১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অর্থবছর বদলাচ্ছে, কিন্তু ৫৫ বছর কেন লাগল?

ক্যালেন্ডারের পাতা তিন মাস সরিয়ে দিলেই প্রকল্প সময়মতো শেষ হবে, খরচ কমবে বা দুর্নীতি থামবে; এমন নিশ্চয়তা নেই। আসল পরীক্ষা শুরু হবে বাস্তবায়নে।

অর্থবছর বদলাচ্ছে, কিন্তু ৫৫ বছর কেন লাগল?
পরিবর্তনের সুবিধা যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে প্রকল্প বাস্তবায়নে। আবার হিসাবের পুরো কাঠামো বদলাতে গিয়ে শুরুতে বাড়তি চাপও তৈরি হবে।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

Published : 22 Aug 2026, 05:40 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

৫৫ বছর ধরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত চলে আসা অর্থবছর এখন হতে যাচ্ছে এপ্রিল থেকে মার্চ। সময়ের হিসাবে পরিবর্তন মাত্র তিন মাসের। কিন্তু এর প্রভাব পড়বে সরকারের পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়, এত বছর পর এখনই বা কেন এই বদল? আর এতদিন কেন বদলানো হলো না?

অর্থবছর হলো সরকারের হিসাবের নিজস্ব বারো মাস। এই সময়ের মধ্যেই ঠিক হয় কত রাজস্ব আসবে, কোথায় কত টাকা খরচ হবে এবং কোন প্রকল্পে কত বরাদ্দ যাবে। জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে শুরু করে সরকারি ঋণ ও ব্যয়ের হিসাবও ওই সময়ের ভিত্তিতে করা হয়। অর্থাৎ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার বড় একটা অংশই অর্থবছরকে ঘিরে। বাংলা বা ইংরেজি বছরের সঙ্গে এর সরাসরি মিল থাকতেই হবে, এমন নয়।

ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের চল ছিল। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই তখন এই সময়সূচি ঠিক করা হয়েছিল। দেশভাগের পর পাকিস্তান আমল থেকে এই নিয়ম বদলে জুলাই থেকে জুন করা হয়। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একবার ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত একটা সংক্ষিপ্ত অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিলেন। তারপর থেকে জুলাই-জুনই বহাল থেকেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মটা না বদলানোর পেছনে দুটো বড় কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, বিশ্বব্যাংকের অর্থবছরও জুলাই-জুন। আর উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ঋণ ও অনুদানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল একটা দেশ হিসেবে তাদের সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে চলাটা সুবিধাজনক ছিল। দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত সবকিছু এই চক্রে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে এটি বদলানো মানে পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা; যে ঝুঁকি কোনো সরকারই নিতে চায়নি। ২০১০ সালে একবার পরিবর্তনের চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

তাহলে এখন কেন?

সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের আবহাওয়া। এর সঙ্গে আছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরোনো সমস্যা। বর্তমান নিয়মে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হলো এপ্রিল, মে আর জুন। ওই সময়টাই দেশে বর্ষা শুরুর সময়। রাস্তা, সেতু, ড্রেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ঠিক তখনই সবচেয়ে ব্যাহত হয়, যখন অর্থবছর শেষ করার প্রশাসনিক তাড়া সবচেয়ে বেশি থাকে। একদিকে বৃষ্টি ও কাদা, অন্যদিকে বছর শেষের চাপ। ফলে তৈরি হয় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো, অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘জুন রাশ’। সংখ্যাটা দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট প্রায় এক লাখ একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে একা জুন মাসেই খরচ হয়েছে প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ মোট খরচের আটাশ শতাংশের বেশি খরচ হয়েছে একটামাত্র মাসে!

তাহলে এখন কেন? সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের আবহাওয়া। এর সঙ্গে আছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরোনো সমস্যা। বর্তমান নিয়মে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হলো এপ্রিল, মে আর জুন। এই সময়টাই দেশে বর্ষা শুরুর সময়। রাস্তা, সেতু, ড্রেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ঠিক তখনই সবচেয়ে ব্যাহত হয়, যখন অর্থবছর শেষ করার প্রশাসনিক তাড়া সবচেয়ে বেশি থাকে। একদিকে বৃষ্টি ও কাদা, অন্যদিকে বছর শেষের চাপ। ফলে তৈরি হয় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘জুন রাশ’। সংখ্যাটা দেখলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট প্রায় এক লাখ একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই খরচ হয়েছে প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট খরচের আটাশ শতাংশের বেশি একটামাত্র মাসে।

ঢাকার দক্ষিণ বাসাবোতে টেম্পুস্ট্যান্ড লাগোয়া মূল সড়কে ড্রেন সংস্কার, সুয়ারেজ লাইন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। অর্থবছরের শেষদিকে এরকম খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকে বিভিন্ন দিকে।

ঢাকার দক্ষিণ বাসাবোতে টেম্পুস্ট্যান্ড লাগোয়া মূল সড়কে ড্রেন সংস্কার, সুয়ারেজ লাইন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। অর্থবছরের শেষদিকে এরকম খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকে বিভিন্ন দিকে।

