১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আপত্তি’ উৎপাদনের কারখানাটি কোথায়?

আপত্তিবাদীরা পরিচিতই, কিন্তু তাদের পরিচয় আড়াল করে রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারের কোনো বক্তব্য নেই—এই নির্বাক অবস্থাই অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষ রাজনীতির অংশভাগী করে তুলেছে।

‘আপত্তি’ উৎপাদনের কারখানাটি কোথায়?
বন্ধ হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার সংঘাত; এটাই তৈরি করছে ‘আপত্তির কারখানা’।

জোবাইদা নাসরীন জোবাইদা নাসরীন

Published : 10 Oct 2025, 10:40 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:27 PM

ইতোমধ্যে এই খবরটি সংবাদমাধ্যম সূত্রে অনেকেই জেনে গেছেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর ‘শরৎ উৎসব’ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যদিও স্থগিত নাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবু চারুকলা অনুষদ যখন বন্ধ করে দেওয়ার খবরের সংশোধনী দিয়ে দাবি করেছে, বন্ধ নয়, স্থগিত করা হয়েছে, তখন ধরে নিতে পারি প্রায় দুই দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল যে উৎসবটি, সেটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। প্রকৃতির বন্দনা এবং ঋতুচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শরৎকে স্বাগত জানানোর আয়োজন ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। নিয়ম অনুযায়ী, অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আয়োজকরা সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনের অনুমতিও গ্রহণ করেছিল।

অনুষ্ঠানের আগের রাতে খবর পাওয়া গেল যে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; পরে জানতে পেলাম, এটি স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমে অনুষ্ঠান স্থগিতের কারণ হিসেবে বলেছেন, “সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসবের আয়োজকদের একজন 'ফ্যাসিবাদের দোসর'—এমন একটি অভিযোগের পর 'বিশৃঙ্খলা এড়াতে' আমরা শুক্রবারের জন্য যে বরাদ্দটি দিয়েছিলাম, তা স্থগিত করেছি।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী অনেক জায়গা থেকে ফোনে আপত্তি এসেছে; অনেকে বলেছেন, তারা ফ্যাসিবাদের দোসরদের অনুষ্ঠান করার সুযোগ দিচ্ছেন। তারা যদি এমনটা করেন, তাহলে গণ্ডগোল হবে। সেই কারণে তারা অনুষ্ঠান স্থগিতের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।

অধ্যাপক আজহারুলের কাছে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে—কারা এই ‘অনেক’? আজহারুল ইসলাম অবশ্য সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, “আমাদের কাছে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক সাংবাদিক ও শিল্পী সমাজ’ নামে একটি সংগঠন থেকে অভিযোগ করা হয়, শরৎ উৎসবের নামে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে’ পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্যই আপাতত স্থগিত করেছি।”

তবু কথা থেকে যায়। জানতে ইচ্ছে করে, তাদের বক্তব্য তিনি গ্রহণ করলেন নাকি মানতে বাধ্য হলেন? এই সমাজের পরিচয় ও যুক্তি স্পষ্ট করলে বিষয়টি সবার জন্য আরও বোধগম্য হত।

বকুলতলায় হোঁচট খেয়ে আয়োজকরা অনুষ্ঠানটি করার স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় কচিকাঁচার মেলা স্কুলের মাঠে। এবার আর নীতি পুলিশ নয়, সেখানে আপত্তি আসে স্বয়ং রাষ্ট্রীয় পুলিশের পক্ষ থেকে। ‘অনুমতি’ না থাবার কথা বলে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানটি করতে নিষেধ করা হয়। অনুমতি কি এতই কঠিন যে, পুলিশ সেটি চাইলে দিতে পারত না?

এখানে উল্লেখ  করা প্রয়োজন যে, চারুকলায় এই  ধরনের ‘আপত্তি’কে আমলে নিয়ে অনেকটাই নিজেরাই ব্যবস্থা নিচ্ছে। এই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে চিত্রশিল্পী রফিকুন নবীকে, যিনি রনবী নামে বেশি পরিচিত, মঞ্চে উঠতে দিতে আপত্তি তোলা হয়েছিল। রফিকুন নবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদেরই অগ্রজ শিক্ষক এবং তিনি ইমিরেটাস অধ‍্যাপকও। সে সময়েও অনুষ্ঠানের আয়োজকরা এই বলে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তারা রনবীর সম্মান বাঁচাতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাদের ভাষ্যটা ছিল, ‘কিছু লোক’ বিশৃঙ্খলা করার পরিকল্পনা করছিল, তাই তারা রফিকুন নবীর সন্মান বাঁচিয়েছেন, তাকে মঞ্চে না নিয়ে। কিন্তু এই ‘কিছু লোক’ কারা এবং তারা কেন আপত্তি করেছেন, সেই বিষয়ে কোন ব্যাখা আর পাওয়া যায়নি। এখন সেই ‘কিছু লোক’ই কি ‘অনেক’ হয়েছে?

