১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তালাবদ্ধ ছাদের শহরে মৃত শ্রমিকের জন্য শোক

ঢাকার মিরপুরে আগুনে পুড়ে ১৬ শ্রমিকের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল—এই শহরে নিঃশ্বাস নেওয়াও এক বিশেষাধিকারের বিষয়।

তালাবদ্ধ ছাদের শহরে মৃত শ্রমিকের জন্য শোক
শুধু আগুনের ধোঁয়ায় ঢাকা নয়, ঢাকা মানুষের দায়হীনতার শহরও—যেখানে শ্রমিকের জীবন কেবল প্রেসনোটের উপাদান।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

Published : 16 Oct 2025, 03:22 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:29 PM

‘আমারে তালাবদ্ধ রেখে

আমারে আগুনে পুড়িয়ে মেরে

প্রেসনোট শুধু প্রেসনোট আমি চাই না

বদ্ধ দম বদ্ধ ঘরে আমার এ আটক মানি না

তোমার এ আটক মানি না।’

কবি ও সংগীতশিল্পী কফিল আহমেদের এই গানের আরেকটি দৃশ্যায়ন হয়ে গেল ১৪ অক্টোবর। অকুস্থল রাজধানীর মিরপুর। এবারও কেমিকেলের গোডাউনে আগুন এবং দমবন্ধ হয়ে অন্তত ১৬ শ্রমিকের মৃত্যু।  

এদিন বিকেলে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা যখন ঘটনার বিবরণ এবং গোডাউনের সবশেষ পরিস্থিতি অবহিত করছিলেন, বার্তাকক্ষে আমরা তখন অপেক্ষা করছিলাম নিহতের সবশেষ সংখ্যা তিনি কত বলেন সেটি শোনার জন্য। কেননা, এরকম ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেই আলকে সংবাদও আপডেট করতে হয়। আর এরকম ‘দুর্ঘটনায়’ মৃত্যু কেবলই সংখ্যা। বিশেষ করে নিহতরা যদি শ্রমিক শ্রেণির বা সাধারণ মানুষ হয়।

‘দুর্ঘটনা’ শব্দটিকে বন্ধনীর ভেতরে রাখার কারণ মিরপুরে যা ঘটল, সেটি কি আসলে দুর্ঘটনা নাকি মনুষ্যসৃষ্ট হত্যাকাণ্ড? দুর্ঘটনা বললে সেখানে মানুষের দায় থাকে না। সেটি তখন কপালের ফের, নিয়তি কিংবা প্রকৃতির দায়। কিন্তু মিরপুরে যে কেমিকেলের গোডাউনে আগুন লাগল, এখানে কি মানুষের দায় নেই? এখানে কি কেমিকেলের গোডাউন থাকার কথা? এই গোডাউনে যেসব রাসায়নিক ছিল, তা কি অনুমোদিত? বিপজ্জনক কেমিকেল যেভাবে, যে পদ্ধতিতে, যেসব নিয়ম-কানুন মেনে সংরক্ষণ করতে হয়, এই গোডাউনে কি সেসব মানা হয়েছিল? মানা যে হয়নি, তার প্রমাণ এই বিস্ফোরণ এবং বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে অন্তত ১৬ জনের করুণ মৃত্যু। ১৫ অক্টোবর দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ‘কেমিকেলের স্টোরেজ নীতিমালা অনুযায়ী রাসায়নিক গুদামজাত না করলে বিভিন্ন রাসায়নিক একসঙ্গে হয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে।’

এটি যে নিছক দুর্ঘটনা নয়, তার আরেকটি প্রমাণ ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ ছিল। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, ১৪ অক্টোবর বেলা পৌনে ১২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। কেমিকেলের গোডাউনে আগুন লাগার পর চারদিকে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দ্রুত আক্রান্ত হন ঠিক পাশের চারতলা পোশাক কারখানার ভবনটির কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাশের কারখানার আগুন দ্রুত সরু গলির ওপারের পোশাক কারখানার ভবনের নিচে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পোশাক কারখানার কর্মীরা নিচে নামতে পারেননি। আবার ছাদের দরজায় তালা থাকায় ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ওপরেও যেতে পারেননি।

