১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ক্রিকেট: দ্বিতীয় টেস্ট প্রথমটা জয়ের আনন্দ মাটি করে দিল

ডারউইনে বিশ্বের এক নম্বর দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়া, আর ম্যাকাইয়ে দুই দিনে গুটিয়ে যাওয়া—এক টেস্টের ব্যবধানে এ যেন দুটি আলাদা বাংলাদেশ দল!

ক্রিকেট: দ্বিতীয় টেস্ট প্রথমটা জয়ের আনন্দ মাটি করে দিল
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী দলকে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয়ের উদযাপনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

সালেহ উদ্দিন আহমদ সালেহ উদ্দিন আহমদ

Published : 24 Aug 2026, 09:40 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:00 PM

আমি ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ। তবে এই বয়সে টেস্ট ক্রিকেট খুব একটা দেখা হয় না। এইবার ডারউইনে প্রথম টেস্টে টিভি খুলেছিলাম শুধু দেখার জন্য যে দুই দলে কোন কোন খেলোয়াড় খেলছেন। সেই পাঁচ মিনিটের সেশন সারা রাত গড়াল। ওঠার উপায় ছিল না, চোখ ফেরাবার সুযোগ ছিল না। প্রাণ ভরে দেখলাম আমাদের তরুণদের খেলা। হাসান মাহমুদের বোলিং খেলায় স্টার্ক ও কামিন্সদের উপস্থিতি ভুলিয়ে দিয়েছিল। প্রতিটা দিন টি-টোয়েন্টির আনন্দ নিয়ে ডারউইনের টেস্ট দেখলাম। বাংলাদেশ ব্যাটিংয়েই-বা কম কিসে? তানজিদ, মুমিনুল, নাজমুল সবাই স্টার্কের বোলিংকে বোকা বানিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যাট করলেন। মিরাজই-বা কম কিসে! নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ টেল-এন্ডারদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এক নম্বর ক্রিকেট দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ টেস্ট খেলাটা জিতে নিল। কোনো ভাগ্যের জোরে নয়, খেলে তারা জিতেছে টেস্টটা। প্রথম টেস্টের খেলায় বাংলাদেশ দলকে একটুও দোদুল্যমান মনে হয়নি; মনে হচ্ছিল এভাবে খেলতেই তারা অভ্যস্ত, এই জয়ই তাদের প্রাপ্য। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা বাহবা কুড়িয়েছেন, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের প্রশংসায় ভেসেছেন।

পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করে লিখেছেন, “অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের কী অসাধারণ জয়! এই জয় প্রমাণ করে, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ কতটা উন্নতি করেছে এবং তাদের অগ্রাধিকার কোথায়।” ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটার কেভিন পিটারসেন একবাক্যে মুগ্ধতা প্রকাশ করে লিখেছেন, “বাংলাদেশ—ওয়াও!” অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ক্রিকেটার উসমান খাজা বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য ও প্রকৃত চেতনার দারুণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, “প্রতিপক্ষের মাটিতে এমন দাপুটে পারফরম্যান্স যে ক্রিকেটের বড় দলগুলোকেও মুগ্ধ করতে পারে—বাংলাদেশ যেন সেটাই প্রমাণ করল।“ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স স্বীকার করেছিলেন যে, বাংলাদেশ সব বিভাগেই তাদের চেয়ে ভালো খেলেছে এবং ম্যাচের প্রথম দিনেই তারা পিছিয়ে পড়েছিল। বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলকে হারিয়ে দেওয়ার পর ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে হচ্ছিল, এখন বোধহয় টেস্টে আমরাই পৃথিবীর সেরা দল!

তবে এ স্বপ্নভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় টেস্টটাও একই আনন্দ নিয়ে দেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্রথম টেস্টের সঙ্গে কিছুই মিলছিল না। এ কোন বাংলাদেশ দল? এ কোন হাসান মাহমুদ, এই তানজিদই কি প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন? সবকিছু যেন কেমন গোলমাল লাগছিল।

ম্যাকাইয়ের পিচ খুব সহজ ছিল না ব্যাটারদের জন্য; বিশেষত প্রথম ইনিংসে বাড়তি বাউন্স ও বাতাসে সুইং ছিল। স্টার্ক তার পুরা সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের বেশ কয়েকজন ব্যাটার খারাপ শট খেলে আউট হয়েছেন। তাদের শারীরিক ভাষাও ছিল দারুণ দোদুল্যমান, যেন কেমন কুকড়ে যাচ্ছিলেন।

