কা করেন যে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকেই কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তাহলে অনেকেই হয়তো অভিযোগ করার সাহস পাবেন না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রাখা জরুরি—প্রমাণের অভাব আর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ এক বিষয় নয়। কোনো অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত না হওয়া মানেই অভিযোগকারী মিথ্যা বলেছেন—এমন ধারণা আইনের মধ্যে তৈরি করা উচিত নয়। কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে করা মিথ্যা অভিযোগ এবং সৎ বিশ্বাসে করা কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত না হওয়া অভিযোগকে একইভাবে দেখলে তা ভুক্তভোগীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

গুম প্রতিরোধ আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—এটি কি অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে পারবে? আইনটি এমন হতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি তার পদ, পরিচয় বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কারণে আইনের ঊর্ধ্বে না থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে গুম সংঘটিত হলে শুধু সরাসরি অপহরণকারী বা আটককারী ব্যক্তিকে দায়ী করলেই হবে না; নির্দেশদাতা, সহায়তাকারী এবং অপরাধ সম্পর্কে জেনেও তা প্রতিরোধে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ও যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

কারণ গুম সাধারণত একজন ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে সংঘটিত হয় না। এর পেছনে থাকতে পারে পরিকল্পনা, নির্দেশ, পরিবহন, আটক, তথ্য গোপন এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি ধামাচাপ দেওয়ার মতো একাধিক স্তর। আইনের তদন্ত কাঠামোকেও এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৪ সালে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেই একটি স্পষ্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটিও বাংলাদেশকে গুমের অভিযোগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে।

সুতরাং এখন প্রশ্ন শুধু একটি নতুন আইন হবে কি না—প্রশ্ন হলো, কী ধরনের আইন হবে। আমরা এমন একটি আইন চাই, যেখানে গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ; সেই কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও পরিদর্শনের ক্ষমতা থাকবে; ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে; অভিযোগ করার কারণে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার যাতে ভয় বা হয়রানির শিকার না হয়, তার নিশ্চয়তা থাকবে; এবং অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার প্রতি একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমার নিবেদন—গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটি যেন শুধু অতীতের অপরাধের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি না করে; একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে ‘আমার স্বজন কোথায়’—এই অসহনীয় প্রশ্ন নিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়, সেই নিশ্চয়তাও দেয়।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির মানবাধিকারকর্মী। ই-মেইল: aafk76@yahoo.com