Published : 11 Sep 2025, 06:53 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে প্রায় পূর্ণ প্যানেলে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হওয়ার ঘটনা অনেককেই বিস্মিত করেছে। অনেকের মন খারাপ হয়েছে। অনেকে রাজনীতি ও ভোটের হিসাব মেলাচ্ছেন। কেউ কেউ হিসাব মেলাতে পারছেন না। অনেকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এমন একটি সংগঠন সমর্থিত প্যানেলের বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার ঘটনাকে গত বছরের ৫ অগাস্টের পর থেকে দেশে পাকিস্তানপন্থি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি উত্থান হিসেবেও দেখতে চাইছেন। কিন্তু দিন শেষে এটাই সত্য যে, দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে, নানা হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন।
ভোটে কারচুপি বা শিবিরের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষপাতের যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো খুব সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপক নয়। সুতরাং, কারচুপি করে শিবিরের প্রার্থীদের জিতিয়ে দেয়া হয়েছে—এটা যতক্ষণ না প্রমাণ করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা মেনে নিতে হবে যে, শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েই শিবিরকে জয়ী করেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ নাও হতে পারে।
ডাকসু নির্বাচনের পরে রাজনীতি ও জনপরিসরে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি হলো, এখানে শিবির জিতল নাকি শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে হারাবে বলে শিবিরকে জিতিয়ে দিল? এরকম বয়ান দেওয়ার একটি চেষ্টা আছে যে, শিবিরের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন মূলত গত বছরের ৫ অগাস্ট থেকে বিএনপির চাঁদাবাজি এবং তাদের পুরোনো ধারার রাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণে। তারা মনে করেছেন, যদি ডাকসুতে ছাত্রদল জয়ী হয় তাহলে আবাসিক হলে গণরুম, টর্চারসেল, মিছিলে যেতে বাধ্য করা, হলে সিট পেতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির পুরোনো ‘কালচার’ আবার ফিরে আসবে।
শিক্ষার্থীরা ‘জুলাই চেতনা’র পক্ষের প্রার্থী বিবেচনায় শিবিরকে ভোট দিয়েছেন এমনটাও বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যারা ‘জুলাইয়ের চেতনা’ ধারণ করছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন বলে বিশ্বাস করেছেন, তাদেরকে ভোট দিয়েছেন। আরেকটি বয়ান এরকম যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামোফোবিয়া, বিশেষ করে বছরের পর বছর ধরে যে ট্যাগিংয়ের রাজনীতি চলেছে; স্বাধীনতাবিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন হওয়ায় শিবির মানেই হত্যা বা নির্মূলযোগ্য বলে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ‘মজলুম’ হিসেবে শিবিরের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।
যদি প্রথম দুটি বয়ান যুক্তিযুক্ত হয়, অর্থাৎ বিএনপির গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য কারণে শিক্ষার্থীরা যদি ছাত্রদলের প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেন; যদি জুলাই চেতনার পক্ষে তারা ভোট দেন, তাহলে সেই ভোটগুলো পাওয়ার কথা যোগ্য ও ভালো প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা বা শামীম হোসেন বা মেঘমল্লাবসুদের। সেই ভোট পাওয়ার কথা গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের। কিন্তু তাদের সবাই হেরে গেলেন আর বিপুল ভোটে জিতলেন শিবিরের প্রার্থীরা—এটা কী করে সম্ভব হলো? শুধুমাত্র শিবিরই জুলাই চেতনা ধারণ করে? ছাত্রদল জুলাই চেতনার বিরোধী? শুধুমাত্র শিবিরের হাতেই শিক্ষার্থীরা নিরাপদ বা তারা দায়িত্ব পেলেই ক্যাম্পাসে ছাত্রীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন থাকবেন? সুতরাং, অঙ্কটা বোধ হয় এত সরল নয়। ডাকসু নির্বাচনের যেসব অঙ্ক অনেকেই করেছিলেন, তার সব যে ভুল হলো, তার পেছনে কোনো একটি একক কারণ আছে মনে করার কারণ নেই।
