Published : 03 Apr 2021, 08:14 AM
১৯৯৯ সালের ৩১ মে। দিনটি ছিল সোমবার। নর্দাম্পটনের কাউন্টি গ্রাউন্ডে মুখোমুখি ১৯৯২ এর বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায় হাঁটি হাঁটি পা পা করা বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে আলো ছড়ালেন খালেদ মাহমুদ সুজন। উড়ে গেল পাকিস্তান। সপ্তম বিশ্বকাপের ২৯ তম ম্যাচে যেন প্রাপ্তির সপ্তমাকাশে উঠে নতুন দিনের উল্লাসে মাতল বাংলাদেশ।
পাকিস্তানকে হারানোর মধ্য দিয়ে কোন টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। সেদিন ব্যাট হাতে ২৭ রান, বল হাতে ৩১ রানে ৩ উইকেট শিকার করে দলকে পথ দেখিয়েছিলেন খালেদ মাহমুদ। জিতেছিলেন ম্যাচ সেরার মুকুট। ম্যাচ শেষের প্রেজেন্টেশনে এ অলরাউন্ডারের কথাতেও ছিল অর্জনের উচ্ছ্বাস; নতুন কিছু পাওয়ার দাবিও, "…It's certainly a great day for the people of Bangladesh and we are looking forward to test match standards."
প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই টেস্ট স্ট্যাটাসের দাবি জোরালো করে তোলে বাংলাদেশ। অথচ এর মাত্র দুই বছর আগেও প্রেক্ষাপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ করে নেওয়াটাই হয়ে উঠেছিল কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে জায়গা করে নেওয়াটা ছিল অনেকটা রবার্ট ব্রুস ও মাকড়শার সেই গল্পের মতই রোমাঞ্চকর।
আইসসিসি চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের পঞ্চম অভিযাত্রায় দেখা মেলে চূড়ান্ত সাফল্য। টিকেট মেলে শ্রেষ্ঠত্বের আসরে খেলার। যদিও ওই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার আগে প্রত্যাশার প্রশ্নে বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের প্রায় সবার সুর ছিল একই রকম-টার্গেট দুটো জয়। স্কটল্যান্ডকে হারানো আর কোন একটা টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিপক্ষে জেতা। তারপরও ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করবে সুজন-বুলবুলরা, অতি আশাবাদীর পক্ষেও সেসময় এমন ভাবনাটা কঠিন ছিল বৈকি।
নর্দাম্পটনের কাউন্টি গ্রাউন্ডে সেদিন আশাবাদী হয়ে ওঠার রাগিনী টাইগারপ্রেমীদের মনে বাজতে শুরু করেছিল লড়াই মাঠে গড়ানোর আগেই! এ ম্যাচের আগে অবশ্য প্রাথমিক লক্ষ অর্জিত হয়েছিল দুটো দলেরই। মর্যাদার লড়াইয়ে স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। আর গ্রুপ সেরা হিসেবে সুপার সিক্সে পৌঁছায় পাকিস্তান। এভাবে বিবেচনা করলে ম্যাচটি নিছকই আনুষ্ঠানিকতার। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টোটাই। গ্যালারি উপচে পড়া দর্শক। লাল সবুজ পতাকায় ছেয়ে নর্দাম্পটন কাউন্টি মাঠ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ!
নর্দাম্পটনে বাঙালির বসতি বেশ কম। লন্ডন থেকে দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মত। অংকের হিসেবেও এটি একটি মরা ম্যাচ। কেননা, বিশ্বকাপের কোন সমীকরণেই এই ম্যাচের ফলের কোন গুরুত্ব নাই। কাগজে কলমের এই মরা ম্যাচটিকে শুরুতেই জীবন্ত করে তুললেন দর্শকরা। লাল-সবুজ পতাকা হাতে দূর-দুরান্ত থেকে নর্দাম্পটনে জড় হলেন হাজারো বাঙালি। পাকিস্তানিদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে লাল-সবুজের ঢেউয়ের সামনে গ্যালারিতেই ব্যাকফুটে প্রতিপক্ষ শিবির। কিন্তু আসল পরীক্ষা তো মাঠে!
