০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হয়রানিমূলক মামলা কাম্য নয়

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে গড়ে ওঠা প্রবল আন্দোলন দমন করতে যে নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচারের নামে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই।

হয়রানিমূলক মামলা কাম্য নয়
গ্রাফিক: মো. নুরুল মোস্তফা জিনাত

চিররঞ্জন সরকার চিররঞ্জন সরকার

Published : 24 Oct 2024, 05:46 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:47 AM

“যারা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে”– গত ১৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এমনটাই বলেছিলেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছিলেন সেদিন। অথচ ঠিক এর পরদিনই সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হলো। গত ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আহাদুল ইসলামকে গুলি ও মারধরের মাধ্যমে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে জেড আই খান পান্নাসহ ১৮০ জনকে আসামি করে খিলগাঁও থানায় মামলাটি করা হয়। মামলায় বিজিবির বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীকেও আসামি করা হয়েছে। অবশ্য ২১ অক্টোবর হত্যাচেষ্টার মামলা থেকে জেড আই খান পান্নার নাম বাদ দিতে আবেদন করেছেন মামলার বাদী মো. বাকের। আবেদনে বাদী তার মামলার এজাহারে জেড আই খান পান্নাকে ভুলবশত আসামি করেছেন উল্লেখ করে তার নাম প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

কেন জেডআই খান পান্নার মতো একজন প্রবীণ আইনজীবী মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা মামলার আসামি করা হলো? উত্তরটা খুবই সহজ। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু নীতির বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা ভাষায় সমালোচনা করছেন। আবার তিনি বিভিন্ন অভিযোগে ঢালাও মামলা দায়েরেরও কঠোর সমালোচনা করছেন। তার এই ভূমিকার সুযোগ নিয়ে একান্তই ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থেকে কেউ এই মামলায় তাকে আসামি বানানোর চেষ্টা করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। জেড আই খান পান্নার আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, “তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটা তাকে হ্যারাস করার জন্যই করা হয়েছে। আমি মনে করি না এখানে রাষ্ট্র বা যারা ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত, তাদের কোনো প্রভাব আছে।”

আমাদের দেশে মিথ্যা মামলার ধারা অনেকদিন ধরেই চলছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আশা করা হয়েছিল যে, এবার হয়তো দেশে নতুন নিয়ম চালু হবে। আইন সত্য ও ন্যায়ের পথে চলবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পুরনো ধারাতেই চলছে অনেক কিছুই। একের পর হত্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এসব মামলায় ঢালাওভাবে শত শত, এমনকি হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রী, মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মামলাতেই অজ্ঞাতনামা কয়েক হাজার আসামি করা হয়েছে। এগুলো দেখলেই বোঝা যায়, আসল ঘটনার সঙ্গে এসব মামলার খুব একটা যোগ নেই। কেবল হয়রানি আর ভীতি সৃষ্টির জন্যই এসব মামলা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একইভাবে জ্ঞাত-অজ্ঞাত অসংখ্য ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হতো। সেই ধারা এখনো চলছে। এর একটা কারণ হলো, অনেক লোককে আসামি করলে এক ধরনের ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি এর থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করা যায়। মামলা হলেই মানুষকে হয়রানি করা যায়। অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেওয়া যায়। থানা ও আদলতসংশ্লিষ্ট এক শ্রেণির মানুষ এই সুযোগটা গ্রহণ করে।

অথচ নাগরিকদের অধিকার রক্ষার করাই আইনের উদ্দেশ্য। কিন্তু আমাদের দেশে আইন পরিণত হয়েছে নিরীহ মানুষকে হয়রানির হাতিয়ারে। কোনো রকম বিচার-বিবেচনা না করে, তথ্যপ্রমাণের ধার না ধেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্য নিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়, এখনও তাই দেওয়া হচ্ছে। এসব ঢালাও মামলা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ এবং সমালোচনা করা হলেও এই ধারা থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে হত্যা মামলা দায়েরের ব্যাপারে ইতিবাচক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে কোনো আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলে মামলা থেকে তার নাম প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল। যাচাই-বাছাই না করে মিথ্যা বা ভুয়া মামলা দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি না করার অনুরোধ এসেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও। কিন্তু বাস্তবে এসব আদেশ-নির্দেশ-অনুরোধ কাজে আসেনি। খেয়াল-খুশিমতো যার-তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে গড়ে ওঠা প্রবল আন্দোলন দমন করতে যে নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচারের নামে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই। বরং এই সব মামলা ন্যায় বিচার পাওয়ার পথে প্রতিবঘ্নক হবে বলে ধারণা করা যায়।

