১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শপথ নিয়েই সংকটে জুলাই সনদ

যে জুলাই সনদের ওপরে ঐকমত্য কমিশনই রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করতে পারেনি, সেই সনদ কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই পাস হয়ে যাবে, এটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

শপথ নিয়েই সংকটে জুলাই সনদ
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য শপথ গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

Published : 18 Feb 2026, 01:36 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:58 PM

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথের দিনেই একটি জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায় দেশ। প্রশ্নটি উত্থাপন করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নতুন সংসদের সদস্যরা প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

কিন্তু মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আগে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেহেতু তারা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য হিসেবে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়; এবং যেহেতু সংবিধানে এই বিধানটি নেই এবং সংবিধানের তফসিলেও এরকম কোনো পদে শপথের কোনো ফরম নেই—অতএব তারা এখনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারছেন না। তিনি মত দেন, যদি সংবিধান সংশোধন করে এরকম একটি বিধান যুক্ত করা হয়, তাহলেই কেবল তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন।

আপাতদৃষ্টিতে সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা এই প্রশ্নটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং যখন জুলাই সনদ চূড়ান্ত হলো; বিশেষ করে যখন জুলাই সনদের ওপর গণভোটের সিদ্ধান্ত হলো, তখন কেন এই জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নটি তোলেননি?

এটা ঠিক যে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। কিন্তু সংবিধানে বিধান না থাকার পরেও অনেক কিছু ঘটে। যেমন সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো বিধান নেই। কিন্তু অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে (ডকট্রিন অব নেসেসিটি) সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের (যদি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এইরূপ কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে, যাহা এমন ধরনের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি প্রশ্নটি আপিল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানির পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।) আলোকে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে গণভোটেরও কোনো বিধান নেই। কিন্তু গণভোট অধ্যাদেশ জারি করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে জুলাই সনদের ওপর জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যদিও এই গণভোটটি হয়েছে খুবই দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ একটি প্রক্রিয়ায় এবং যে জুলাই সনদের ওপর জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য এই গণভোট নেওয়া হয়েছে, সেই সনদের অনেকগুলো প্রস্তাবেই বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি ছিল, অতএব সেই প্রশ্নবিদ্ধ গণভোট এবং নোট অব ডিসেন্টসম্বলিত জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নে বিএনপি যে ক্রিটিক্যাল থাকবে—সেটিই স্বাভাবিক। যদিও বিএনপি সংস্কার চায় না বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না—এমন কথা বলেনি। বরং তাদের অবস্থান হলো, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবে তারা একমত হয়েছে এবং যেসব সংস্কার প্রস্তাব তাদের ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারে আছে, সেসব সংস্কার তারা করবে। কিন্তু এই পয়েন্টেই অন্য দলগুলো, বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বিএনপির পার্থক্য। জামায়াত ও এনসিপি মনে করে, জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর পক্ষে জনগণ গণভোটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছে; অতএব জুলাই সনদে যেভাবে আছে, প্রস্তাবগুলো সেভাবেই পাস হতে হবে। কিন্তু জুলাই সনদে এটিও বলা আছে যে, প্রস্তাবগুলো পাস হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে।

প্রসঙ্গত, জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবের একটি বড় অংশই সংবিধান সংশোধনসম্পর্কিত। বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে সংবিধানের একটি দাড়ি-কমা পরিবর্তনেও যেখানে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের মতামত প্রয়োজন, জুলাই সনদে উল্লিখিত সংবিধানের অনেক মৌলিক পরিবর্তনও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়ে যাবে বলে বিধান করা হয়েছে।

বিএনপি এখানে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কেননা তারা জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছে। অতএব তাদের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলে এই পরিষদেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবেন। সেক্ষেত্রে জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবে দল একমত নয়, সেগুলো সহজেই বাতিল করে দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই সুযোগ থাকার পরেও বিএনপি যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিল না, তার পেছনে রয়েছে সাংবিধানিক জটিলতা—যে জটিলতার প্রশ্নটি তারা এতদিন এড়িয়ে গেছে।

বলা হয়, যে প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো বিদ্যমান নেই, তার সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যায় না। সুতরাং, জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হলেও কোন প্রক্রিয়ায় এটি তৈরি হবে তা বলা নেই। অর্থাৎ পরিষদ গঠনের আগে তার সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যায় না বলেই বিএনপি মনে করে। তারা এই প্রশ্নটি আগে উত্থাপন করেনি কি এই কারণে যে, জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাবে তাদের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে এবং গণভোটের প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ বলে?