ধারণা করা হচ্ছিলো, ডাকসুতে কেউ এককভাবে পূর্ণ প্যানেল জিতবে না। বরং মিশ্র প্যানেল হবে। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পরে দেখা গেল শিবিরের একাধিপত্য। শিবির সরাসরি দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ না নিলেও ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ যে শিবিরের প্যানেল, সেটা সবাই জানতেন। ডাকসুর ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টি তাদের দখলে। শিবির সমর্থিত প্যানেলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও শীর্ষ ৩টি পদ ছাড়া অন্য কোনো পদেই তেমন প্রতিরোধ গড়তে পারেনি ছাত্রদল। ধারণা করা হচ্ছিল, ছাত্রদল ও শিবিরের দ্বৈরথে উমামা ফাতেমা বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু তা হয়নি। আরেক আলোচিত ভিপি প্রার্থী শামীম হোসেনও জিততে পারেননি। তার মানে নির্বাচন নিয়ে যে ধারণা করা হয়েছিল, সেটি মেলেনি।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বিএনপির দুজন সিনিয়র নেতা। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে শিবির ডাকসু নির্বাচনে জয় পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলতে পারি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর এত ভোট কোত্থেকে এল। আমার তো হিসাব মেলে না ভাই।’ মির্জা আব্বাস এটাকে কারচুপি নয়, বরং দেশে গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস হিসেবেও দেখছেন।
অনেকটা একইরকম মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতা হত্যার রক্তে রঞ্জিত স্বৈরাচারের হাতে হাত মিলিয়েছে জামায়াত। এটা বিজয় নয়, ছাত্র-জনতার বিজয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গভীর ষড়যন্ত্রের ফল হচ্ছে ডাকসু নির্বাচন।’
তার মানে বিএনপি এখনও আঁতাত ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বেই আটকে আছে। বিএনপি নেতারা হিসাব মেলাতে পারছেন না মানে হলো তারা এতদিনেও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিটা বোঝেননি অথবা নিজেরা নিজেদের রাজনীতিটা ঠিকমতো করতে পারেননি। শিবির কতভাবে তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করেছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে তারা কীভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাদের আস্থা অর্জন করেছে, সেটা যদি বিএনপি এবং তার ছাত্র সংগঠনের নেতারা ধরতেই না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে বিএনপি এখনও ভোট বা নির্বাচনের মধ্যেই আছে। রাজনীতিতে নেই।
নির্বাচন করা আর রাজনীতি বোঝা এক জিনিস নয়। নির্বাচন হলো রাজনীতির একটা বাইপ্রোডাক্ট। কিন্তু আগে রাজনীতিটা বুঝতে হয়। রাজনীতি ঠিক করতে হয়। অভ্যুত্থানের পর গত এক বছরে সারা দেশে বিএনপি যে ধরনের রাজনীতি করছে এবং তার বিপরীতে জামায়াত-শিবিরের যে রাজনীতি—সেটিই ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।
এখন আপনি বরং এই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিই শিবিরের এত ভোট হলো কী করে? এই বিপুল শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিবির হয়েছেন নাকি শিবির হওয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন—এই অনুসন্ধানও আপনি করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডাকসুতে শিবিরের এই বিজয় একদিন, এক মাস বা এক বছরের পরিকল্পনার ফল নয়। ডাকসুতে শিবির জিতেছে তার কৌশলে, দক্ষতায়। আর ছাত্রদল হেরেছে বিএনপির ভুল রাজনীতি এবং শিবিরের কৌশল বুঝতে না পারার অদক্ষতায়—এটি বললেও বোধ হয় ভুল হবে না। জামায়াতের কৌশলী রাজনীতির বিপরীতে বিএনপি যদি তাদের চেয়ে উন্নত রাজনীতি হাজির করতে না পারে, তাহলে এর প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে।
তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে বৈশ্বিক রাজনীতিও যে বিবেচনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই, সেটি স্পষ্ট হয়েছে ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় ছাত্রশিবিরকে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে। গত বছরের ৫ অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বাড়ার বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ১৯৭১ তথা মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে নতুন বয়ান, মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের বিতর্কিত করার চেষ্টার মধ্যেই পাকিস্তান জামায়াতের আমির হাফিজ নাঈম-উর-রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। দেশটির বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র সংগঠন ইসলামী জমিয়াতে তালাবা (ছাত্রশিবির) বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অন্য প্যানেলগুলো একযোগে ভারতপন্থী শক্তির সমর্থন পেয়েছিল। তবু শিক্ষার্থীরা শিবিরকে জয়ী করেছে।’ শিবিরের এই জয় ভারতের ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশের মুক্তি এনে দেবে এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নতুন শিরোনাম রচনা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সুতরাং, ডাকসু নির্বাচন এবং এর ফলাফলকে শুধুমাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একটি ছোট গণ্ডির ভেতরে সীমাবদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচনারও সুযোগ নেই।