Published : 04 Sep 2026, 01:37 PM
সেদিন একজন বলেই বসলেন, আপনি তো সারাদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ এআইয়ের সব ভালো ভালো দিক নিয়ে লেখেন; এটার কি কোনো খারাপ দিক নেই?
একটু হেসে বললাম, অবশ্যই আছে! আর শুধু খারাপ দিক কেন বলছেন, আমি তো বলব এর সবচেয়ে বড় ভিকটিম তো আমি নিজেই।
আমি যে শুধু এআইয়ের নতুন নতুন প্রযুক্তি আর সিস্টেম নিয়ে কাজ করি তা নয়; পাশাপাশি নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্টের মতো জটিল প্রক্রিয়ার ভেতরেও আমাকে বড় একটা সময় পার করতে হয়েছে। যখন সরকারি চাকরিতে ছিলাম, তখনকার অভিজ্ঞতা তো অন্য মাপের। সেখানে কিছু কিছু ব্যবস্থা অবশ্য ‘এয়ার গ্যাপ’ সমাধান ছিল, অর্থাৎ বাইরের দুনিয়া থেকে একদম সংযোগ বন্ধ করা। কিন্তু যেসব নেটওয়ার্ক সরাসরি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলোতে মাঝে মাঝেই ‘ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনাইল অব সার্ভিস’ সংক্ষেপে ‘ডিডস’ (DDoS) অ্যাটাক পেতাম।
ধরুন একটি নেটওয়ার্কের সাধারণ ক্ষমতা হলো এক লাখ তথ্যের ডেটা প্যাকেট প্রক্রিয়া করার। কিন্তু সাইবার অপরাধীরা বাইরে বহু জায়গা থেকে একসঙ্গে কোটি কোটি বাড়তি ডেটা প্যাকেট পাঠিয়ে ওই পুরো ব্যবস্থাটিকে নিমেষের মধ্যে ধসিয়ে দিত। ফলাফল? সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ! পুরো নেটওয়ার্ক একদম অচল হয়ে বসে থাকত।
পরে যখন প্রাইভেট সেক্টরে এলাম, তখন দেখলাম এই ঝামেলার সরাসারি প্রভাব পড়ে ব্যবসায়িক আয়ে। মানে আপনার নেটওয়ার্ক যদি দুই ঘণ্টার জন্য ডাউন থাকে, গ্রাহকরা সেবা পাবে না, ব্যবসার লাইফলাইন আটকে যাবে আর দিনশেষে কোম্পানির আয় বন্ধ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, এ ধরনের ভয়াবহ সাইবার হামলাগুলো স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই দিয়ে এত নিখুঁতভাবে করা যায় যে তার পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।
তাহলে এটাই কি এআইয়ের সবচেয়ে খারাপ দিক? না। সিকিউরিটি বা সাইবার হামলার থেকেও মারাত্মক এবং আরও ভয়ঙ্কর একটা গোপন দিক আছে এআইয়ের। এর সবচেয়ে খারাপ দিকটা হলো, আমি বা আপনি যে ধরনের ধারণা বা চিন্তা মনে নিয়ে কথা বলতে শুরু করি, এআই সবসময় আমার-আপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওই একই ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করার চেষ্টা করে! আপনার ধারণার পক্ষে সাফাই গেয়ে চমৎকার সব লজিক দাঁড় করিয়ে দেবে।
ধরুন আপনি ক্যারিয়ারে বা বিজনেসে একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে গুরুতর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। পেশাগত জীবনে যে কোনো সিদ্ধান্ত ঠিকঠাক তথ্যভিত্তিক হওয়া জরুরি। কিন্তু আপনি যখন নিজের মনের মধ্যে আগে থেকেই একটা বিশেষ চিন্তা বানিয়ে নিয়ে এআইকে জিজ্ঞেস করবেন, এআই তখন চতুর বন্ধুর মতো আপনার সঙ্গেই সব কথা মেলাতে থাকবে। সে ডেটাগুলোকে এমনভাবে সাজিয়ে আপনার সামনে উপস্থাপন করবে, যাতে মনে হবে আপনার আইডিয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্যের সমাধান। এটা একটা বিশাল স্লপ।
মানুষ এমনিতেই এক মানসিক প্রবণতায় ভোগে, যাকে বলা হয় 'কনফার্মেশন বায়াস'। মানে আমরা নিজেদের মনের মতো উত্তরটাই শুনতে পছন্দ করি। এখন ভাবুন, আপনার ওই মানসিক দুর্বলতাকে যদি এআই আরও চার গুণ বাড়িয়ে দেয়, তবে তা কতটা ভয়াবহ! আপনি কখনোই ওই চিন্তার সত্যিকারের বাস্তবতা বা লুকানো ঝুঁকিগুলো খালি চোখে দেখতে পাবেন না।
ধরুন আপনি একটা নতুন প্রকল্প শুরু করতে চান। আপনার মাথায় খুব দৃঢ় একটি ধারণা কাজ করছে যে, বাজারে এই সেবার বিশাল চাহিদা আছে এবং আগামী এক বছরে এখান থেকেই কোটি টাকার মুনাফা বের করা সম্ভব। আপনি প্রম্পট বক্সে গিয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে লিখলেন, “আমি বাজারে এই নতুন সেবাটি আনতে যাচ্ছি। আমাকে বলো কেন এই চিন্তাটি দারুণ সফল হবে এবং মানুষ কেন এটি লুফে নেবে?”
