Published : 22 Apr 2026, 11:14 AM
সরকার অবশেষে একে একে সব জ্বালানির দাম বাড়াল। প্রথমে বাড়িয়েছে জেট ফুয়েলের—বিমানের জ্বালানির; তারপর এলপি গ্যাসের; তারপর ফার্নেস অয়েলের; তারপর পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের। এখন খুব দ্রুতই বাড়াবে বিদ্যুতের দাম।
প্রশ্ন হচ্ছে, জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার নির্ধারিত দামেও কি ভোক্তারা সেটা ক্রয় করতে পারে? বা তার সুবিধা কি প্রান্তিক জনগণের কাছে যায়? সরকার কি সেটা নিশ্চিত করতে পারে? এই যে এক মাসে দুবার বোতলজাত এলপি গ্যাসের দাম বিপুল পরিমাণ বাড়ানো হলো, সরকার-নির্ধারিত সেই দামের চাইতে অনেক বেশি দামে ভোক্তারা তা কিনতে বাধ্য হচ্ছে। সেটা ঠেকাতে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ ও অপারগ। সরকারের প্রতিষ্ঠান বিইআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন—সবাই ব্যর্থ, অপারগ ও অনিচ্ছুক। কিন্তু কেন? কারণ, যারা ভোক্তাদের ওপর এই লুণ্ঠনমূলক মুনাফা চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক আঁতাত ও স্বার্থ যুক্ত আছে। তারা একই অলিগোপলির অংশীজন। অলিগোপলি হলো অর্থনীতির এমন একটি বাজার ব্যবস্থা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার বাজারে গুটিকয়েক বা অল্প সংখ্যক বড় বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকে। ফলে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখা যাচ্ছে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লুণ্ঠনমূলক মুনাফাকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি জনগণকে ভুগিয়েছে বিপুল পরিমাণে, তার অন্যতম খাত হচ্ছে ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত’। এখানে আইন করে, সংসদকে দিয়ে, রাজনীতিবিদ-আমলাতন্ত্র-ব্যবসায়ীদের অসাধু চক্র তৈরি করে, পরিকল্পিত উপায়ে নীতি-বিধি-অনুশাসন দিয়ে লুণ্ঠনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সেই লুণ্ঠিত টাকা পাচার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্বেতপত্র কমিটি ও বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রিপোর্টও দিয়েছে। সেসব আমলে না নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসকের সেই অনুসৃত কাঠামোকে অবিকল রেখে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার একইভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পরিচালিত করছে। ফলে ফ্যাসিবাদী নীতির অনুকরণেই ভোক্তার ওপর জ্বালানি ও বিদ্যুতের বর্ধিত দাম চাপিয়ে দিচ্ছে এই সরকার। অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে ইরানে আমেরিকান আগ্রাসন। বলছে সেই ফ্যাসিবাদী জমানার মুনাফাখোর লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের সপক্ষে বারবার উচ্চারিত নীতির কথা—যে নীতিতে আওড়ানো হতো, ‘জ্বালানির বর্ধিত মূল্য সমন্বয় করতে, ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হচ্ছে।’
অথচ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে যে কারণে, সেই লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফার কাঠামোগত ফাঁকগুলোকে বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ সরকার নিচ্ছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব অপকর্মের সঙ্গী, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। ফ্যাসিবাদী লুণ্ঠনের দোসর যেসব ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানে বসে সেই পুরনো কাঠামোকেই সবল করছে, তাদেরও সরানো হচ্ছে না। তাদের অপকর্মের বা পাপের শাস্তির ব্যবস্থা করছে না সরকার। বরং তার বদলে অযাচিতভাবে দাম বাড়িয়ে ভোগাচ্ছে কেবল জনগণকে, প্রান্তিক মানুষকে। পেট্রোল পাম্পে, সেচের কৃষি জমিতে, নিত্যপণ্যের বাজারে মানুষের যে হাহাকার, ক্রন্দন ও কষ্ট, তাকে উপেক্ষা করে সংসদে বলা হচ্ছে এতে মানুষের সমস্যা হবে না। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা অত্যন্ত সামান্য।’ এতে নাকি মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাবও পড়বে না!