বস্তুত, ঢাকা শহরের ভাড়াটিয়াদের কয়েকটি বড় বিপত্তির নাম ছাদের তালা বন্ধ, রাত ১১টার পরে গেইট বন্ধ, অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন ইত্যাদি। অর্থাৎ এই শহরের অধিকাংশ ভাড়াটিয়ারই ছাদে যাওয়ার অনুমতি নেই। মালিকরা ছাদের গেইট তালাবদ্ধ রাখেন। কোনো কোনো বাড়ির মালিক ছাদে শখের বাগান করেন। বাগানের নিরাপত্তার কারণেও অনেকে ছাদে কাউকে উঠতে দেন না। আবার বাগান না থাকলেও নিরাপত্তার অজুহাতে ছাদ বন্ধ থাকে।

এর মূল কারণ বাড়িয়াওয়ালা মনেই করেন এবং কোনো কোনো বাড়িওয়ালার মুখে আমি নিজেও এ কথা শুনেছি যে, তারা বাসা ভাড়া দিয়েছেন, ছাদ নয়। এখানে মালিকদের ইগো বা ভাড়াটিয়াদেরকে অধীনস্ত মনে করার সামন্তীয় মানসিকতাও বড় কারণ। অথচ ছাদে ভাড়াটিয়াদের প্রবেশাধিকার থাকলে, ছাদের দরোজা খোলা থাকলে বা ছাদটা উন্মুক্ত থাকলে অবসরে তারা সেখানে যেতে পারতেন। ভোরের মিষ্টির রোদে ছাদে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে পারতেন। বিকালে বা সন্ধ্যায় কিংবা জ্যোছনা রাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছাদে গিয়ে আনন্দ করতে পারতেন। তাতে মন ভাল থাকতো। সেখানে বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হলে পরস্পরের সম্পর্কও উন্নত হতো। কিন্তু না, ঢাকা শহরের অধিকাংশ বাড়িওয়ালাই এর কোনো প্রয়োজন বোধ করেন না। ভাড়াটিয়াদেরকে তারা ভাড়াটিয়া বা কাস্টমারের অতিরিক্ত কিছু ভাবতে রাজি নন। অতএব, ছাদের দরজা বন্ধ। রাত ১১টার পরে গেইটও বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন হলে বাড়িওয়ালাকে অনুরোধ করে গেইট খুলতে হবে। বস্তুত ঢাকা শহরের ভাড়াটিয়াদের একটা বড় অংশই এরকম একটা অলিখিত দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি। যেমন বন্দি কারখানার শ্রমিকেরা। কফিল আহমেদের ভাষায়: ‘কারখানা কেন বন্দিশিবির।’

কারখানার মালিকের কাছে তার শ্রমিকের মূল্য ততক্ষণ, যতক্ষণ সে শ্রম দিতে পারে, যতক্ষণ সে কাজ করে তার কারখানা চালু রাখতে পারে। সুতরাং সেই শ্রমিকের সুরক্ষায় ভবনের ছাদ খোলা রাখতে হবে—এটিকে মালিক হয়তো বাড়াবাড়িই মনে করেন। অতএব সেই শ্রমিক বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মরে গেলে তারা কেবলই সংখ্যা এবং কফিল আহমেদের ভাষায় এই ঘটনা ও মৃত্যু তখন প্রেসনোটের বিষয়। বিবৃতি ও নিন্দার বিষয়। কিছু সংগঠনের প্রতিবাদের বিষয়। সামাজিক চাপে মৃত শ্রমিকদের পরিবার হয়তো কিছু ক্ষতিপূরণ পাবে।

কিন্তু মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ কী দিয়ে হয়? মিরপুরের ঘটনায় যে শ্রমিকরা মরে গেলেন, তাদের পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ কী? কী করে চলবে সংসার? পরিবারে যদি বিকল্প আয়ের লোক না থাকে; যদি তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা কাজ করার মতো অবস্থায় না থাকেন, রাষ্ট্র কি তাদের দায়িত্ব নেবে? তাদের অপঘাতে মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক কি এদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে?

