Published : 29 Jul 2026, 04:24 PM
১৯৪৭ সালের ভারত-ভাগের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীর নামের ভূখণ্ডটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) এই ভূখণ্ডকে ভাগ করেছে, আর পাকিস্তানের অংশে গড়ে উঠেছে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (AJK) নামের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে থাকা এই অঞ্চলটি ২০২৪ সাল থেকে পরপর কয়েক দফা গণআন্দোলনের সাক্ষী হয়ে আছে, যার সবশেষ ও সবচেয়ে সহিংস পর্বটি ২০২৬ সালের জুন মাসে শুরু হয়ে এখনো অব্যাহত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি: বিভক্তির ভূগোল
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার সময় জম্মু ও কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং প্রথমে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের উপজাতীয় লশকর যোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে তিনি ভারতের সামরিক সহায়তা নিতে বাধ্য হন এবং অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন।
১৯৪৭-৪৮ সালের যুদ্ধ শেষে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি রেখা টানা হয়, যা পরবর্তীকালে নিয়ন্ত্রণরেখা বা LoC নামে পরিচিত হয়। এই রেখার একপাশে ভারতের অধীনে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ, অন্যপাশে পাকিস্তানের অধীনে আজাদ জম্মু-কাশ্মীর ও গিলগিত-বালতিস্তান গড়ে ওঠে। ভূরাজনীতির ভাষায় বলা যায়, এই বিভাজন কোনো স্থায়ী নিষ্পত্তি ছিল না—বরং শক্তির ভারসাম্যে গড়ে ওঠা একটি অস্থায়ী স্থিতাবস্থা, যা প্রায় আট দশক ধরে টিকে আছে কেবল উভয় রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ক্ষমতার কারণে।
২০২৬ সালের আন্দোলন: অর্থনৈতিক ক্ষোভের নতুন ঢেউ
আজাদ কাশ্মীরে গণঅসন্তোষ নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও গম সরবরাহে অনিয়মের প্রতিবাদ দিয়ে যে ধারার সূচনা, তা ২০২৪ সালের মে মাসে বড় আকারে বিস্ফোরিত হয়। জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC) নামের একটি বেসামরিক জোট—যাতে ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, আইনজীবী ও শিক্ষার্থীরা যুক্ত—এই আন্দোলনগুলোর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ সালে ছয় দিনের প্রতিবাদের পর ইসলামাবাদ প্রায় সব দাবি মেনে নেয় এবং প্রায় ৮২ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অনুদান ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দ্বিতীয় দফার আন্দোলনে মুজাফফরাবাদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের সংকট ভিন্ন প্রকৃতির। এবারের কেন্দ্রীয় বিতর্ক নিছক ভর্তুকি বা করছাড় নিয়ে নয়—প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে। আজাদ কাশ্মীর আইনসভায় ৪৫টি আসনের মধ্যে ১২টি আসন সংরক্ষিত আছে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশে বসবাসরত কাশ্মীরি শরণার্থী ও তাদের বংশধরদের জন্য। আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির দাবি, এই সংরক্ষিত আসনব্যবস্থা পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে আজাদ কাশ্মীরের সরকার গঠনে অতিরিক্ত প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয় এবং প্রকৃত বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব খর্ব করে। ২০২৬ সালের ৭ জুন আজাদ কাশ্মীর সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে এই আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং সাংবিধানিক সংশোধনী ছাড়া বাতিল করা যাবে না। এই রায় আন্দোলনে নতুন উত্তেজনা যোগ করে।
অর্থনৈতিক দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এরপর থেকে প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় দমন ও সহিংসতা
সরকার JAAC-কে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর সংঘাত তীব্রতর হয়। রাওয়ালাকোটে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে একদিনেই এগারো জন নিহত হন। জুন মাসের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত সংঘর্ষে ৪০ জনের মতো খুন হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সীমান্তবর্তী পুঞ্চ বিভাগ—যেখান থেকে অসন্তোষের সূত্রপাত—কয়েক সপ্তাহ কার্যত অবরুদ্ধ ছিল, ফলে খাদ্যসরবরাহ ব্যাহত হয়। মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বিস্তৃত এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে, ব্যাংক দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল। JAAC-এর শীর্ষ নেতা শওকত নওয়াজ মীরকে ধরিয়ে দিতে সরকার এক কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। অবশেষে জুনের শেষ সপ্তাহে বাগ জেলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যদিও পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সহিংস উপাদান দমনই তাদের লক্ষ্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন নয়।
বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক বৈধতা