এই ধরনের কিছু বা অনেকের মতো ‘একদল ব্যক্তি’র আপত্তির কারণেই গতমাসে বাতিল হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় ইসফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে আয়োজিত স্রোত আবৃত্তি সংসদের ‘রবীন্দ্র স্মরণ দ্রোহে, জাগরণে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান। এটি বাতিল হয় ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক মৈত্রী’ ব্যানারে জড়ো হওয়া ওই ‘একদল ব্যক্তি’র আপত্তির মুখে।

এর আগে হেফাজতে ইসলামের আপত্তির মুখে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় বন্ধ হয় লালন স্মরণোৎসব। ফকির লালন সাঁইজির ১৩৪তম তিরোধান বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে মধুপুর লালন সংঘ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। আপত্তির ডানা আরও আগেই উড়ছিলে। নারায়ণগঞ্জে ‘মহতি সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ‘তৌহিদী জনতা’র পরিচয়ে কয়েকজনের আপত্তিসহ হুমকির কারনে।

গত ফেব্রুয়ারিতেই এই রকম ‘আপত্তি’র মুখে বাতিল হয়েছিল নাট‍্য উৎসব, যেটি ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা ছিল।  ঠিক একইভাবেই উৎসব শুরু হওয়ার কিছু আগে ‘কিছু লোক’ এসে উৎসব নিয়ে আপত্তি করে এবং হামলার হুমকিও দেয়। তারপর বাতিল করে দেওয়া হয় নাট‍্য উৎসব। এরপরে ঢাকার উত্তরায়, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া  এবং আরও কয়েকটি স্থানে বাংলা বর্ষবরণ আয়োজন নানা ধরনের বাধা এবং আপত্তির মুখে পড়েছিল।

এই আপত্তিবাজদের নানা ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শন বছর খানেক ধরেই বিভিন্ন আঙ্গিকে চলছে। মাদারীপুরের কালকিনিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা। প্রায় আড়াই শ’ বছরের পুরোনো এ মেলা প্রতি বছর কালীপূজায় সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হলেও  গত বছর থেকে এই মেলা আর হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী স্থানীয় জনগণ ও আলেম সমাজ এ মেলা আয়োজনে আপত্তি জানায়। এ কারণে প্রশাসন মেলা আয়োজনে দেওয়া অনুমতি বাতিল করে।

এই সেদিন, গত ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লালবাগ কেল্লায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে সেখানে ‘নাচ-গান’ হবে এমন খবর পেয়ে একদল ‘উত্তেজিন জনতা’ এসে আপত্তি জানায়। পরে সরকারি মধ্যস্থতায় সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে এবং এটিকে সরকারিভাবে ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কয়েকজনের লিখেছেন সব অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে না। অর্থাৎ কারো কারো অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। তার মানে সমস্যা আয়োজকদের নিয়ে। যার সহজ মানে হলো তাদেরকে ‘ফ‍্যাসিস্ট দোসর’ ট‍্যাগ দিয়ে সেগুলো করা হচ্ছে। যুক্তিগুলো অনেকটাই ঠিক এরকম যে–সকলকে তো যৌন হয়রানি করছে না, তোমাকেই কেন করছে, নিশ্চয়ই তোমার মধ‍্যে কোন সমস‍্যা আছে। এখন বিষয় হল কাউকেই তো হয়রানি বা বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই। আর এই বাধা দেওয়ার রাজনীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই তো হয়েছে জুলাইয়ের অভ‍্যুত্থান। তাহলে ইনিয়ে -বিনিয়ে বাধার পক্ষেই কেন কথা বলতে হবে? আর আমাদের এই ইনানো-বিনানোতেই মজবুত হচ্ছে ‘আপত্তি’র কারখানাটি।

এত আপত্তির জোর থেকে পাচ্ছে, কিছু লোক, তাদের শক্তির উৎস কোথায়? কেন একের পর এক অজুহাত দিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে? আজকে যারা এগুলোকে সমর্থন দিচ্ছেন, তারাই হয়তো নিজেরাও এই ধরনের আপত্তির মুখোমুখি হয়েই প্রতিবাদ করেছেন এক সময় এবং পরে আবারও এই ধরনের আপত্তির রাজনীতির মুখোমুখি পড়তে পারেন।

কোন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা থাকলে সেটি দেখার দায়িত্ব পুলিশের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করবেন। কিন্তু অনুষ্ঠান বন্ধ করার দায়িত্ব তার নয়। কেন কর্তৃপক্ষ সেই দায়িত্ব তাদের কাঁধে নিচ্ছেন? ঠেকা কার কাছে?

এর সঙ্গে আমাদের সত‍্যিকারভাবেই আমলে নিতে হবে যে এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। বর্ষবরণ উৎসব বা লালন উৎসব, কিংবা শরৎ উৎসব–এসবের সঙ্গে আমাদের পরিচয় জড়িত এবং  এগুলোকে শুধুমাত্র গান-বাজনা হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। এগুলো বন্ধ করার কাজটা যারা করছে, তারা হুজুগে এমন করছে, এগুলোকে অপরিকল্পিত বা অরাজনৈতিক বলে ভাবলে ভুল করা হবে। বরং এসব ভীষণভাবে রাজনৈতিক।

পাঠক লক্ষ্য করুন কীভাবে এই আপত্তিবাদীদের রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রাখা হচ্ছে—আগে তারা ছিল ‘তৌহিদী জনতা’, ‘প্রেশার গ্রুপ’, ‘জনরোষ’; আর এখন হয়েছে ‘উত্তেজিত জনতা’, ‘একদল ব্যক্তি’, ‘কিছু লোক’ এবং ‘অনেকে’। এরা পরিচিতই, কিন্তু তাদের পরিচয় আড়াল করে রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারের কোনো বক্তব্য নেই—এই নির্বাক অবস্থাই অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনীতির অংশভাগী করে তুলেছে।

এই সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কিন্তু এটি একটি রাজনৈতিক সরকার। গণঅভ্যুত্থান একটি রাজনৈতিক ঘটনা, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলেও জনগণের সবার নয়, কতিপয় আপত্তিবাদীর সরকারে পরিণত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার কোন বিষয়ে কথা বলবে আর কোন বিষয়ে বলবে না—এটি দিয়ে সরকারের ‘আদর্শিক’ অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে এবং তাদের আসকারায় বাড়ছে ‘আপত্তি’ নামক ভয়ঙ্কর দানবের ‘কারখানা’।