টেস্ট খেলার প্রথম ছবক হলো—দৃঢ়তা দেখাও, প্রতিকূল অবস্থায় উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাক, একসময় পিচ সহজ হবে, তখন রান আসবে। আমাদের ব্যাটাররা সেইভাবে খেলতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে পিচের অবস্থা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও তার সুফলও তারা নিতে পারেননি। ফলে দুই ইনিংসেই বাংলাদেশ ১০০ রানের নিচে গুটিয়ে যায়।

বাংলাদেশি ব্যাটারদের মানসিক দুর্বলতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, তা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। যতদিন ভালো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে এই জড়সড় ভাব থাকবে, ততদিন সম্ভবত ব্যাটিংয়ের এই দুরবস্থা থাকবে। এর মধ্যেও আমরা মাঝে মাঝে ডারউইনের মতো ভালো ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখতে পাব নিশ্চয়ই।

দ্বিতীয় টেস্টে হাসান মাহমুদকে কেমন নিষ্প্রভ মনে হয়েছে। তিনি প্রথম টেস্টের মতো কার্যকর দ্বিতীয় টেস্টে ছিলেন না। তাই বলে তার বোলিং স্কিল নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই। শরিফুল হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের স্টার্ক। দ্বিতীয় টেস্ট দেখার সবচেয়ে বড় পাওনা ছিল শরিফুলের বোলিং। শরিফুলের এত দুর্দান্ত বোলিং দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানে সীমাবদ্ধ রেখেও বাংলাদেশকে এত বাজেভাবে যে হারতে হয়েছে, সেটা খুব দুঃখের ব্যাপার। তাইজুলও অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে বোলিং করেছেন। তাসকিন নিজের সুনাম রাখতে পারেননি; তার বোলিংয়ে শৃঙ্খলা ছিল না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস যখন টেল-এন্ডে নিভু নিভু, তখন তাসকিনের এক ওভারে ১৭ রান দেওয়া খুব দৃষ্টিকটু লেগেছে। পাঁচ দিনের খেলা গুটিয়ে গেল দুই দিনে। অস্ট্রেলিয়াতে ৯৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত টেস্ট দেখলাম আমরা। অস্ট্রেলিয়ায় এর চেয়ে কম বলে টেস্ট শেষ হয়েছে একটিই, সেই ১৯৩২ সালে। টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ এটি।

তাই বলছিলাম, দর্শক হিসেবে প্রথম টেস্টে যে আনন্দ পেয়েছিলাম, দ্বিতীয় টেস্ট দেখে সেটা মিলিয়ে গেল। যদিও সিরিজ ১-১ এ শেষ হয়েছে, খেলা শেষে অস্ট্রেলিয়া এক নম্বরেই রয়ে গেল। আর বাংলাদেশ? তবু আমরা আশাবাদী, একদিন বাংলাদেশ প্রথম টেস্টে যেমন জিতেছিল, দ্বিতীয় টেস্টেও তেমন করে জিতবে।

বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে—দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ডারউইন টেস্টের জয়ের গুরুত্ব তিনি আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি বলেছেন, “আসলে অনেক বড় দলকে আমরা হারিয়েছি। এটা গর্বের ব্যাপার এবং এই জয় আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য অনেক সাহায্য করবে।”

অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া বড় দল এবং দ্বিতীয় টেস্টে তারা বাংলাদেশকে হারাতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিল। তবে তাদেরকে বেশি চেষ্টা করতে হয়নি। অতি সহজেই দুই দিনে তারা বাংলাদেশকে হারিয়ে দিয়েছে। তবে নাজমুলের কথাও সত্য, প্রথম টেস্টের জয় ক্রিকেট রেকর্ড বইতে লেখা হয়ে গেছে এবং এই জয় থেকে বাংলাদেশের তরুণ খেলোয়াড়েরা ভবিষ্যতে অনেক অনুপ্রেরণা পাবে।

আমার এই মূল্যায়ন নিছক একজন দর্শকের। যারা ক্রিকেট অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানী, তাদের নিশ্চয়ই ভিন্ন মূল্যায়ন থাকবে।

সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: saleh.u.ahmed@gmail.com