Published : 12 Aug 2026, 11:31 AM
রাত দশটা বাজলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের জীবনে বিশেষ কিছু ঘটে না। তিনি লাইব্রেরিতে থাকতে পারেন, টিএসসিতে আড্ডা দিতে পারেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন, সংগঠনের সভা শেষ করে হলে ফিরতে পারেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে তখন ঘড়ির দিকে তাকাতে হয়। কখন হলের দিকে রওনা দেবেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, দেরি হলে কী জবাব দেবেন; এসব হিসাব তার মাথায় ঢুকে পড়ে।
একই ক্যাম্পাসে দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দুই ধরনের সময়। এখানেই ছাত্রী হলের সান্ধ্য বিধিনিষেধের মূল সমস্যাটি ধরা পড়ে। একটি প্রতিষ্ঠান পুরুষ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছে, নিজের চলাচল ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। নারী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ওই সিদ্ধান্তের একটি অংশ প্রতিষ্ঠান নিজের হাতে রেখে দিচ্ছে। ফলে রাত দশটা কেবল ঘড়ির সময় হয়ে থাকে না, নারী ও পুরুষের স্বাধীনতার মাঝখানে টানা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে প্রচলিত সান্ধ্য বিধিনিষেধ বাতিলের দাবিতে ‘অবরোধবাসিনী’ প্ল্যাটফর্মের আন্দোলনকে এই বৃহত্তর পরিসর থেকেই দেখা দরকার। আন্দোলনকারীরা ছাত্রী হল ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাত্রীদের অন্য ছাত্রী হলে প্রবেশ ও থাকার সুযোগ এবং নারী অভিভাবকদের হলে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছেন। দাবিগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
নারীবাদ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ সব সময় সরাসরি নিষেধাজ্ঞার চেহারা নিয়ে আসে না। অনেক সময় তার নাম দেওয়া হয় নিরাপত্তা, সুরক্ষা, শালীনতা, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা অভিভাবকত্ব। নারী কখন বাড়ি ফিরবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে থাকবেন, কত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকবেন; এসব সিদ্ধান্ত যখন অন্যরা নিতে শুরু করে, তখন সুরক্ষা আর নিয়ন্ত্রণের সীমা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
আমাদের সমাজে নারীর দৈনন্দিন জীবনেও এমন নিয়ন্ত্রণের উপস্থিতি খুব সহজেই চোখে পড়ে। ছেলে সন্তানকে বলা হয়, সাবধানে ফিরো। মেয়েকে বলা হয়, সন্ধ্যার আগেই ফিরো। ছেলের নিরাপত্তার জন্য তাকে সতর্ক করা হয়, মেয়ের নিরাপত্তার জন্য তার চলাচল কমিয়ে দেওয়া হয়। এই দুই ব্যবস্থার পার্থক্য গভীর। প্রথমটি একজন মানুষকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে, যাতে তিনি সতর্ক থাকতে পারেন। দ্বিতীয়টি বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার পুরো দায় তার ওপরই চাপিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ও যদি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় চিন্তাকে অনুসরণ করে, তাহলে তা শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা সীমিত করে নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করতে পারে। ক্যাম্পাসে রাতে একজন নারী নিরাপদ নন ধরে নিয়ে যদি তাকেই হলে আটকে রাখা হয়, তাহলে অনিরাপদ পরিবেশ বদলানোর চাপ কমে যায়। যে জায়গায় হয়রানি হতে পারে, ওই জায়গাটি নিরাপদ করার বদলে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এই জায়গায় বাংলাদেশের সংবিধানের দিকে তাকানো জরুরি। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার চেষ্টা এবং জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের সামনে সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার কথা রয়েছে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে শুধু লিঙ্গের কারণে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আরও সরাসরি ২৮(২) অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করবেন।
২৮(৩) অনুচ্ছেদে লিঙ্গের কারণে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নাগরিককে বিশেষ বাধা, দায়, বিধিনিষেধ কিংবা শর্তের মধ্যে রাখার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনি সুরক্ষা এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে ছাত্রী হলের সান্ধ্য বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা শুধু প্রশাসনিক সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ কম। এখানে সমতা ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্পর্কে সংবিধানের অবস্থানও সামনে আসে।
অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট হলের বিধি সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন করছে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয়। কিন্তু নীতিগত জায়গা থেকে একটি প্রশ্ন খুবই স্পষ্ট, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর চলাচলের ক্ষেত্রে শুধু লিঙ্গের কারণে আলাদা বিধিনিষেধ কতটা সমতার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আরও গভীরে গেলে দেখা যাবে, সময় নিয়ন্ত্রণ আসলে সুযোগও নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সকাল আটটা থেকে রাত দশটার মধ্যে শেষ হয় না। গবেষণার কাজ দীর্ঘ হতে পারে, নাটকের মহড়া রাত পর্যন্ত চলতে পারে, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষ হতে দেরি হতে পারে। বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা, সাহিত্যচর্চা, বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা সবকিছুই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অংশ। একজন ছাত্র সেখানে শেষ পর্যন্ত থাকছেন, কিন্তু একজন ছাত্রী ঘড়ি দেখে মাঝপথে বেরিয়ে যাচ্ছেন। একদিনের ঘটনায় এই ব্যবধান খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু চার-পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে প্রতিদিন এমন ছোট ছোট বঞ্চনা জমতে জমতে একজন শিক্ষার্থীর জীবন, সুযোগ ও স্বাধীনতার ওপর তার প্রভাব অনেক গভীর হয়ে ওঠে।