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তখন সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করছে বাংলাদেশ। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেলেও টেস্ট স্ট্যাটাস ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিপরীতে ওই সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটে সমীহ জাগানো দল পাকিস্তান। ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামের নেতৃত্বাধীন দলে সাঈদ আনোয়ার, শহীদ আফ্রিদি, ইজাজ আহমেদ, সেলিম মালিক, মইন খান, শোয়েব আখতার, সাকলাইন মুশতাক, ওয়াকার ইউনুস- দুনিয়া মাতানো একঝাঁক ক্রিকেটাররা। আমিনুল ইসলাম ও তার সহযোদ্ধারা মাঠের সম্মান রাখতে পারবে কি-না, তখন বড় হয়ে উঠেছে এ প্রশ্নটিই।
ম্যাচে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে আমন্ত্রণ জানালেন পাকিস্তান অধিনায়ক। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২২৩/৯। খুব বড় না হলেও ওই সময়ের বাস্তবতায় যে কোন দলকেই বিপদে ফেলার মত পুঁজি। ম্যাচের দ্বিতীয় অংশটা, মানে পাকিস্তানের ইনিংসটা দেখতে গেলাম সাপ্তাহিক বিচিত্রা অফিসে। বলা বাহুল্য, ওই সময়টাতে বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। পাকিস্তান ইনিংস শুরু হওয়ার একটু আগেই পৌঁছালাম। আমাকে এক প্যাকেট বিরিয়ানি এনে দিল অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (নামটা সম্ভবত মনির)। খাওয়া ভুলে ম্যাচ নিয়ে ভাবছি। নানা সমীকরণ মেলাচ্ছি। কী কারণে জানি, কিছু একটা ঘটলেও ঘটতে পারে, এমন একটা বিশ্বাসটা জমতে শুরু করেছে।
ইনিংস উদ্বোধনে নামলেন সাঈদ আনোয়ার-আফ্রিদি জুটি। সবাইকে সুযোগ দেওয়ার কারণে ওই ম্যাচে রাখা হয়নি নতুন বলের দুই পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত ও মঞ্জুরুল ইসলামকে। নতুন বলে আক্রমণ শানানোর দায়িত্ব বর্তালো অপেক্ষাকৃত স্লো মিডিয়াম পেসার খালেদ মাহমুদ সুজনের কাঁধে। এখানে বলে রাখা ভাল, জাতীয় দলে নতুন বলের বোলার নন সুজন। আফ্রিদি-আনোয়ারের মত বিশ্বের অন্যতম সেরা জুটিকে সামাল দেওয়াটা সম্ভব হবে কি-না, পেয়ে বসল এমন দুর্ভাবনাও। প্রথম ওভারেই আশঙ্কাকে আশায় রূপান্তরিত করলেন সুজন। পঞ্চম বল। এগিয়ে এসে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিলেন আফ্রিদি। মিডউইকেটে দারুণ ক্যাচ নিলেন মেহরাব হোসেন অপি। ৪ বলের ইনিংসে ২ রানে কাটা পড়লেন আফ্রিদি।
এই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি পাকিস্তান। পরের ওভারেই ইজাজকে(০) ক্লিন বোল্ড করলেন সফিউদ্দিন আহমেদ বাবু। বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার আগেই রান আউটে ধরাশায়ী সাঈদ আনোয়ার ( ৯)। স্কোরবোর্ডে পাকিস্তানের জুবুথুবু অবস্থা ২৬/৩। বিরিয়ানির প্যাকেট তখনও হাতে। টিভি পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারছি না মুহূর্তের জন্যও।
জুটি বাধঁলেন দুই পরীক্ষিত যোদ্ধা ইনজামাম-উল হক ও সেলিম মালিক। উইকেটে থিতু হওয়ার আগেই ইনজামামের (১৬ বলে ৭) বিদায় ঘণ্টা বাজালেন খালেদ মাহমুদ। লেগ বিফোর হয়ে ফিরলেন পাকিস্তানের এ ব্যাটিং স্তম্ভ। ততক্ষণে পাকিস্তান শিবিরের ত্রাসে পরিণত হয়েছেন সুজন। সেলিম মালিককে (৫) ডাবল ফিগারের নাগাল পেতে দিলেন না। পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে ৫ উইকেট হারিয়ে ৪২ রান। ম্যাচে পুরো কর্তৃত্ব বাংলাদেশের। তবে স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তখনও আছেন ওয়াসিম আকরাম, আজহার মেহমুদ ও মইন খান।