জ্বালানি সরবরাহে সংকট নেই, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি নেই—সরকার এ কথা বললেও বিদ্যুৎ সরবরাহে লোডশেডিং হচ্ছে বিপুলভাবেই। শহরের তুলনায় লোডশেডিং করা হচ্ছে গ্রামে বেশি। সেখানেও কাজ করছে বৈষম্য। এই লোডশেডিংকে কখনো কারিগরি ত্রুটি ও কখনো বিদ্যুতের ঘাটতি বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটা ঘটছে এই খাতের উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে যুক্ত ‘পাওয়ারফুল লবি’র কাঠামোগত স্বার্থ ও লুণ্ঠন অব্যাহত রাখার কারণেই। সরকারের বদল ঘটলেও এই কাঠামোর বদল ঘটেনি। এই খাতে সুবিধাভোগী অংশীজনদের নাম ও শেয়ার বদলেছে কেবল।
বিদ্যুতের এখন যা চাহিদা, উৎপাদন ক্ষমতা তার দ্বিগুণ। এর ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ছে, ভর্তুকি বাড়ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পরিশোধের দেনা বাড়ছে। বিদ্যুতের আমদানিও বাড়ছে। সরকারের শুল্ক, কর ও মুনাফা বাড়ছে; কিন্তু বিপদে পড়ছে ভোক্তা আর দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানির উৎপাদন সক্ষমতা। নির্বাচিত নতুন সরকার এই অচলায়তন ভাঙার বদলে তার ওপরেই সওয়ার হয়েছে। সরকার সম্ভবত জ্বালানি খাতে বেসরকারি খাতের মুনাফা নিশ্চিত করার জামিনদার হিসেবে কাজ করার পুরনো কাঠামোতেই স্বস্তি পাচ্ছে। জনকল্যাণের পথ ছেড়ে বেসরকারি খাতের মুনাফার ঠিকাদার হিসেবে কাজ করাকে সরকার অর্থনীতির বিকাশ হিসেবে দেখছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতেও জনদুর্ভোগকে ‘সামান্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার সপক্ষে মন্ত্রীরা নানা বয়ান উৎপাদন করছেন।
এর ফলাফল হচ্ছে জনসমস্যার সমাধানের বদলে সংকটকে আরও গভীর করে তোলা। কাঠামোগত বিপদকে আরও শক্তিশালী করে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেক্ষেত্রে বাড়তি প্রেরণা হতে পারে। দ্রুতই তাই জনপ্রত্যাশাভঙ্গকারী পদক্ষেপের প্রতি সরকারের আগ্রহী হয়ে ওঠার বিপদ দেখা দিতে পারে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদনের নামে সরকারের চোখ পড়তে পারে দেশের মাটির নিচের কয়লায়। দ্রুত সরকার কয়লা তুলতে চাইতে পারে। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা তোলার ন্যারেটিভ বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারে দ্রুতই।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদের এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তর ও দক্ষিণাংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা), নওগাঁ ও জয়পুরহাটজুড়ে বিস্তৃত জামালগঞ্জ কয়লাখনির উত্তর-পশ্চিমাংশের ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং রংপুরের খালাসপীর কয়লাখনির ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুরের দিঘীপাড়া কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বোঝা যাচ্ছে, কয়লার ব্যাপারে সরকার বেশ পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে। কিন্তু কয়লা তোলার বিপদ আর কেউ টের পাক আর না পাক, বিএনপি সরকারের তা জানার কথা। ফুলবাড়িতে এশিয়া এনার্জির মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার প্রতিবাদে মানুষ হত্যা এবং তার পরের পরিস্থিতির কথা হয়তো ইতিহাসের অংশ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেটা ঘটেছিল ২০০৬ সালের ২৬ অগাস্ট। সেবারও বিএনপি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনসম্মতিকে অগ্রাহ্য করে সংসদীয় গরিষ্ঠতা দিয়ে মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। আবার বিদ্যুতের দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে জনবিদ্রোহে। এই দুটো জনবিদ্রোহে জনগণের আকুতি তৎকালীন সরকার শুনতে ব্যর্থ হয়েছিল বলেই ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। দেশের রাজনীতিতেও তার প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি পুরনো পথেই হাঁটবে? জনদুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ নিতে কি কাঠামোগত সংস্কারে হাত দেবে? সরকার কি জনগণের স্বার্থ দেখবে, নাকি লুণ্ঠনকারী গংদের পাশে দাঁড়াবে? সরকারের জন্য সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
এই কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটতে গেলে সরকারকে রাজনৈতিক সংস্কারের কথাও ভাবতে হবে। কেননা সরকারকেও জনবান্ধব হতে হবে। সেটা করতে গেলে সরকারের মেদ-ভুঁড়িও কমাতে হবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের ভাষায়, “ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। সংস্কারের পথে তারা নিজেরাই বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত। আর সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।” এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সচল না হলে কাজের কাজ কিছু হবে না। কেননা সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগ—এই কাঠামোগত দুর্বৃত্তায়িত ব্যবস্থারই ধারাবাহিক ফল এবং এর সমাধানও মূলত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক।
ইরানে মার্কিন আগ্রাসন জ্বালানি রাজনীতির যে নতুন ডাইমেনশন এনেছে, তার মূলকথা হচ্ছে—এই খাতে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা। জ্বালানি খাতের স্বনির্ভরতা আনতে হলে জ্বালানি অবিচার দূর করে জ্বালানি সুবিচার সুনিশ্চিত করতে হবে। সে কারণেই সরকারকে কাঠামোগত পরিবর্তনে হাত দিতে হবে। আবার এই খাতে স্বনির্ভরতা আনতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন যাতে জ্বালানি অবিচারের হাত থেকে বাঁচে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। ফলে জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মুক্তি নেই। রাজনৈতিক সরকারের জন্য এটা যেমন সুযোগ, তেমনি এই সংস্কারে অবহেলা করলে, তা বাইপাস করে পুরনো লুণ্ঠনমূলক কাঠামো দিয়ে চলতে চাইলে সেটা বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণও হতে পারে। সেদিকে তাই মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প নেই।