এক ধরনের প্রতিশোধ ও খেয়ালের বশেই যেন আইন-আদালতের কার্যক্রম চলছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারাদেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে বহু মামলা হয়েছে। কিন্তু এসব মামলায় শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, শিল্পী–সংস্কৃতিকর্মী, লেখক-সাংবাদিকদের নামও জুড়ে দেওয়া হয়েছে আগের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে। কোনো সরকারকে সমর্থন বা বিরোধিতা করা নাগরিকের একান্তই তার নিজস্ব বিষয়। এটা একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। দেখতে হবে তিনি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে কোনো অপরাধমূলক কাজে জড়িত হয়েছেন কিনা। যদি জড়িত হয়ে থাকেন, তথ্যপ্রমাণসহ তার বিরুদ্ধে মামলা হতে হবে। কেবল ফাঁসানোর জন্য বা প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ঢালাও মামলায় জড়ানো কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সরকারের ভূমিকা হতে পারে না।

বেশিরভাগ মামলারই কোনো মেরিট লক্ষ করা যাচ্ছে না। আইনজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি মামলা হলো স্থান, সময় ও ঘটনা সংঘটনের স্থান। এই তিনটার হেরফের হলে মামলা টেকে না। ফৌজদারি মামলায় এফআইআরকে বাইবেল বলে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ এর সামান্য দাঁড়ি, কমা পরিবর্তন হলে এটা বাদ। তদন্তে আরও নতুন নতুন তথ্য আসতে পারে। কিন্তু এক মামলায় দুই এফআইআর হতেই পারে না। অথচ দেখা যাচ্ছে, ৫ অগাস্টের আগে যে হত্যা মামলায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের আসামি করা হয়েছিল, ৫ অগাস্টের পর ওই একই মামলায় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের আসামি করা হয়েছে এবং তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর মামলার এফআইআর বদলে যেতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা এটা কেন করছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যা, দুর্নীতিসহ সব অপরাধের বিচার হোক— এটা দেশের সবাই চায়। কিন্তু অপরাধীকে শনাক্ত না করে এ রকম খেয়াল-খুশিমতো মামলা করলে যেমন নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হবেন, তেমনি ন্যায়বিচারের পথও রুদ্ধ হবে। এ ধরনের মামলা ছাত্র আন্দোলনের ফসলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অনেক সময় এ ধরনের মামলা দিয়ে একজন প্রতিবাদকারী ব্যক্তিকে চুপ করিয়ে দেওয়া, থামিয়ে দেওয়া, কণ্ঠ রোধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা তাদের পরাক্রম দেখাতে যখন কণ্ঠরোধের তন্ত্র কায়েম করেন, তখন আসলে সমাজের শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আর শ্বাসরোধ হওয়া ব্যক্তি যে জীবন বাঁচাতে ছটফট করে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বাঁচতে চায়, এটা কে না জানে? এতে করে অনিবার্য অস্থিরতাকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এসব ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা করার সময় কারও আছে বলে মনে হয় না। এতে করে সামাজিক স্থিতি ক্রমেই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

একটি মুক্ত সমাজের জন্য বাকস্বাধীনতা সবচেয়ে জরুরি অনুষঙ্গ। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের ইতিবাচক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। কোনো মত-মন্তব্য যখন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে, তখন রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে অবশ্যই। কিন্তু সেটা বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রক্রিয়া। কিন্তু রাষ্ট্র যদি নানা উছিলায় বাকস্বাধীনতা খর্ব করতে থাকে, তা হলে কি এমন একটা সমাজে পৌঁছানো যাবে যেখানে সবাই একে অপরকে ‘কিন্তু সবার চাইতে ভাল পাউরুটি আর ঝোলাগুড়’-এর বাইরে কোনো কথা বলবে না?

খুব তুচ্ছ কারণে যদি মামলা দিয়ে হয়রানি করে সাধারণ বাকস্বাধীনতাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আস্তে আস্তে কোনো কিছুই বলা বা লেখার স্বাধীনতা থাকবে না। আর রাষ্ট্র নিজেই যদি বাকস্বাধীনতায় লাগাম পরাতে আসে, সেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ রাষ্ট্রই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার হাতে দমনপীড়নের আইনি অধিকার আছে। আর রাষ্ট্রযন্ত্রে যেহেতু ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি, তাই সেই ক্ষমতার ওপর লাগাম পরানোই গণতান্ত্রিক সমাজের উদ্দেশ্য, তার প্রসার নয়।

কণ্ঠরোধের তন্ত্র নয়, কণ্ঠ ছেড়ে গাইবার তন্ত্র সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটা যে কোনো মূল্যে।