শুরু হল শেষ ভালোর যুদ্ধ। ষষ্ঠ উইকেটে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন মেহমুদ-আকরাম জুটি। ৫৫ রান যোগ করলেন দুজনে। মেহমুদের (২৯) রান আউটের মধ্য দিয়ে ভাঙল জুটি। পাকিস্তান ইনিংসে ৯৭/৬। আকরাম ও মইন খানের যে কোন একজন দ্রুত ফিরে গেলেই ধ্বংসস্তুপ থেকে পাকিস্তান আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না, ততক্ষণে এই বিশ্বাস জন্মে গেছে। মেহমুদ আউট হওয়ার ৮ বলের মধ্যেই বিদায় নিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক। স্কোরবোর্ডে ফুটে উঠল পাকিস্তানের নিভু নিভু অবস্থা ১০২/৭। হাতে ৩ উইকেট। বাংলাদেশ এগিয়ে ১২১ রানে। জিততে যাচ্ছি নিশ্চিত হয়ে গেলাম!
অফিস থেকে বেরিয়ে ৩২ নম্বরের লেকের ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়ালাম। হাতে সেই বিরিয়ানির প্যাকেট। তেমন একটা লোকজন নাই। চারিদিক সুনসান, পুরো ঢাকা যেন বসে টিভি সেটের সামনে। ভীষণ অস্থির লাগছে। এক একটি মুহূর্ত ভারী মনে হচ্ছে ভীষণ। এভাবে কেটে গেল আধঘণ্টার মত। হঠাৎ 'বাংলাদেশ', 'বাংলাদেশ' শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। আমিও শিহরণে কেঁপে উঠি। বুঝলাম উইকেট পড়েছে। তবু খেলা না দেখে দাঁড়িয়ে থাকলাম বাইরেই। হইচই থামল। আবারও নীরবতা। লেকের আশপাশে পাঁয়চারি করছি একাকি। বেশ কিছুটা সময় পর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল 'বাংলাদেশ' 'বাংলাদেশ'। বুঝতে কষ্ট হয় না-নবম উইকেটের পতন হয়েছে। এর ৫ মিনিটের মধ্যেই আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল চেনা আওয়াজে ..আমার দেশ, তোমার দেশ, বাংলাদেশ , বাংলাদেশ। একাত্তরের হাতিয়ার/গর্জে উঠুক আরেকবার- এই শ্লোগানও শুনলাম।
আবেগে, উত্তেজনায় পা যেন আর সরে না। চারিদিকে শুধু 'বাংলাদেশ', 'বাংলাদেশ' আওয়াজ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকি। হঠাৎ আবিস্কার করলাম, রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। মিছিল শ্লোগানে ভাসছে জনস্রোত। কিছু একটা লেখার দায়িত্বও ছিল। স্রেফ ভুলে গেলাম। ভেসে গেলাম জন-উচ্ছ্বাসে। পুরো ঢাকা শহরের মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। মনে হচ্ছে সবার গন্তব্যই টিএসসি। আনমনে তাদের পিছু নেই। এসে পড়লাম টিএসসির জনসমুদ্রে। রাত গভীর হল, রাত ফুরালো, একটা সময় লাল সূর্য চোখ মেলল কিন্তু আনন্দ যে আর ফুরোয় না।
ততক্ষণে পরিচিত অনেককেই পেয়ে গেছি। টিএসসির ভেতরের দিকে ইচ্ছামত গড়াগড়ি খাচ্ছি। সেই বিরিয়ানির প্যাকেটটা কখন, কোথায় পড়ে গেছে টেরও পাইনি। তখন সবাই যেন ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব অনুভূতির উর্ধ্বে। খাবার মিলল ভোরের দিকে। সেটাও এক ঘটনা। ওই রাতেই 'চাঁদাবাজি' করে গরু কিনে জবাই দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়েছিল। এরপর টিএসসিতে অনুষ্ঠান চলল দিনভর।
ম্যাচ শেষে প্রেজেন্টেশনে কে কী বলল সেটা জানলাম সন্ধ্যায় (১ জুন) কর্মস্থল দৈনিক আজকের কাগজ অফিসে গিয়ে। ৩ হাজার ডলারের চেক পেলেন পরাজিত দলের অধিনায়ক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম। বললেন, "এটা ভেবে আনন্দিত যে আমরা ভাইদের কাছে হেরেছি।" এই ম্যাচের ভুলগুলো আগামী ম্যাচগুলোতে আমাদের শুধরে নিতে হবে, বললেন এমন কথাও।