সরকারের যুক্তি হলো, অর্থবছর এপ্রিলে শুরু হলে নতুন বছরের প্রথম তিন মাস শুকনো মৌসুমের শেষ ভাগ ধরে কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে। আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ শুকনো সময়টা চলে আসবে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে। এতে বর্ষা এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণকাজ চালানোর একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পরিবর্তনের সুবিধা যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে প্রকল্প বাস্তবায়নে। আবার হিসাবের পুরো কাঠামো বদলাতে গিয়ে শুরুতে বাড়তি চাপও তৈরি হবে। সরকার আর উন্নয়ন প্রকল্পের দিক থেকে দেখলে বর্ষার সঙ্গে সংঘাত কমার সম্ভাবনা আছে, কাজের মান ভালো হওয়ার সুযোগ আছে, বছরের শেষে গিয়ে অস্বাভাবিক খরচের চাপও কমতে পারে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও একটি সুবিধা তৈরি হবে। ভারত এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে। দুই দেশের অর্থনৈতিক তথ্য তুলনা ও বিশ্লেষণ তখন কিছুটা সহজ হবে। আবার জুনের শেষে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়ার যে অভিযোগ প্রতিবছর ওঠে, ওই প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এর বিপরীতে খরচ আর ঝক্কিও কম না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের সফটওয়্যার এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকেও হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষার সময়সূচি বদলাতে হবে, যা তাদের জন্য একধরনের এককালীন বাড়তি খরচ তৈরি করবে।

সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। এখন জুলাই থেকে জুন সময়ের আয়ের ওপর কর দিতে হয়, নতুন ব্যবস্থায় সেটা হিসাব হবে এপ্রিল থেকে মার্চ সময়ের ওপর ভিত্তি করে। আবার বিশ্ব ব্যাংকের অর্থবছর যেহেতু জুলাই-জুনই থেকে যাচ্ছে, তাই ঋণ আর অনুদান সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বাড়তি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সমস্যা শুধু বর্ষার কারণে নয়। জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, নকশা পরিবর্তন, অর্থছাড়, ঠিকাদারের দুর্বলতা ও দুর্নীতিও প্রকল্প বিলম্বের কারণ। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতার সঙ্গেও অর্থবছরের সময়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই শুধু জুলাই-জুন বদলে এপ্রিল-মার্চ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না; নইলে ‘জুনের রাশ’ কমে ‘মার্চের রাশ’ শুরু হতে পারে।

কাজটা শুধু ক্যালেন্ডার বদলানোর মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। সময়সূচি বদলানোর সঙ্গে দরকার কাঠামোগত সংস্কার। বছরের একদম শুরু থেকেই প্রকল্পের কাজ, দরপত্র প্রক্রিয়া, জমি অধিগ্রহণ আর অর্থছাড় দ্রুত শুরু করতে হবে, যাতে বছরের শেষ দিকে গিয়ে তাড়াহুড়ো না করতে হয়। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা আর প্রকল্প পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতেও একই সঙ্গে সংস্কার আনতে হবে।

সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে নয় মাসের একটি রূপান্তরকালীন বছর হিসেবে রেখেছে। ওই সময়টাকে শুধু ক্যালেন্ডার বদলের প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে চলবে না। নতুন ব্যবস্থাপনা কতটা কাজ করছে, তাও ওই সময়েই পরীক্ষা করা দরকার। এর পাশাপাশি করদাতা আর ব্যবসায়ীদের জন্য আগে থেকেই ব্যাপক প্রচার আর সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে তারা প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পান।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, লেজিসলেটিভ বিভাগ আর অর্থ বিভাগ নিয়ে যে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে ওই কমিটির কাজের গতি আর সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করবে গোটা পরিবর্তনের সাফল্য।

অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালেও এক ধরনের নিয়ম দেখা যায় না। দেশভেদে অর্থবছরের সময় আলাদা। প্রতিটা দেশ নিজের আবহাওয়া, কৃষিচক্র আর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে নিজের মতো করে এই সময়সূচি ঠিক করে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ, বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতিগুলো, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর হিসেবে ধরে; যেমন চীন, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল ইত্যাদি। জুলাই-জুন অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়া, মিশর, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ইত্যাদি। এপ্রিল-মার্চ অনুসরণ করে ভারত, যুক্তরাজ্য আর জাপান। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর আবার অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর। কিছু দেশে আবার কর দেওয়ার সময়কাল আর সরকারি অর্থবছরের সময়কাল সম্পূর্ণ এক না হয়েও পাশাপাশি চলে।

ক্যালেন্ডারের পাতা তিন মাস সরিয়ে দিলেই প্রকল্প সময়মতো শেষ হবে, খরচ কমবে বা দুর্নীতি থামবে; এমন নিশ্চয়তা নেই। আসল পরীক্ষা শুরু হবে বাস্তবায়নে। তারিখ বদলানো সহজ, কিন্তু ব্যবস্থাপনা বদলানো কঠিন। সরকার এবার কোনটা করতে পারে, তাই দেখার বিষয়।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com