Published : 06 Sep 2026, 04:48 PM
চীন ক্রমশ নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাবাদের অন্যতম প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছে। বিশেষ করে, ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে চীন নিজেকে এই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের বাইরে রেখে একটি নিরপেক্ষ ‘একতরফাবাদ-বিরোধী শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে অধিক মাত্রায় সচেষ্ট হয়। আবার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে, চীন—রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি আরও ‘সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার’ প্রতিশ্রুতি সামনে নিয়ে আসে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চীন বিশ্বের অন্যান্য শক্তিকে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং একটি প্রকৃত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। শুধু চীন নয়, ধীরে ধীরে এই একতরফাবাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য অংশীদারও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে থাকে। অতিসম্প্রতি এ মাসের শুরুতে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফাবাদ’ মোকাবেলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এই বহুমেরুকেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাবাদের বিরুদ্ধে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, নতুন এই বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মতাদর্শিক ভিত্তি কী হবে, তা কারো কাছে স্পষ্ট নয়। ১৯৯১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটে এবং উৎপত্তি হয় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একতরফাবাদের। বর্তমানে বৈশ্বিক একতরফাবাদ মূলত একটি উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত—কারণ এই একতরফাবাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি বৈশ্বিক উদারনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ফলে, চীনের নেতৃত্বাধীন এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার মতাদর্শিক ভিত্তি কী হবে, সেই প্রশ্ন সর্বপ্রথম সামনে আসে। কারণ এই জোটের অন্যতম শক্তিশালী সম্ভাব্য অংশীদার হলো রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো কর্তৃত্ববাদী। তাই স্বভাবতই সম্পূরক প্রশ্ন আসে—এই সম্ভাব্য জোটের মূল উদ্দেশ্য কি একতরফাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, নাকি তারা একটি ‘প্রতিযোগিতামূলক বহুমেরুকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদের’ নতুন রূপকল্প নির্মাণ করতে চলেছে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফাবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অনানুষ্ঠানিক জোটটি মূলত তাদের কর্তৃত্ববাদী স্বার্থের ভিত্তিতে গঠিত। সম্প্রতি ‘সেইজ’ (SAGE) জার্নালে প্রকাশিত ‘রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের সময় কর্তৃত্ববাদী জোটের উত্থান এবং বৈশ্বিক শক্তির গতিশীলতার পরিবর্তন’ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সূচনা করে। ‘নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া’, ‘কূটনৈতিক সুরক্ষার জোগান দেওয়া’ ও ‘নির্বাচিত সামরিক-প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানের’ মতো নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থের সমন্বয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং নেটোর সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানের ভিত্তিতে দেশগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গড়ে তুলেছে, যা সামগ্রিক উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তবে, কর্তৃত্ববাদের যুক্তিতে চীনের নেতৃত্বাধীন এই অনানুষ্ঠানিক জোটের কার্যক্রমকে শুধু একটি ‘কর্তৃত্ববাদী প্রচারণা’ হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক একতরফাবাদ যে গণতান্ত্রিক ও সমতার পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেটি ইতিহাসে একটি অধরা সত্য হিসেবেই থেকে গেছে। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ এই উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থাকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। এই সামরিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি একতরফা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, গৌণ (সেকেন্ডারি) নিষেধাজ্ঞা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিজেদের প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি—এই একতরফাবাদের দার্শনিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে সমর্থন করে আসছে। একথা অনস্বীকার্য যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর কোনো একক দেশের কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। আবার একইভাবে এটিও সত্য যে, একতরফাবাদের বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী বহুমেরুকেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠাও সমাধান হতে পারে না। একতরফাবাদের প্রকৃত বিকল্প হলো বহুপক্ষীয়তা, যা উদারনৈতিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নয়; অর্থাৎ বহুমেরুকেন্দ্রিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহুপক্ষীয়তা তৈরি করে না। এজন্য প্রয়োজন একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দর্শন। অথচ চীনের নেতৃত্বাধীন এই অনানুষ্ঠানিক জোটের কোনো সদস্যেরই উদারনৈতিক রাজনীতি চর্চার ইতিহাস নেই। তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলেও, একই সঙ্গে নিজেরা অনেক ক্ষেত্রে অন্যের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার অধিকারে হস্তক্ষেপের দোষে দুষ্ট।
ফলে, এই রাষ্ট্রগুলো যদি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একতরফাবাদের বিরোধিতা করে এবং বহুত্ববাদের সমর্থন করে—তবে সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহুত্ববাদ অত্যন্ত সীমিত, বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক অধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং মুক্ত রাজনৈতিক জীবন ও তথ্যপ্রবাহের ওপর রাষ্ট্রের সরাসরি প্রভাব বিরাজমান। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে উদারনৈতিক রাজনীতি চর্চার পক্ষে নয়, সেই রাষ্ট্রগুলোর জোট কীভাবে উদারনৈতিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে? একই সঙ্গে সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে বলা যায়, যে রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে অভ্যস্ত, সেগুলো কি বহুমেরুকেন্দ্রিকতার রক্ষক হতে পারে?
উত্তর হতে পারে—চীন ও রাশিয়া অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মতামতের পক্ষে হলেও, দেশ দুটি অনেক উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে মূল ঝুঁকিটা এখানে নয়; মূল ঝুঁকি হলো এই দেশগুলোর নিজস্ব আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে শক্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা। চীনের যেমন প্রশান্ত মহাসাগর ও এশীয় অঞ্চলে প্রভাব রাখার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তেমনি রাশিয়ার ইউক্রেইনসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্ট। একইভাবে, ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের নেতা হওয়ার উচ্চবিলাস রয়েছে। এই আঞ্চলিক আধিপত্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফলে চীন বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি ভারত এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ ফিলিপাইনের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িত। এই দ্বন্দ্ব নিরসন না করলে চীনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাবাদের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা নেতৃত্ব দেওয়া অসম্ভব। একইভাবে, পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেনে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে রাশিয়া ইউরোপের অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির বিরাগভাজন হয়েছে। অন্যদিকে ইরান তার আগ্রাসী নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের অসন্তোষ অর্জন করেছে। তাই দেখা যায়, এই অনানুষ্ঠানিক জোটের প্রায় প্রতিটি শক্তি জটিল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে জড়িত। ফলে এই আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি না হলে এই দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
এছাড়াও, এই সম্ভাব্য জোটের কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলেও তাদের মধ্যে বৈশ্বিক বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে চিন্তাগত বিস্তর পার্থক্য রয়েছে—বিশেষ করে এই জোটের নেতৃত্বে থাকা চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব বৈশ্বিক দর্শনে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, চীন মূলত ‘ব্রিকস’ বা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’–এর মতো নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ তৈরির মাধ্যমে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরিতে বেশি সচেষ্ট; অন্যদিকে রাশিয়ার লক্ষ্য প্রচলিত প্রতিষ্ঠানে নিজেদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখা।
তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে আসে—একতরফাবাদের বিরুদ্ধে চীনের নেতৃত্বাধীন এই অনানুষ্ঠানিক জোটের লড়াই কি বিশ্বকে সত্যিকারের সমতাভিত্তিক ‘বহুত্ববাদের’ স্বাধীনতা প্রদান করবে, নাকি সেটি একটি ‘বহুমেরুকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থার’ জন্ম দেবে?
এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: toriqul38@gmail.com