বিজয়ী অধিনায়ক হিসেবে ৬ হাজার ডলারের চেক পেলেন বুলবুল। গর্বিত বাংলাদেশ অধিনায়কের কথায়, "এই জয়ে আমি ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত। এই জয়ে অবদান রাখার জন্য আমি দলের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বোলাররা দুর্দান্ত বোলিং করেছে। এর আগে চমৎকার খেলেছে ব্যাটসম্যানরা। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।" যোগ করলেন, "আশা করছি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই দলের জন্য কিছু পুরস্কারের ব্যবস্থা করবেন।" ম্যাচ সেরার পুরস্কার নেয়ার সময় খালেদ মাহমুদ সুজন বললেন, "আমাদের দেশের মানুষের জন্য এটা একটা বিশেষ দিন। আমরা টেস্ট মান অর্জনের দিকে তাকিয়ে আছি।"
ওই জয় থেকেই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ উচ্চতা টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্ট মর্যাদায় আসীন হয় বাংলাদেশ। দশম টেস্ট খেলুড়ে হিসেবে নতুন দিনের যাত্রা শুরু হয় টাইগারদের।
অথচ ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে একটা ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময় পার করছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট। আইসিসি বিজয়ী কোচ গর্ডন গ্রিনিজের সঙ্গে ম্যানেজমেন্টের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। সব থেকে বড় বিতর্ক ওঠে বিশ্বকাপের দল নির্বাচন নিয়ে। ঢাকা মাঠের 'রান মেশিন' বিবেচিত অভিজ্ঞ মিনহাজুল আবেদীন নান্নুকে বাইরে রেখেই গড়া হয় বিশ্বকাপ স্কোয়াড। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে মিডিয়াতে। ম্যানেজমেন্টের এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিডিয়া। প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে দলে ফেরানো হয় নান্নুকে। ব্যাট হাতেই জবাব দেন নান্নু।
বিশ্বকাপে ওয়ানডে স্ট্যাটাস সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য সব থেকে প্রেস্টিজ ম্যাচ ছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। এডিনবার্গে স্বাগতিক স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগের দুটো ম্যাচেই প্রতিরোধহীন অবস্থায় হেরেছে বাংলাদেশ। স্কটিশরাও হেরেছে একইভাবে। তবে ঘরের মাঠের সুবিধা ছিল স্কটিশদের। বিরুদ্ধ আবহাওয়া ও কন্ডিশনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দেশকে বিশ্বকাপের প্রথম জয় উপহার দেন নান্নু। ম্যাচে টসে হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে একটা পর্যায়ে মাত্র ২৬ রানে ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তলানি থেকে দলকে টেনে তোলেন নান্নু। নাইমুর রহমান দুর্জয় (৩৬) ও এনামুল হক মনি (১৯) ছাড়া কারো কাছ থেকেই সেভাবে সঙ্গ পাননি। শেষ দিকে দুই টেল এন্ডার শান্ত (৬) ও মঞ্জুরুলকে( ২*) নিয়ে পার করেন ৫০ ওভার। সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯ উইকেট হারিয়ে ১৮৫ রান। ১১৬ বলের ইনিংসে মহামূল্যবান ৬৮ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন নান্নু। জবাবে ১৬৩ রানে অলআউট হয় স্কটিশরা। ২২ রানের জয়ের হাসি নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টা পাকিস্তানকে হারানোর প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, "পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা ছিল গ্রুপ পর্বের শেষ খেলা। