১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নাম ও পোশাক বদলালেই কি চরিত্র বদলানো যায়?

১৮৬১ সালের দমনমূলক আইন টিকিয়ে রেখে নতুন ব্যানার তৈরির পেছনে আদৌ কোনো জনকল্যাণ আছে, নাকি এটি কেবল নতুন মোড়কে পুরোনো রাজনীতি?

নাম ও পোশাক বদলালেই কি চরিত্র বদলানো যায়?
২০০৪ থেকে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান: নানান বিতর্কের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পুনর্গঠনের মুখে বিশেষায়িত এই বাহিনী।

ফজিলাতুন নেসা শাপলা ফজিলাতুন নেসা শাপলা

Published : 05 Sep 2026, 11:56 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে পুলিশের অধীন একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনার অর্থ— ওই বিল পাসের বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, সেবাদানের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র অশুভ অভিপ্রায় থাকে না। বাহিনীগুলো পরিচালিত হয় মূলত সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীতির ওপর ভিত্তি করে। সে হতে পারে জনকল্যাণমুখী বা প্রতিহিংসাপরায়ণ নীতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সে কথারই পুনরাবৃত্তি করে বিল উত্থাপনের আগে বলেছেন, বাহিনী পেশাদারভাবে চলবে কি না, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ফলে বাহিনীগুলো জনসেবার চেয়ে শাসকদলের ইচ্ছেপূরণে ক্রমাগত ব্যস্ত থেকেছে এবং নিরপেক্ষতা হারিয়ে চরম আস্থার সংকটে পড়েছে।

২০০৪ সালে গঠিত র‍্যাব তৎকালীন বিএনপি সরকারের একটি বড় উদ্যোগ ছিল। দীর্ঘদিন এ বাহিনী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কাজ করেছে এটা যেমন সত্য, পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে বাহিনীটির পেশাদারত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠায় এটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে পড়ে। একই সঙ্গে নানা কারণে চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীর মনোবলও ভেঙে পড়ে। ভঙ্গুর মনোবল পুনরুদ্ধারের জন্য যখন একটি সুস্পষ্ট ও স্থায়ী দিকনির্দেশনা প্রয়োজন, ঠিক তখনই র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশেরই একটি বাহিনী হিসেবে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন ওঠে—দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের বড় সাংগঠনিক পরিবর্তন কি সত্যিই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, নাকি এটি কেবল পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন নামের লেবেল লাগিয়ে বিপুল অর্থ খরচের নিরর্থক প্রয়াস? গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জনগণ আর্থিক টানাপোড়েনে রয়েছে। এ সংকটে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আমূল পরিবর্তন বা নামবদল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। যদিও বলা হচ্ছে বিদ্যমান লজিস্টিকস, সরঞ্জাম ও অবকাঠামো দিয়েই এসআরবি গঠন করা হবে, কিন্তু বাস্তবে নতুন আইনি কাঠামো, ব্র্যান্ডিং, লোগো, পোশাক, প্রশাসনিক বিন্যাস ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের পেছনে বিশাল বাজেট প্রয়োজন হবে—এটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। প্রায় ৭৬ কোটি টাকা খরচ করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করেও মূল সংকট কাটানো যায়নি; পুলিশের চরিত্র কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি, উপরন্তু পুনরায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে আগের পোশাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। অথচ রাজস্ব সংকুচিত হওয়ার এই সময়ে কেবল নাম বা সাইনবোর্ড বদলাতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা অযৌক্তিক।

মনে রাখতে হবে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মূল সমস্যা নাম বা পোশাকে নয়; সমস্যা রয়েছে ১৮৬১ সালের সেই ব্রিটিশ আমলের পুলিশ আইনে (Police Act, 1861)। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের শাসন সুসংহত করা এবং বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশকে একটি ‘প্রশাসনিক পেটোয়া বাহিনী’ হিসেবে গঠন করতে এই আইন এনেছিল। স্বাধীনতার এত বছর পরও প্রতিটি রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠি পুলিশকে ক্ষমতার লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে এই দমনমূলক আইন টিকিয়ে রেখেছে। এখন পর্যন্ত এই আইনের পরিবর্তে নতুন কার্যকরী কোনো আইন প্রণয়ন বা সংস্কার করা যায়নি। ঔপনিবেশিক আমলের জনগণের স্বার্থবিরোধী আইন না বদলে কেবল নাম পরিবর্তন করে র‍্যাবকে ‘এসআরবি’ বানালে বাহিনীটি দোষমুক্ত হতে পারবে না।

যেকোনো রূপান্তর বা নতুন বাহিনীর সাফল্য নির্ভর করে তার পেশাদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। তবে রাষ্ট্রীয় বাহিনী মূলত সরকারের অনুগত কাঠামো হিসেবে কাজ করে এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে। এ নির্দেশ অমান্য করা মানে সংবিধান লঙ্ঘনের নামান্তর। ফলে রাজনৈতিক অপব্যবহার বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যেকোনো বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বলির পাঠা বানিয়ে রাজনৈতিক হুকুমদাতার দায় এড়ানো কোনো জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। বিগত সব সরকারের রাজনৈতিক ব্যবহারের দায় বাহিনীর ওপর চেপে বসে তাদের ক্রমাগত বিতর্কিত করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের নির্দেশদাতাদের বিচার ও তদারকি নিশ্চিত না করে শুধু পুলিশ সদস্যদের নতুন ব্যানার বা পোশাকে নিয়ে এলে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে না, চারিত্রিক কোনো পরিবর্তন আসবে না।

ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে বিশেষায়িত বাহিনী বা ইউনিট গঠনের পেছনে শাসকগোষ্ঠির নিজেদের অনুগত বাহিনী গড়ে তোলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে। বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে এসআরবি গঠনের পেছনেও এমন কৌশলগত এজেন্ডা থাকার আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব তৈরি হলে নতুন নামের বাহিনীও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও শাসকগোষ্ঠির স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির এই সময়ে জনগণের প্রয়োজন সব বাহিনীর কার্যকর সেবা। শুধু যদি পুলিশ বাহিনীর কথা বলি, তাহলে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে পুলিশের চলমান স্থবিরতা কাটাতে নতুন বাহিনী গঠনের দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল জটিলতায় জড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান পুলিশ ব্যবস্থার সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া জরুরি। সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সম্পদ রক্ষা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার।

প্রচলিত পুলিশ বাহিনীকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই সরকারের একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শত কোটি টাকা খরচ করে নতুন নাম, পোশাক বা ব্যাটালিয়ন তৈরি না করে ১৮৬১ সালের কালো আইন ছুড়ে ফেলা এবং রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে বাহিনীকে ব্যবহার না করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

ফজিলাতুন নেসা শাপলা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com