আপনি বোতাম চাপতেই এআই কী করবে জানেন? সে সেকেন্ডের মধ্যে অন্তত দশটি পয়েন্টের লম্বা তালিকা বের করে আপনার হাতে দিয়ে দেবে! সেখানে সে লিখবে কীভাবে আপনার ভাবনাটি বাজার বদলে দেবে, গ্রাহকেরা কেন এটার জন্য লাইন দেবে আর কেমন করে এটি একটি বিপ্লব ঘটাবে। আপনি তো ওই ফলাফল ও লজিকগুলো পড়ে একদম গলে যাবেন! মনে মনে ভাববেন, যাক, আমার চিন্তাভাবনা একদম সঠিক; কারণ এআই নিজেই যখন এর সাফল্যের হার বলে দিল, তখন আর ঠেকায় কে!
কিন্তু আসল ট্র্যাজেডি ঠিক এখানেই শুরু হলো! আপনি যদি সেই একই জায়গায় গিয়ে একটু অন্যভাবে বলতেন, “আমি এই সেবাটি বাজারে শুরু করতে চাচ্ছি। আমাকে বলো এই ব্যবসার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা কতটা এবং কোন কোন কারণে আমি ক্ষতির মুখে পড়তে পারি?”
তখন চমকে গিয়ে দেখবেন, ওই একই এআই আবার কিন্তু আপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরোপুরি উল্টো সুরে কথা বলা শুরু করবে! সে আপনাকে হুবহু দশটি শক্ত লজিক দেখিয়ে বুঝাবে কেন এই উদ্যোগটি পুরোপুরি ব্যর্থ হতে পারে, বাজারে কোথায় কোথায় বিরাট ঝুঁকি লুকিয়ে আছে আর কেন গ্রাহকেরা এই সেবা পছন্দ না-ও করতে পারেন।
অর্থাৎ, এআইয়ের নিজস্ব কোনো বাস্তবতা যাচাই করার বিবেক বা নিরপেক্ষ চিন্তাভাবনা নেই। আপনি যেদিক থেকে পানি ঢালবেন, সে সেই ঢাল বেয়েই নিচে নামবে। আপনার বানানো ধারণাতে ভুল থাকলেও, আপনার বলা সুরেই সুর মিলিয়ে সে গান গাইবে। আর এই মিষ্টি ফাঁদে পড়েই সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলো মানুষ নিজের অজান্তে নিয়ে ফেলছে।
পেশাগত জীবনে আমরা যখন কোনো জটিল সমস্যা সমাধান করি, তখন সবচেয়ে বেশি দরকার হয় একজন নিরপেক্ষ সমালোচকের, যে আমার চিন্তার সবচেয়ে বড় ভুলগুলো চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। ওই মানুষটি যেভাবে ত্রুটি খুঁজে বের করবে, প্রযুক্তি বা সঙ্গীর কাছ থেকে আমাদের কিন্তু ওই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিটাই কাম্য। কিন্তু এআইয়ের মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে আপনাকে সন্তুষ্ট রাখার প্রক্রিয়ায়। আপনি যা শুনতে ভালোবাসেন, সে আপনাকে সেটাকেই সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপহার দেবে।
ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে? তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের নামে আপনি দিনশেষে নিজের কনফার্মেশন বায়াসের শিকার হচ্ছেন। এআই আপনাকে যে 'ভুল' আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে, তার ওপর ভর করে আপনি যখন বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নামছেন, তখন বাস্তবতা আপনার সামনে এসে একটি বিরাট ধাক্কা দেবে। আর ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়তো হয়েই যাবে।
সাইবার হামলা করে হয়তো কোনো একটি নেটওয়ার্কের সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা যায়, কিছু সময়ের জন্য কোম্পানির কাজকর্ম স্থবির করে রাখা যায়; কিন্তু এআইয়ের এই 'হ্যাঁ-তে হ্যাঁ' মেলানোর প্রবণতা আপনার পুরো চিন্তাধারা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্মপদ্ধতি আস্তে আস্তে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। এটাই এই প্রযুক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ ও ক্ষতিকর দিক।
তাই এআইকে কোনোদিন নিজের সব সিদ্ধান্তের অভিভাবক ভাববেন না। এটাকে একটি বুদ্ধিমান 'টুল' হিসেবে ব্যবহার করুন। নিজের চোখ আর সত্যিকারের উপাত্ত ও তথ্যের ওপর ভরসা রাখুন। এআই যদি আপনার ধারণার সঙ্গে খুব বেশি তাল মেলাতে শুরু করে, তখনই সচেতন হয়ে ভাবুন, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! এআই আপনাকে সত্যিটা দেখাচ্ছে না; সে কেবল আপনার ভেতরের 'ইগো' আর চাওয়াটাকে 'সন্তুষ্ট' করার অজানা এক খেলায় নেমেছে!
রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক লেখক। ই-মেইল: rakibul.hassan.mail@gmail.com