এই অস্থিরতার মধ্যেই আজাদ কাশ্মীর আইনসভার সাধারণ নির্বাচন তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—২৭ জুলাই মিরপুর বিভাগে, পরে মুজাফফরাবাদ ও পুঞ্চ বিভাগে। এই নির্বাচন ১৯৭০ সাল থেকে অনুষ্ঠিত এগারোটি নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২১ সালে ৫৩টির মধ্যে ৩২টি আসন জেতা তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI) এবার নির্বাচন বর্জন করেছে, এই যুক্তিতে যে চলমান সংকট ও সরকারের দমননীতির মধ্যে অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। এর ফলে সবচেয়ে বড় দলটির অনুপস্থিতিতে মুসলিম লীগ (নওয়াজ), পিপলস পার্টি ও ইস্তেহকাম-ই-পাকিস্তান পার্টির (IPP) মধ্যে চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC) নিজেরাও নির্বাচন বর্জন করেছে এবং এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে অভিহিত করছে, যেহেতু তাদের মূল দাবি—সংরক্ষিত আসন বিলোপের প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার পাকিস্তান সেনা সদস্য নির্বাচনি নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিফলন।
বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্ন ও বাস্তবতা
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো যেকোনো অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা। পাকিস্তানের কিছু কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বহিঃশক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চাইতে পারে, আর ভারত এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিতভাবে অস্বীকার করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত কোনো স্বাধীন সূত্রে এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই যে কোনো রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এই আন্দোলন পরিচালনা করছে।
হান্স মর্গেন্থাউয়ের বাস্তববাদী কাঠামোয় বিচার করলে বলা যায়—রাষ্ট্রগুলো সুযোগ পেলে প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর প্রবণতা দেখায়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সংকটের পেছনে বহিঃশক্তির হাত থাকতে হবে। বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি স্থানীয়—অর্থনৈতিক বঞ্চনা, প্রশাসনিক দূরত্ব এবং প্রতিনিধিত্বহীনতার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য
আজাদ কাশ্মীরের অস্থিরতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি কাশ্মীর প্রশ্নের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ, যেখানে ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই নিয়ন্ত্রণরেখার নিজ নিজ অংশে বৈধতার সংকট মোকাবিলা করছে।
কাঠামোগত বাস্তববাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিমেরু কাঠামোয় যেকোনো অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত প্রচারণার উপাদানে পরিণত হয়—ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও কূটনীতিতে আজাদ কাশ্মীরের সংকট ইতিমধ্যে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাস্তবতাবাদী কূটনীতির যুক্তিতে বলা যায়, ইসলামাবাদের জন্য এই সংকট একটি কৌশলগত দ্বিধা তৈরি করে: দমননীতি প্রয়োগ করলে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এবং কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়; আবার ছাড় দিলে গিলগিত-বালতিস্তান ও অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলেও একই ধরনের দাবি উসকে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
সম্ভাব্য পরিণতি
১. সবচেয়ে সম্ভাব্য: নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার আংশিক সাংবিধানিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক প্যাকেজের মাধ্যমে আন্দোলনের তীব্রতা প্রশমিত করবে, তবে অন্তর্নিহিত অসন্তোষ থেকে যাবে এবং কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন দফায় ফিরে আসতে পারে—যেমনটি ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে।
২. মাঝারি সম্ভাবনা: আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপ নেবে, যেখানে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার সংস্কার একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হয়ে উঠবে।
৩. কম সম্ভাবনা তবে অসম্ভব নয়: আন্দোলনের একাংশ স্বাধীনতা বা ভারত-পাকিস্তান উভয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির দাবিকে জোরালো করবে। তবে বর্তমানে আন্দোলনের মধ্যে দাবির ঐক্যের অভাব, পাকিস্তানের দৃঢ় রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সীমিত সম্পৃক্ততা এই সম্ভাবনাকে সীমিত রাখছে।
আজাদ জম্মু-কাশ্মীরের ২০২৬ সালের আন্দোলন দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে—যেখানে একটি দীর্ঘদিনের ভূ-কৌশলগত বিরোধের প্রান্তিক অঞ্চল হঠাৎ নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্সি নিয়ে সামনে এসেছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে কাশ্মীর প্রশ্ন কেবল ভারত-পাকিস্তান আন্তঃরাষ্ট্রিক বিরোধ নয়, বরং তার ভেতরে বসবাসকারী মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি ও পরিচয়ের সংগ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদ কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে, তার ওপর নির্ভর করবে আজাদ কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এবং সম্ভবত বৃহত্তর কাশ্মীর বিরোধেও পাকিস্তানের নৈতিক অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা।
ড. মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com