২.

পুরান ঢাকার নিমতলিতে ভয়াবহ আগুন, এরপর চকবাজারের চুড়িহাট্টা ও মগবাজারের বিস্ফোরণে প্রাণহানির কথা মানুষ ভুলে যায়নি। ২০২২ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি ডিপোতে ভয়াবহ আগুনে প্রায় অর্ধশত মানুষের প্রাণহানির কথাও মানুষ ভুলে যায়নি।

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিকেলের গোডাউনে লাগা আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পরে যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, তাদের সুপারিশগুলো যে বাস্তবায়িত হয়নি, তার প্রমাণ এই ঘটনার ৯ বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে প্রায় ৮০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি।

সবশেষ রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে রাসায়নিক গুদাম ও পোশাক কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিকাণ্ডের ফলে যে বিস্ফোরণ হয়েছে, তাতে যে সাদা ধোঁয়া বা টক্সিক গ্যাস উৎপন্ন হয়েছিল, তা অত্যন্ত বিষাক্ত। আগুন লাগার প্রথম দিকেই ফ্ল্যাশ ওভার হয়েছিল এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বিষাক্ত গ্যাসের কারণে আকস্মিকভাবেই হয়তো নিহত ব্যক্তিরা সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীকালে মারা গেছেন।

নিমতলীর আগুনের ঘটনায় তদন্ত রিপোর্টে আবাসিক এলাকা থেকে কেমিকেলের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে এরকম আরেকটি ট্র্যাজেডি দেখতে হত না। ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তারা অনেক চেষ্টা করেও কেমিকেলের গোডাউন সরাতে পারেননি (দেশ রূপান্তর, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। এই স্বীকারোক্তির মধ্যে তার অসহায়ত্ব যেমন ছিল, তেমনি ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসিকতার অভাব। তাছাড়া কেমিকেল গোডাউনের মালিকরাই যদি এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকেন বা তারা যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হন, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যায় কিংবা তাদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা মেয়রের পক্ষেও অসম্ভব।

২০২১ সালের জুন মাসেও রাজধানীর মগবাজারে একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়, ওই ভবনেও কেমিকেল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ ছিল বলে ধারণা করা হয়। আবার এর এক মাস না যেতেই ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান অর্ধ শতাধিক শ্রমিক। এ ঘটনায়ও তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের যে ৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানে এই ঘটনার পেছনে কারখানার মালিকের অনিয়মসহ সরকারি সংস্থার গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এরকম ঘটনা প্রতিরোধে ২০টি সুপারিশও করা হয়।

প্রশ্ন হল, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কেন এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা হল না? কেন কেমিকেল ব্যবসায়ীদেরকে সরকারের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করা গেল না? চুড়িহাট্টার ঘটনার পর আবাসিক এলাকায় কেমিকেলের গোডাউন নিয়ে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও গোডাউন সরানো যায়নি। এটি খুবই স্পষ্ট যে, নিমতলী, চকবাজার, চুড়িহাট্টা, লালবাগ, ইমামগঞ্জসহ পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে যেসব কেমিকেল গোডাউন-কারখানা রয়েছে সেগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা দপ্তরসমূহের অনুমোদন ছাড়াই চলছে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ারী, সূত্রাপুর, লালবাগ, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, বংশাল ও বাবুবাজার এলাকায় সবচেয়ে বেশি রাসায়নিক গুদাম রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কাছে এদের কোনো নির্ভুল তালিকা নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিকেল গোডাউন রয়েছে, এর মধ্যে ১৫ হাজারই অবস্থিত আবাসিক ভবনের ভেতরে। অথচ সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে—অন্যগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ।

প্রশ্ন হল, এই ধরনের ঘটনার পরে আসলে কী হয়? কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় হয়। এর চেয়ে বড় ঘটনা না থাকলে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও মানুষ আহা উহু করে। কিন্তু স্বভাবতই আরেকটি বড় ঘটনা এসে কেমিকেলের আগুন নিভিয়ে দেয়। এরপর মানুষ ‘রিপন ভিডিও’ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়।