Published : 11 Sep 2026, 06:14 PM
বাংলাদেশে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। মা-বাবা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর নিজেরাই ওই সম্পত্তির ভোগদখল হারিয়েছেন, এমন ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে বহুবার। ১৮৮২ সালের প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে দান সম্পন্ন হলে মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার গ্রহীতার কাছে চলে যাওয়াই ছিল বাস্তবতা। ফলে জীবনের শেষ সময়ে গিয়ে অনেক দাতা নিজেদের সম্পত্তি নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনী ঠিক এই জায়গাতেই একটি আইনি সুরক্ষার তৈরি করতে চেয়েছে; যাতে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজের জীবদ্দশা পর্যন্ত তাতে বসবাস বা তা ভোগদখল করার অধিকার পাবেন।
কিন্তু এমন একটি সামাজিক ও আইনি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগও রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রইল না। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা সংশোধনীকে ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ বলে প্রতিবাদ করেছেন। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নাগরিক ও দেওয়ানি আইনি সমস্যাকে কেন ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? আইনটি যদি বিদ্যমান হেবা, দান বা উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে বাতিল না করে বরং একটি অতিরিক্ত আইনি পদ্ধতি হিসেবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার নিশ্চিত করে, তাহলে আপত্তির প্রকৃত ভিত্তি কোথায়? আর ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক দলগুলো কি নাগরিকের সম্পত্তি-নিরাপত্তার বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করছে না?
সম্পত্তির নিরাপত্তা যখন রাজনৈতিক আপত্তির বিষয়
বিরোধী দলের আপত্তির মুখে জাতীয় সংসদে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে রোববার, যা নিয়ে সংসদে এবং সংসদের বাইরে ‘আপত্তি’ তুলেছে কয়েকটি ইসলামী দল।
নতুন সংশোধনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কেউ নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করলেও নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার বা ভোগের অধিকার নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন। এই নতুন বিধানটি মা-বাবা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই নিবন্ধিত বা রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে এই হস্তান্তর করতে হবে।
সহজ কথায়, বিষয়টি নিছক ‘সম্পত্তি লিখে দেওয়া’ নয়; বরং সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার শেষ বয়সের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা কীভাবে বজায় থাকবে, তার একটি স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা। একজন বাবা যদি নিজের জীবদ্দশাতেই সন্তানকে সম্পত্তি দিতে চান, কিন্তু মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওই সম্পত্তিতে নিজের থাকার বা তা ভোগের অধিকার নিশ্চিত রাখতে চান, এই সংশোধনী তাকে ওই আইনি ক্ষমতা দিচ্ছে।
এই প্রয়োজনীয়তার একটা বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। ময়মনসিংহের মো. আব্দুল মোনায়েমের নিজের কোনো সন্তান না থাকায় তার ১১৫ শতক জমির একটি অংশ ভাইকে দান করেছিলেন। পরে ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় এবং তিনি আরেক আত্মীয়কে সম্পত্তি দিতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন। আইনজীবীর বর্ণনা অনুযায়ী, বিরোধের এক পর্যায়ে তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে দেন এবং দান বাতিল করতে চাইলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সমস্যায় পড়েন।
সমাজের এমন বাস্তব সংকটগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, নতুন আইনটি মানুষকে কতটুকু সুরক্ষা দিচ্ছে? এর কোনো অপব্যবহারের সুযোগ আছে কি না, কিংবা দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের অধিকার কীভাবে সমানভাবে রক্ষা করা যায়? কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কটি যখন হঠাৎ ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ বনাম ‘ধর্মবিরোধী নয়’—এই দুই মেরুতে রূপ নেয়, তখন মূল আইনি ও সামাজিক সমস্যাটি ঢাকা পড়ে যায়।
এখানেই জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন। ধর্মীয় বিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা এক বিষয়, কিন্তু রাষ্ট্রের দেওয়ানি আইন কিংবা প্রাত্যহিক জীবনের নাগরিক সংস্কারকে কথায় কথায় ধর্মীয় বৈধতা-অবৈধতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ভিন্ন বিষয়। একটি আইন যদি প্রচলিত হেবা বা অন্য ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে কোনো হস্তক্ষেপ না করে একটি নতুন বিকল্প সুযোগ তৈরি করে, তবে তার বিরোধিতা কেবল ধর্মীয় স্লোগানে না করে আইনি ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যায় করা উচিত। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরাও স্পষ্ট করেছেন, এই সংশোধনী প্রচলিত দান, মুসলিম আইনের হেবা বা অন্যান্য স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতায় হস্তক্ষেপ করছে না।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে আইনকে আটকে দেওয়ার রাজনীতি
জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ধর্মের আবেগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অধিকার, নিরাপত্তা ও সামাজিক জটিলতাগুলোকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়।
সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে ধর্ম, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় আইনের এক ধরনের যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে মুসলিমদের সম্পত্তি হেবা, উইল ও উত্তরাধিকারের নিজস্ব বিধান রয়েছে। তবে নতুন সংশোধনীতে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, এটি একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অতিরিক্ত হস্তান্তর পদ্ধতি, যা অন্য কোনো ধর্মীয় বা আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন করে না।
সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দল যদি একে ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ বলে নাকচ করে দেয়, তবে তাদের ওই দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়া উচিত। তাদের স্পষ্টভাবে বলা দরকার, প্রস্তাবিত এই আইনের কোন ধারাটি ইসলামী আইনের কোন নীতিকে ক্ষুণ্ন করছে? কোথায় হেবা রহিত হচ্ছে কিংবা কোথায় উত্তরাধিকার আইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া কেবল ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে রাজনীতির মাঠ গরম করা সহজ, তবে এতে ধর্মীয় অনুভূতির অনাকাঙ্ক্ষিত মেরুকরণের ঝুঁকি থাকে। সংসদে গণতন্ত্রের নিয়মে আপত্তি জানানো, সংশোধনী দেওয়া বা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আলোচনার আবহটাই যদি ‘ধর্মের পক্ষে’ বনাম ‘ধর্মের বিপক্ষে’ বানিয়ে ফেলা হয়, তবে যুক্তিনির্ভর গণতান্ত্রিক আলোচনা ব্যাহত হয়।
অবশ্য এই আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে যে যৌক্তিক প্রশ্ন নেই, তা নয়। একজন বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইতিবাচক দিক স্বীকার করেও বলেছেন, কোনো মা-বাবা যেন আবার এই আইনের সুযোগ নিয়ে সন্তানদের কাউকে ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত না করেন, তা নিশ্চিত করা দরকার।
রাজনৈতিক বিরোধিতার আসল জায়গা হওয়া উচিত ছিল এটাই। জামায়াত বা অন্য কোনো বিরোধী দল যদি সত্যিই মানুষের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের দাবি হওয়া উচিত ছিল এই আইনের অপব্যবহার প্রতিরোধের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি সার্বিক ঢালাও অভিযোগ না তুলে নির্দিষ্ট ধারার ত্রুটি ও তার সংশোধনী প্রস্তাব করাই হতো দায়িত্বশীল রাজনীতি।
আইনের বিতর্কে মানুষের অধিকারই হোক শেষ কথা
আইনটির আরেকটি দিক হলো, একবার নিবন্ধিত হওয়ার পর সাধারণভাবে এই ধরনের দান বাতিল করা যাবে না। তবে যদি দাতার চিকিৎসা, শিক্ষা, আর্থিক টানাপোড়েন কিংবা অন্য কোনো বিশেষ জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে দাতা ও গ্রহীতার যৌথ সম্মতিতে দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের মাধ্যমেও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ আইনটি একদিকে যেমন দাতার নিরাপত্তা দিতে চায়, অন্যদিকে হস্তান্তরের স্থায়িত্বও বজায় রাখতে চায়। এই আইনি ভারসাম্য কতটা কাজে আসবে, তা অবশ্য মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এখানে হওয়া উচিত গঠনমূলক। জামায়াত যদি মনে করে এই আইনে ফাঁকফোকর আছে, তবে তাদের উচিত নির্দিষ্ট উদাহরণসহ তা তুলে ধরা এবং নারী, সন্তান ও প্রবীণদের সুরক্ষা দিতে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া।
কারণ সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অসহায় থাকেন ওই মানুষটি, যিনি জীবনের শেষ সম্বল অন্যের হাতে সঁপে দেন। নতুন আইনটি মূলত প্রবীণদের এই মানবিক দুর্বলতাকেই সুরক্ষার চেষ্টা করছে। আইনজীবীরাও একে প্রগতিশীল ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।
তাই জামায়াতের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো, ধর্মীয় আবেগ আর নাগরিক প্রয়োজনের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল বানানো সহজ, কিন্তু জটিল দেওয়ানি আইনের সুচিন্তিত পর্যালোচনা কঠিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওই কঠিন কাজটিই এখন প্রয়োজন।
সম্পত্তি আইন কারো ধর্মীয় পরিচয়ের পরীক্ষা নয়; এটি হওয়া উচিত মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষা। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে, যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ও সমাধানের পথ দেখানোতেই রাজনীতির আসল সার্থকতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সহজ, প্রবীণ মা-বাবা কি জীবনের সব সঞ্চয় সন্তানকে লিখে দেওয়ার পরও নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন? রাষ্ট্রের আইন যদি ওই নিরাপত্তা দিতে পারে, তবে সেটাই আইনের সাফল্য। আর রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব ওই আইনকে আরও নির্ভুল করা, ধর্মের নামে নাগরিকের সুরক্ষা আটকে দেওয়া নয়।
সিয়াম সারোয়ার জামিল পিএইচডি গবেষক। ই-মেইল siam33jamil@gmail.com