সাধারণত গণভোট হয় কোনো একটি বড় প্রস্তাব বা সাংবিধানিক প্রশ্নে সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরে। কিন্তু এবার বাংলাদেশে গণভোট হলো সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব বা প্রস্তাবসমূহ সংসদে পাস হওয়ার আগেই। অর্থাৎ ঘোড়ার আগে গাড়ি। দ্বিতীয়ত, যেসব প্রশ্নে গণভোট হয়েছে, তাও খুব পরিষ্কার নয়। সাধারণ মানুষের বিরাট অংশই যে গণভোটে না বুঝে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই। কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়েছেন দল বা ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। আবার নির্বাচনের পরে বিভিন্ন কেন্দ্রের যেসব তথ্য মিলছে, তাতে গণভোটে সরকার ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে কি না, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট বেশি দেখানোর জন্য কোনো মেকানিজম করেছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। সব মিলিয়ে গণভোটে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের বিষয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থান গ্রহণ করল বলেই মনে হয়।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলেও জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর পাশাপাশি তাদেরকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। প্রশ্ন হলো, সিইসিকে এই এখতিয়ার কে দিয়েছে? কে কাকে শপথ পড়াবেন, সে বিষয়টি সংবিধানের তফসিলে পরিষ্কার উল্লেখ থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, তা বলা নেই। তাছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশেও বিষয়টি পরিষ্কার নয়। সুতরাং, জামায়াত ও এনসিপির সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোয় সিইসির এখতিয়ার নিয়ে এখন যেন প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতেও এটি একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে আদালতে চ্যালেঞ্জড হতে পারে।

এরইমধ্যে গণভোটের বৈধতা নিয়ে এবং গণভোটের ফলাফল স্থগিত চেয়ে রিট হয়েছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যেদিন শপথ নিলেন, সেদিনই সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন। আগামী সপ্তাহে রিটটির ওপর শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। অন্যদিকে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। অর্থাৎ, ‘না’-এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছে ‘হ্যাঁ’। এর মধ্য দিয়ে বলা হয় যে, জুলাই সনদের পক্ষে দেশের বেশির ভাগ মানুষ তাদের রায় দিয়েছেন। কিন্তু যে পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেখানে জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো পাসের কথা বলা হয়েছে, সেখানেই ধোঁয়াশা রয়েছে। যা বড় ধরনের সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি করেছে।

এখন সমাধান কী? সংবিধানের যে ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছে, একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রশ্নেও সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়া যায়। সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে একটা মীমাংসার পথ বলে দিতে পারেন। যেমন আদালত যদি বলে দেন যে, সিইসির কাছে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়েই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়ে যাবে—তাহলে এর একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে। না হয়, জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে কোনো লাভ হবে না। কারণ শুধুমাত্র এই দুটি দলের সদস্যদের নিয়ে পরিষদ গঠিত হবে না বা এই দুটি দল চাইলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

মনে রাখতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল না চাইলে জুলাই সনদের একটি প্রস্তাবও বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অতএব বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। মুশকিল হলো, জুলাই সনদ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া তথা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেই রাজনৈতিক ঐকমত্য স্থাপন করা যায়নি। বরং ঐক্যের জুলাই সনদই অনৈক্যের কারণ হয়েছে। অধিকন্তু বিএনপি বেশ কিছু জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট দিলেও সেসব বাদ দিয়ে ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্ত সনদ অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছে—যার আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়েছে। বিএনপি এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতারণামূলক’ বলেও অভিহিত করেছে। ফলে যে জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান ক্রিটিক্যাল তথা যে সনদের ওপরে ঐকমত্য কমিশনই রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করতে পারেনি, সেই সনদ কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই পাস হয়ে যাবে, এটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু তারপরও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান যেহেতু জুলাই সনদে আছে এবং যেহেতু গণভোটে এই সনদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, অতএব সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জটিলতা নিরসর করা জরুরি। বরং সেই পরিষদেই জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে। পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরাই তখন সিদ্ধান্ত দেবেন যে, কোন কোন প্রস্তাবের সঙ্গে তারা একমত এবং কোন কোন প্রস্তাব নাকচ হবে।