না, এটা আমার শেষ লেখা নয়
বিভুদার মৃত্যু শুধু একজন বন্ধুর বিদায় নয়, বরং এমন এক বন্ধুত্বের সমাপ্তি, যেখানে কৃতজ্ঞতা, অভিমান আর ভালোবাসা একসঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
বিভুদার মৃত্যুজনিত শোকে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে আছি যে, মাথা কতোটা খুলবে জানি না। যাহোক, আমি ক্ষুদ্র এক মানুষ, বিভুদা আমাকে প্রতিষ্ঠান (institution) বানিয়ে গেলেন। বন্ধুর জন্য এর চেয়ে বেশি কী আর করতে পারতেন তিনি! আমি তার জন্য যতোটুকুই করেছি, তা বস্তুগত; তিনি করলেন ভাবগত। এটা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
প্রতিটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভেতর ঘৃণার বীজ থাকে, যে কোনো সময় এই বীজের অঙ্কুরোদগম হতে পারে। আমিও হয়তো কোনোদিন কোনো এক ঘনিষ্ঠজনকে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলব। বিভুদা নিজেকে হনন করেননি; তিনি জাগতিক সব ধরনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন। এটা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা। কেউ যখন স্বাধীন হয়ে ওঠে, তখন সে বীর, এই বীরত্বকে সম্মান করতে হয়। মৃত্যুর আগে তিনি এতটাই স্বাধীন হয়ে পড়েছিলেন যে, বাক-স্বাধীনতার শেষ সীমানায় চলে গিয়েছিলেন।
এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, এই মানুষ, সবকিছুর প্রতি তার এত ক্ষোভ ছিল যে, এসবের পার্সোনিফিকেশনের জন্য কাউকে দরকার পড়েছিল। তার ঘনিষ্ঠতম হিসেবে আমাকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। আমাকে বেছে নিয়েছেন, কারণ আমার এক ছেলে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত এবং আরেক ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অল থ্রু ফার্স্ট হয়ে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছে। অথচ তার ছেলে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার হয়েও বেকার। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, বিভুদার ব্রিলিয়ান্ট ছেলেটির জন্য একটা চাকরির যেন ব্যবস্থা করা হয় আর সংখ্যালঘু হওয়ার ‘অপরাধে’ তার ডাক্তার মেয়ের চাকরিতে যেন ঝামেলা না হয়। আমিই উপলক্ষ্য, কারণ আমার চিকিৎসায় ভক্তরা কোটি টাকা দেয়, তাকে কিছু দেয় না। সাহিত্যে অতিরঞ্জন চলে খুব। লাখকে কোটি বললে দোষের কিছু নেই। এ দুই ক্ষেত্রে আমার দোষ মাথা পেতে নিলাম।
বিভুদা লিখেছেন, আমি প্লট পেয়েছি। প্লট পাওয়ার প্রেক্ষাপটটা বলেননি। আসলে এত কথা, এই প্রেক্ষাপটা বলার মতো স্পেস ছিল না হয়তো। একজন দেখলাম, লিখেছেন আমার মুখোশ খুলে গেছে। মুখোশ থাকলে তো সেটা খুলবে। আমি openness is strength, এই নীতি মেনে চলি। আমার গোপন বলে কিছ নেই। আমি যে প্লট পেয়েছি, আমার অফিসের সবাইসহ ঘনিষ্ঠরা জানেন। আমি প্লট পেয়েছি, ২০১৪ সালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, যিনি আমার মুখোশ খুলেছে বলেছেন, তাকে যদি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষে প্লট সাধা হতো, সম্ভবত লুফে নিতেন।
একজন সাংবাদিক যদি, প্রতি কাঠা ২ লাখ টাকার বিনিময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটা প্লট পায়, তাতে দোষ থাকে জানলে নিতাম না। দেখুন কী ঘটেছিল। ২০১৪ সালে লন্ডন থেকে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ফোন করে আমাকে বলেছিলেন, “আমি হাসিনাকে বলেছি, একটা দরখাস্ত দাও, প্লট পেয়ে যাবে।”
আমি দরখাস্ত দিচ্ছিলাম না, এই ভেবে যে, প্লট পেলে তো সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখতে পারব না। পরে নতুন ভাবনায় দরখাস্ত দিলাম, প্লট পেলেও সরকারের যতটুকু সমালোচনা করা দরকার করব, তাতে প্লট কেড়ে নেওয়া হলে অসুবিধা নেই।
অনেকদিন পর প্লটের প্রাথমিক চিঠি পেলে গাফ্ফার ভাইকে ধন্যবাদ দিতে ফোন করলে তিনি বললেন, শেখ হাসিনা তাকে বলেছেন, মাহবুব কামাল জাসদ করত, আমাদের ক্রিটিক, কিন্তু সৎ, সেজন্যই দিলাম। আমি প্লট বুঝে পেয়েছি ২০১৬ অথবা ২০১৭ সালে। আজই সকালে সবাই চা চাচ্ছিলাম যখন, আমার সহকর্মী আসিফ রশীদকে বললাম, “আসিফ বলেন তো, ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার কলাম লিখেছি। আপনি তো এডিট করতেন আমার লেখা, একটা লাইনেও কি শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছি?” আসিফ বললেন, “বরং আপনার লেখা এত কড়া হতো যে, সরকারের ভয়ে সফট করে দিতাম।”
