Published : 08 Aug 2026, 12:02 PM
দেশ যখন তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্যাসের সরবরাহ। শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না; ফলে অনেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে, কোথাও কোথাও শ্রমিকদের ছুটিও দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলছে, অথচ বিনিয়োগের অন্যতম মৌলিক শর্ত—নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ—এখনও নিশ্চিত নয়। এতে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে না, বিদ্যমান দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
গ্যাস-সংকটের প্রভাব এখন আবাসিক গ্রাহকদের জীবনেও স্পষ্ট। বহু এলাকায় রান্নার চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না, অথচ গ্রাহকদের নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সেবার নির্ভরযোগ্যতা—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগ বাড়ছে।
এমন এক সময়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের ঘোষণা—সরকার বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করতে চায়—স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ বর্তমান জ্বালানি সংকটের মূল উৎস বিদ্যুৎ বিতরণ নয়; গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার এবং সামগ্রিক জ্বালানি নীতির সীমাবদ্ধতা। সে প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে: যখন সংকটের কেন্দ্র অন্যত্র, তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিতরণ খাতের মালিকানা পরিবর্তনকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?
বিদ্যুৎ মন্ত্রীর বরাতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতের আর্থিক সংকট ঘিরে আবারও বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দেওয়ার আলোচনা সামনে এসেছে। কিন্তু যে সমস্যার উৎস মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নীতিগত কাঠামোতে, তার সমাধান হিসেবে বিতরণব্যবস্থার মালিকানা পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
নীতিগতভাবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। কোনো খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ নিজে থেকেই দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং কম ব্যয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। সফলতা নির্ভর করে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, প্রতিযোগিতার পরিবেশ, চুক্তির মান, জবাবদিহি, ঝুঁকি বণ্টন এবং মুনাফা নিয়ন্ত্রণের ওপর। একইভাবে সরকারি মালিকানাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অদক্ষতার সমার্থক নয়। তাই কোনটা সরকারি আর কোনটা বেসরকারি—সে তর্ক অবান্তর; আসল বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও দক্ষতার চর্চা আছে কি না।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতের বর্তমান আর্থিক সংকটের প্রধান উৎসও বিতরণপর্যায় নয়। বরং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, উৎপাদন পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ আজকের সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে সমস্যার উৎস অপরিবর্তিত রেখে কেবল বিতরণব্যবস্থার মালিকানা বদল করলে সংকটের মৌলিক কারণ দূর হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
বর্তমান পরিসংখ্যানও সেই বাস্তবতাই নির্দেশ করে। বিদ্যুতের গড় খুচরা বিক্রয়মূল্য ইউনিটপ্রতি প্রায় ৮.৩৯ টাকা হলেও গড় পাইকারি ক্রয়মূল্য বা উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২.৩৮ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে প্রায় ৪ টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যার বার্ষিক আর্থিক প্রভাব প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিপুল বকেয়া এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল ব্যাংকঋণ দেখায় যে আর্থিক চাপের মূল কেন্দ্র উৎপাদন ও বিদ্যুৎ ক্রয়পর্যায়ে। এই বাস্তবতায় বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দিলেই উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বিলুপ্ত হবে বা ঋণের বোঝা হ্রাস পাবে—এমন কোনো সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নেই।
একইভাবে ভর্তুকি কমানোর প্রশ্নেও নীতিগত বিভ্রান্তি রয়েছে। ভর্তুকি হ্রাস মানেই কেবল ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো লুন্ঠনমূলক উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিক করা, অস্বচ্ছ ও ব্যয়বহুল চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, অযৌক্তিক লুন্ঠনমূলক মুনাফা নিয়ন্ত্রণ, অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা উন্নত করা। অতীতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথই বেশি অনুসৃত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিল্প, কৃষি, পরিবহন এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রতিক্রিয়া পড়েছে। ফলে এটি কেবল একটি খাতগত সমস্যা নয়; এটি সামষ্টিক অর্থনীতিরও প্রশ্ন।