কে বেশি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছেন, কে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিতে পারছেন, কে গবেষণাগারে দীর্ঘ সময় কাজ করছেন, কে সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপস্থিত থাকছেন; এসবের সঙ্গেও সময়ের স্বাধীনতা যুক্ত। অর্থাৎ চলাচলের স্বাধীনতা শিক্ষার সুযোগের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এখানে নিরাপত্তার প্রসঙ্গ অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। নারী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু নিরাপত্তার নামে শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত না করে প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত পুরো ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করে তোলা। ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, রাতের শাটলসেবা ও জরুরি পরিবহন চালু করা, নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নেওয়া, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি ও ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির এই সময়ে পরিচয় যাচাই করে একজন শিক্ষার্থীর হলে প্রবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য কঠিন কোনো কাজ নয়। স্বাধীনতার অর্থও নিয়মকানুন তুলে দেওয়া নয়। হল ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখেও শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আবাসিক শৃঙ্খলা কার্যকর রাখা সম্ভব। মূল বিষয় হলো, এসব নিয়ম সবার জন্য সমান হবে। শুধু নারী হওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে কম স্বাধীনতা দেওয়া কিংবা তার চলাচলের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া বৈষম্যমূলক আচরণ।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হকের বক্তব্য এখানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি জানিয়েছেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও তারা এই সান্ধ্য বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। আন্দোলনের ফলে সন্ধ্যা ছয়টার সীমা রাত দশটা পর্যন্ত এগিয়েছিল। কয়েক দশক পর আরেক প্রজন্ম আবার একই বিষয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘ ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, পিতৃতন্ত্র শুধু পরিবারের ভেতরে টিকে থাকে না। কখনো কখনো প্রতিষ্ঠান, বিধি, সামাজিক অভ্যাস এবং নিরাপত্তার ধারণার মধ্যেও তার ছাপ থেকে যায়।
নারীর মুক্তি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার মধ্যে সম্পূর্ণ হয় না। একই শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ পেলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। সমতার অর্থ একই ক্যাম্পাসে নিজের সময়ের ওপর সমান কর্তৃত্ব, জ্ঞানচর্চায় সমান সুযোগ, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে সমান অংশগ্রহণ এবং নিজের চলাচল সম্পর্কে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি তাই হলের দরজায় নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে দরকার।
নারীকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে পুরোনো কৌশল তাকে ঘরের ভেতরে রাখা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব সম্পূর্ণ উল্টো; নারীকে আটকে রেখে নিরাপত্তা তৈরি না করে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে চলতে পারেন। রাতের ক্যাম্পাস যদি অনিরাপদ হয়, ক্যাম্পাস নিরাপদ করুন। পরিবহন অনিরাপদ হলে নিরাপদ পরিবহন দিন। হয়রানির আশঙ্কা থাকলে হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু সম্ভাব্য সহিংসতার দায় নারীর স্বাধীনতার ওপর চাপিয়ে দেবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই রাত দশটার চেয়ে বড় একটি সময় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে স্পষ্ট করতে হবে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শিক্ষার্থীকে নিজের সময়, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারসম্পন্ন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করবে, নাকি নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে তার দৈনন্দিন জীবনের ওপর অভিভাবকসুলভ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। সংবিধান নারীকে সমান নাগরিকের মর্যাদা দিয়েছে। এখন ওই সমতার অনুভব বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনেও পৌঁছানো দরকার। কারণ নারীর জন্য নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে রাত দশটায় দরজা বন্ধ করে তাকে নিরাপদ ঘোষণা করা হয় না, রাত দশটার পরও দরজার বাইরের পৃথিবীটি তার জন্য নিরাপদ রাখা হয়।
শাহেদ কায়েস কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com