Published : 12 Aug 2026, 12:58 PM
সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির প্রার্থীর জয় যেখানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করাটা মোটেও বঙ্গভবন জয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ নয়। ন্যূনতম রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষমাত্রই বোঝেন—এই মনোনয়ন মূলত জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস পুনর্লিখনের কৌশলের অংশ। ফলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের এই প্রার্থীও।
আগামী ২০ অগাস্ট হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—এ খবরটি ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যম সূত্রে কমবেশি সকলেই জেনে গেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে। তবে গত ৩৫ বছরে এই বিধানটি ভোটে নির্বাচনের বিপরীতে দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। কারণ এই ৩৫ বছরে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী ছিলেন না। তাই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের দেখা কেউ পায়নি।
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর মোট তিনবার সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল (১৯৭৮, ১৯৮১ এবং ১৯৮৬) এবং সেগুলোর প্রত্যেকটি হয়েছিল জনগণের ভোটের মাধ্যমে।
১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে প্রধানমন্ত্রী-শাসিত সরকার ব্যবস্থা শুরু হলে, সেবারই প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটের বিপরীতে তাদের প্রতিনিধি অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা হয়। সেবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে। আব্দুর রহমান বিশ্বাসের ভোট পেয়েছিলেন ১৭২, আর বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২। ফলে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস।
১৯৯১ সালের পর এবারই পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ইতোমধ্যে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিএনপির প্রার্থিতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যদিও দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষর বা একটি লিখিত সম্মতি-বিবৃতি দিতে হয়; মির্জা ফখরুল ইতোমধ্যে তা করেছেন বলেও সংবাদমাধ্যম বলছে। অন্যদিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা দলের প্রার্থীর বিপরীতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে সক্রিয় থাকা ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এই প্রার্থিতা বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানা যাবে আগামী বৃহস্পতিবার, সেদিনই প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ।
এই সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ১১ দলীয় ঐক্যের সদস্য সংখ্যা ৯০। হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে তিনিই হবেন রাষ্ট্রপতি। কারণ এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা তাদের নাম লিখে ভোট দেবেন, তাই কে কাকে ভোট দিয়েছেন তা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বাইরের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন না বলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের কাছে এমনটাই বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর আছে, ফলে কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। দুটি কারণে হতে পারে বিএনপির এই কঠোর ঘোষণা: প্রথমত, বিএনপি নিশ্চিত করতে চায় যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তাদের মনোনয়নের বাইরে ভাববার সুযোগ নেই; অন্যদিকে দলের মধ্যে যদি কেউ ‘গুপ্ত’ জামায়াত হিসেবে থাকে, তবে তাদের ‘হুঁশিয়ার’ করে দেওয়া।
খুব সাধারণ জিজ্ঞাসা—১১ দলীয় ঐক্য জানে তাদের মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচনে জয়লাভ করার সম্ভাবনা একেবারেই নেই, তবু কেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ওই ১১ দলীয় ঐক্য কেন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে? এবং তাদের মনোনীত ব্যক্তিকে ঘিরেও চলছে আলোচনা? কেনই-বা দলটি তাদের প্রার্থীকে সামনে আনছে?
এই ১১ দলীয় ঐক্যে কর্নেল অলি আহমেদের অন্তর্ভুক্তি জাতীয় নির্বাচনের আগেই নতুন আলোচনার খোরাক হয়েছিল। বিশেষ করে অলি আহমেদ বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। যতদূর মনে পড়ে, ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াত-বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফিসফাস আছে যে, বিএনপি এবং জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত-বিরোধী হওয়ার কারণে তাকে বিএনপির রাজনীতিতে কোণঠাসা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বিএনপিতে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন এবং সবশেষে বিএনপি ত্যাগ করে নতুন দল তৈরি করেন। কিন্তু রাজনীতিতে যে সত্যিই 'শেষ' বলে কিছু নেই, সেটি কেন যেন অক্ষরে অক্ষরে সকলের সামনে দাঁড় করালেন বীর বিক্রম অলি। তিনিই ঢুকলেন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষের শিবির জামায়াতে ইসলামীর সামিয়ানায়।
দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, কর্নেল অলির রাজনৈতিক জীবনে ঝরে পড়া কলমের কালির মতো যেন একটি দাগ হয়ে গেল এই ঐক্যে যোগদান। জামায়াত যেন কর্নেল অলিকে পেল সেই দাগ মোছার ‘সার্ফ এক্সেল’ হিসেবে। তারা স্বাধীনতার এক নতুন ঘোষক খুঁজে পেলেন অলির মধ্যে, আর প্রচার পেল ‘উই রিভোল্ট’ তত্ত্ব। জাতীয় নির্বাচনের আগেই চট্টগ্রাম বন্দরের এক নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, “বাংলাদেশে একাত্তর সালে স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই (চট্টগ্রাম) হয়েছিল। আপনাদেরই এক গর্বিত সন্তান সবার আগে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘উই রিভোল্ট’। তিনি হচ্ছেন এলডিপির সম্মানিত সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম।”
জামায়াতের আমিরের ওই বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে থাকা বিএনপিকে সেই সময়ে জামায়াতের আমিরের এই বক্তব্যের শক্ত বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র সালাহউদ্দিন আহমদের একটি পাল্টা বক্তব্য ছাড়া এ বিষয়ে আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে রাজনৈতিক হিসাবগুলো সব স্পষ্ট দেখা না গেলেও এতটুকু বোঝা যায় যে, ১১ দলীয় ঐক্য থেকে কর্নেল অলির মনোনয়নের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রপতি হওয়া নয়। কারণ এটি সকলের কাছেই বোধগম্য যে, বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে তিনিই হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। তাহলে এই মনোনয়নের পেছনের রাজনীতিটা আসলে কী?
১১ দলীয় ঐক্যের রাজনীতির বিভিন্ন গতিপথ এবং কৌশল বিশ্লেষণ করে যেটি দেখতে পাওয়া যায়, তা হলো—কর্নেল অলিকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ‘তাদের মতো’ একটি বয়ান তৈরি করার পথকে প্রশস্ত করা। কারণ এখন পর্যন্ত জামায়াতের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে তাদের সুবিধে মতো একটি বয়ান নির্মাণ। সেই জায়গায় কর্নেল অলিকে সামনে রেখে তার মুখ দিয়ে ভিন্ন বয়ান উৎপাদন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর দখলদারিত্ব কায়েম করাই মূল লক্ষ্য।
কর্নেল অলি কিসের তরে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের কাছেই আশ্রয় চাইলেন? তিনি কি জানেন না বা বোঝেন না যে, জামায়াত তাকে ‘পদের’ লোভ দেখিয়ে আসলে তাদের মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী অবস্থানকে হালকা করতে চাইছে? অলির মতো একজন যোদ্ধার কাছে শেষ পর্যন্ত এসব নাম-পদ এগুলোই বড় হয়ে উঠল? তার কাঁধে বন্দুক রেখে জামায়াত তাদের এক অমোচনীয় কালি ঝাপসা করতে চাচ্ছে, আর কর্নেল অলি শেষ জীবনে এসে গৌরবের মুকুট থেকে পালক খোয়াচ্ছেন?
জোবাইদা নাসরীন অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.con