বিতরণব্যবস্থার সমালোচনায় প্রায়ই সিস্টেম লসের বিষয়টি সামনে আনা হয়। কিন্তু এটিকে সরকারি মালিকানার অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতা হিসেবে দেখা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত এক দশকে সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট মিটারিং, নিয়মিত অডিট এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমাতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে। তাই বিদ্যমান সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ বিবেচনা না করে মালিকানা পরিবর্তনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা নীতিগতভাবে দুর্বল যুক্তি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং OECD-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে—বিদ্যুৎখাতে সফল সংস্কারের মূল শর্ত মালিকানা নয়, বরং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন। বিশ্বব্যাপী বহুল উদ্ধৃত একটি নীতিগত পর্যবেক্ষণ হলো, মালিকানার ধরন অপেক্ষা প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা ও জবাবদিহি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যে বিদ্যুৎখাত বেসরকারিকরণের সঙ্গে শক্তিশালী স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষমতাভিত্তিক মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর ভোক্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। চিলি ও ব্রাজিলেও বেসরকারি অংশগ্রহণের পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান, নাইজেরিয়া এবং কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশে দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে বেসরকারিকরণের পরও আর্থিক সংকট, বিদ্যুৎ চুরি, বিল আদায়ের দুর্বলতা ও বিনিয়োগ ঘাটতির সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সারকথা তাই একটিই—মালিকানা পরিবর্তন নিজে কোনো সংস্কার নয়; কার্যকর প্রতিষ্ঠানই সংস্কারের ভিত্তি।
বিদ্যুৎ বিতরণ একটি প্রাকৃতিক একচেটিয়া সেবা। রাষ্ট্রের একচেটিয়া ব্যবস্থাকে যদি ব্যক্তিখাতের একচেটিয়ায় রূপান্তর করা হয়, তবে স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছাড়া ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা কঠিন। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মূলধনের ব্যয়, ঋণের সুদ এবং প্রত্যাশিত মুনাফা যুক্ত থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত বিতরণ চার্জে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দুর্বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভোক্তার ব্যয় বৃদ্ধি অথবা সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে ব্যক্তিখাতের মুনাফা নিশ্চিত করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য জ্বালানি খাতে আমাদের দুর্বল ও প্রায় অকার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন(বিইআরসি), বেসরকারিখাতের এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করলেও সেই নির্ধারিতে দামে ভোক্তার কাছে এলপিজি সরবরাহ কখনই নিশ্চিত করতে পারে নাই। ভোক্তারা বেসরকারি খাতের এলপিজি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবসময়ই নির্ধারিত মূল্যের চাইতে অধিকদামে কিনতে বাধ্য হয়। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে বেরকারিকরণ হলে ভোক্তারা যে একই ধরণের বিপদে পড়বে না তার গ্যারান্টি কি? সেটা দেখবে কে?
এখানে আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো গড়ে উঠেছে জনগণের করের অর্থ, সরকারি বিনিয়োগ এবং বহু বছরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। এই সম্পদের মালিকানা বা পরিচালন কাঠামো পরিবর্তনের আগে সম্পদের মূল্যায়ন, ভবিষ্যৎ আয়ের বণ্টন, কর্মীদের অধিকার, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় লাভ ব্যক্তিখাতে স্থানান্তরিত হলেও ঝুঁকি রাষ্ট্র ও জনগণের ওপরই থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতে সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত উৎপাদনপর্যায়ের অস্বাভাবিক লুন্ঠনমূলক ব্যয় হ্রাস, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দেশীয় জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা। বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিও জরুরি, কিন্তু দক্ষতা বৃদ্ধি ও মালিকানা পরিবর্তন এক বিষয় নয়।
নীতিগত বিতর্কের কেন্দ্র হওয়া উচিত না—বিতরণব্যবস্থা সরকারি থাকবে নাকি বেসরকারি হবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কোন ব্যবস্থায় কম ব্যয়ে, অধিক দক্ষতা, অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই প্রশ্নের উত্তর মতাদর্শে নয়, প্রমাণভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে নিহিত।
তাই বিতরণ বেসরকারিকরণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, প্রকাশ্য গণশুনানি এবং সংসদীয় পর্যালোচনা অপরিহার্য। সরকারকে দেখাতে হবে, এই পরিবর্তন কীভাবে উৎপাদন ব্যয় কমাবে, বিদ্যুতের আর্থিক ঘাটতি হ্রাস করবে কিংবা ভোক্তার সেবার মান উন্নত করবে। যদি সেই সম্পর্ক প্রমাণ করা না যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যেখানে সংকটের উৎস উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহে, সেখানে বিতরণ বেসরকারিকরণ কি সত্যিই সমস্যার সমাধান, নাকি নীতিগত অগ্রাধিকারের স্থানান্তর? সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই উদ্যোগকে প্রমাণভিত্তিক সংস্কার বলা কঠিন।
শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: kibria34@gmail.com
আরও পড়ুন-
রেন্টাল ও এলপিজির ভুল থেকে কি শিক্ষা নেবে বিদ্যুৎ বিতরণ খাত?