গত রেজিমে কলাম কিংবা টকশোয়ে শেখ হাসিনার স্তুতি করেছি, মনে পড়ে না। যদি করে থাকি, তাহলে যুক্তি ছিল। যেমন, আমার ক্যান্সারের সময় শেখ হাসিনা দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ক্যান্সারমুক্তির পরপরই ফেইসবুকের পোস্টে শেখ হাসিনাসহ যারা আমাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা করেছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। আমার স্পন্ডলোসিসের সময় যখন ব্যথা সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড পর্যন্ত করতে চেয়েছিলাম, আমার বন্ধু তখনকার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সহায়তায় ৫ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। গুরুতর অসুস্থতায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে সরকারের চরম বিরুদ্ধবাদীদেরও অনেকেই সহায়তা পেয়েছিলেন। এটা অধিকারের পর্যায়ে পড়ে।
প্লট ও দুই দফায় চিকিৎসার টাকা ছাড়া গত সরকারের কাছ থেকে আমি বাড়তি একটাও সুবিধা নেইনি। আমি কখনো প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হইনি, তার সংবাদ সম্মেলনে বহুবার দাওয়াত পেয়েও যাইনি, শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার কখনো দেখাও হয়নি। গত রেজিমে আমি বরং বিএনপিতে থাকা আমার বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছি। ভুলও হতে পারে, আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের শাসক মানেই তিনি সমালোচনার যোগ্য। যেমন এখন আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করে থাকি। এ সমালোচনা আমি বঙ্গবন্ধু, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা–সবার ক্ষেত্রেই করেছি।
এই অংশটুকু লিখতাম না, বিভুদার একটা কথার পরিপ্রেক্ষিতে লিখছি। আমরা সবাই দীর্ঘদিন থেকে বলাবলি করতাম, বিভুদার এত টাকার প্রয়োজন হয় কেন? তিনি যখনই আর্থিক সমস্যার কথা বলতেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ‘প্রথম আলো’র আনিসুল হক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার শামসুদ্দিন ভাইকে (তারা দুজনই আমার ফেবু ফ্রেন্ড) ফোন দিতাম। দুজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি কিছু যোগ করে মোটা অঙ্কের টাকা পৌঁছে দিতাম তাকে। বছর দু’য়েক আগে আমি আনিসুল হককে ফোন করে বলেছিলাম, “কোনো কথা শুনতে চাই না, বিভুদাকে এক্ষুণি ৫০ হাজার টাকা দিবেন।” আমার বলা মানে তার কাছে নির্দেশের মতো। তিনি সম্ভবত ‘প্রথম আলো’তে চাকরিরত বিভুদার শ্যালক দীপঙ্করকে দিয়ে টাকাটা পাঠিয়েছিলেন, দ্রুত ট্রান্সফারের জন্য।
আমি ইউরোপ থেকে এসেছি এ মাসের ৮ তারিখ সকালে। ঢাকায় পৌঁছেই আমি এনজিও ‘আশা’র হাবিবকে ফোন করে বললাম, বিভুদাসহ আপনারা আসেন, আপনাদের জন্য গিফট আছে। সন্ধ্যায় সবাই এল শ্যাওড়াপাড়ার একটা রেস্টুরেন্টে। আমি বিভুদাকে কিছু টাকা দিলাম, যা দিয়ে একটি গ্রামের সংসার দুই মাস অনায়াসে চলতে পারে। এটা দিয়েছিলাম নতুন একটি ট্যাব কিনতে। বিভুদা একটা বড় অংকের টাকার কথা বললেন। আমি ঠিক করে রেখেছিলাম তাকে ট্যাবের টাকার অতিরিক্ত আরও কিছু টাকা দেব। কিন্তু ইউরোপ থেকে গিফট পাওয়া ইউরোগুলো ভাঙানো হয়নি তখনো। বললাম, একটু ধীরে নেন। আমি কেন পরদিনই দেব না, এই অভিমানে আমি তখন ওয়াশরুমে গিয়েছি, বিভুদা হাবিবকে বলেছিলেন, তাকে এইমাত্র দেওয়া টাকাগুলো তিনি ফেরত দিতে চান। আমি এটা শুনে শুধু বলেছি, এত তাড়া কেন বিভুদা?
আমি একটা পোস্ট দিয়েছিলাম, এক বিবেচনায় সব সরকারি কর্মচারীই স্বৈরাচারের দোসর, কারণ তাদের কেউই ৫ অগাস্ট মধ্যাহ্ন পর্যন্ত পদত্যাগ না করে সরকারকে ফাংশন করতে সহযোগিতা করেছেন। এই বিবেচনায় আমিও দোসর।
বিভুদার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, সামান্য অভিমান থাকতে পারে, তার প্রতি আছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। শফিক রেহমান যখন সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায় আমাকে নেওয়ার কথা ভাবছিলেন, বিভুদা যদি তখন বলতেন, না থাক দরকার নেই, আমাকে হয়তো গ্রামের সেই স্কুল নিয়েই পড়ে থাকতে হতো। শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, অকৃতজ্ঞই সবচেয়ে বাজে গালি। আমি কেন অকৃতজ্ঞ হতে যাব?
একটা বিখ্যাত উক্তি আছে: এই পৃথিবী খুব সুন্দর, অসুন্দর শুধু মানুষ। আমি যেহেতু মানুষ, আমি তাই অসুন্দর! যদি সদ্য ঘুরে আসা ফিনল্যান্ডের একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য হতে পারতাম!