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মর্যাদার ম্যাচটিতে জেতার কারণে আমরা খুবই নির্ভার ছিলাম। মুক্ত মনে শেষ ম্যাচটা খেলেছিলাম। সবাইকে বিশ্বকাপে সুযোগ দিতে ওই ম্যাচে শান্ত, মনি ভাই ও মঞ্জুকে দলের বাইরে রাখা হয়।" জয়ের ব্যাপারটা কখন ভাবলেন এ প্রসঙ্গে বলেন, "বিরতিতে আমরা আলোচনা করলাম যে, এই উইকেটে ২২৩ রান মোটেও কম নয়। বোলিং–ফিল্ডিং ভাল হলে এই রানের মধ্যেই পাকিস্তানকে বেঁধে ফেলা সম্ভব।"
শান্ত ও মঞ্জু না থাকার কারণে নতুন বল তুলে নিতে হয়েছিল সুজনকে। পরিস্থিতি আর ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা দুটোই সাহস জুগিয়েছিল বলেও জানালেন তিনি। বললেন, "ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন বলে বোলিং করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তাছাড়া কন্ডিশন আমাদের জন্য বেশ ভাল ছিল। স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে শীতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছিল। ওখানে তখন গ্রীষ্ম। ভাল সুইং পাচ্ছিলাম।" বল হাতে ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রান খরচায় ৩ উইকেট পান এই ডানহাতি অলরাউন্ডার। মাঠে দশর্কদের সমর্থনও পাকিস্তান বধে বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে জানালেন খালেদ মাহমুদ।
পাকিস্তানের টপ অর্ডার ধসিয়ে দেয়ার আগে ব্যাট হাতেও দৃঢ়তা দেখান খালেদ মাহমুদ। সাত নম্বরে খেলতে নেমে ৩৪ বলের ইনিংসে কার্যকরী ২৭ রান আসে তার ব্যাট থেকে। ম্যাচ সর্বোচ্চ ৪২ রানের রানের ইনিংসটি খেলেন আকরাম খান। ব্যাটসম্যানেরা সুযোগ গড়ে দিয়েছিল উল্লেখ করে খালেদ মাহমুদ বলেন, "ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমে ভাল জুটি গড়েছিল বিদ্যুৎ (শাহরিয়ার হোসেন) ও অপি (মেহরাব হোসেন)। দারুণ ব্যাট করেছিলেন আকরাম খান। এরপর সবাই কিছু না কিছু অবদান রেখেছিল। তবে ব্যাট করার জন্য উইকেট মোটেও সহজ ছিল না। তাই ফিল্ডিংয়ে নামার আগে আমরা আশাবাদী ছিলাম আমরা।"
বিশ্বকাপের মূল লড়াইয়ের আগেও বেশ আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ। তিন প্রস্তুতি ম্যাচের মধ্যে জয় এসেছিল দুটিতে। এসেক্সের বিপক্ষে ৯১ বলে ১০৮ কিংবা ১০৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন খালেদ মাহমুদ। স্কাই স্পোর্টসের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, "Forget Sanath Jayasuriya – Khaled Mahmud could be the man at World Cup 99"। কিন্তু প্রথমবার অংশ নিয়েই বাংলাদেশ বিশ্বকাপে চমক দেখাবে, এমন সম্ভাবনা কি তবে আগেই ছিল?
এই প্রশ্নের সঙ্গে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করলেন সুজন। বললেন, "আমরা প্র্যাকটিস ম্যাচগুলো খুব ভাল খেলেছিলাম। তবে আসল ম্যাচের সঙ্গে প্র্যাকটিস ম্যাচের পাথর্ক্য অনেক। ওই সময়ের পাকিস্তানকে হারানোর কথা ভাবার মত পর্যায়ে আমরা ছিলাম না।"
কিন্তু সুযোগ পেলে তা কাজে লাগানোর আত্মবিশ্বাসটুকু ছিল বলে জানালেন সেদিনের নায়ক খালেদ মাহমুদ। বললেন, "আমরা একটা সুযোগ পেয়েছিলাম। আর সেটাকে কাজে লাগিয়েছিলাম। ওই জয়ের কারণেই আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পথটা অনেকটায় সহজ হয়ে যায়।" সত্যিই তাই!