১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এই ‘শিল্প-গণহত্যা’ কী বার্তা দেয়

কোনো অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের প্রতিক্রিয়া দেখে অনুমান করা যায় পরে কী ঘটতে যাচ্ছে। দেশে কী ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আসতে চলেছে।

এই ‘শিল্প-গণহত্যা’ কী বার্তা দেয়
অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে হামলা হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর কমপ্লেক্সে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ম্যুরালসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে হামলাকারীরা।

এম. টি. ইসলাম এম. টি. ইসলাম

Published : 17 Aug 2024, 11:12 AM

Updated : 26 Aug 2026, 10:16 AM

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বুকের রক্ত দিয়ে গত ৫ অগাস্ট যে গণঅভ্যুত্থান করেছে সেটির প্রতিক্রিয়া এখনও চলমান। ইতিহাসে দেখা যায়, এই ধরনের গণঅভ্যুত্থানের পর তাৎক্ষণিক একটা প্রতিক্রিয়া হয়, যা একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে চলতে থাকে; তবে প্রকাশের ধরন হয় ভিন্ন ভিন্ন। অধিকাংশ সময়ে এই প্রতিক্রিয়া ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়, প্রতিশোধপ্রবণও হয়। এই ধরনের অভ্যুত্থানের পর যে প্রতিক্রিয়া হয় তার মধ্যে অন্যতম পতিত শাসকের স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনায় হামলা এবং সেগুলো নিশ্চিহ্ন করা।

কোনো অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের প্রতিক্রিয়া দেখে অনুমান করা যায় পরে কী ঘটতে যাচ্ছে। দেশে কী ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আসতে চলেছে। যদি এই ক্ষেত্রে ‘ফরাসি বিপ্লব’কে উদাহরণ হিসেবে আনা হয় তাহলে দেখা যায় ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার উৎপত্তি হয়েছিল।

ফরাসি বিপ্লব মূলত ১৭৮৯ সালের মে মাস থেকে ১৭৯৯ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’— এই তিন মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে সংগঠিত হয় বিপ্লবটি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ওই রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান তুলনীয় না হলেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংসতা বিশ্লেষণের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সেটি। কারণ ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে যত গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয়েছে, তা এ ধরনের আর কোনো ক্ষেত্রে হয়নি।

ফরাসি বিপ্লবের পরে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ যে ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল তাকে তাত্ত্বিকরা ‘রেভ্যুলুশনারি ভ্যান্ডালিজম’ বলে উল্লেখ করেছেন। মূলত ফরাসি বিপ্লবের পরেই ‘ভ্যান্ডালিজম’ পরিভাষার উৎপত্তি হয়; যে বিপ্লব পৃথিবীজুড়ে নতুন যুগের সূচনা করে। বলা হয় এই ফরাসি বিপ্লব পরবর্তীতে ১৯০৫ সালের অক্টোবর বিপ্লবসহ সারা পৃথিবীতে অসংখ্য সফল বিপ্লবের জন্ম দেয়।

বাস্তিল দুর্গ পতনের মাধ্যমে শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব, যা সমাপ্ত হয় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে। ওই বিপ্লবের পর যে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, সেটিকে বর্ণনা করতেই ‘রেভ্যুলুশনারি ভ্যান্ডালিজম’ পরিভাষার ব্যবহার করা হয়। যেহেতু দীর্ঘ এক দশক ধরে চলে এই বিপ্লবের লড়াই, সেহেতু তার প্রতিক্রিয়াও ছিল বেশ দীর্ঘ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা অংশীদার যুক্ত হয় এই বিপ্লবে।

ফরাসি বিপ্লবের যুদ্ধ মূলত চার পক্ষের মধ্যে ছিল— বিপ্লবীগোষ্ঠী বনাম শাসকগোষ্ঠী, ধর্মযাজক ও বৈদেশিক শক্তি। দীর্ঘসময় চলার কারণে কে এই বিপ্লবের শত্রু, কে মিত্র তা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই, বিপ্লব-পরবর্তী সহিংসতার স্পষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যও ফুটে ওঠে।

বিপ্লবের পর সংগঠিত ‘রেভ্যুলুশনারি ভ্যান্ডালিজম’ তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এক. ফ্রান্সের ১৪তম রাজা লুইয়ের ক্ষমতা ও দাম্ভিকতার চিহ্নগুলো গুড়িয়ে বা পুড়িয়ে দেওয়া। দুই. রাজা লুইসহ বিপ্লব-বিরোধীদের (কাউন্টার রেভ্যুলুশনারিদের) গিলোটিনে হত্যা। তিন. রাজা লুইয়ের শোষণের হাতিয়ারগুলো ধ্বংস করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ফরাসী বিপ্লবে রাজা লুইয়ের পতনের পর বিপ্লবীরা ফ্রান্সের কর অফিসগুলো পুড়িয়ে দেয়।

কিন্তু একই সঙ্গে লক্ষ্য করা যায়, এই দীর্ঘ নৈরাজ্যের মধ্যে কেউ গণহারে ফরাসি দেশের শিল্পকর্ম ধ্বংস করেনি। কেউ ফরাসি জাতির গৌরবের সঙ্গে জড়িত কোনো চিহ্ন ধ্বংস করেনি। সপ্তাহখানেক ধরে দেখছি, আমাদের জ্ঞানীজনেরা শিক্ষার্থীদের গণঅভ্যুত্থান শেষে পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞকে জায়েজ করতে ফরাসি বিপ্লবের কথা বলছেন বারবার। ফ্রান্সের ওই বিপ্লব-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ বিপুল হলেও তার উদ্দেশ্য ছিল রাজশোষণের অবসান ঘটিয়ে একটা স্বাধীন, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়া।

যদি ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানে ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এক. গোটাবায়া রাজাপাকসে পরিবারের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও আগুন দেওয়া। দুই. শ্রীলঙ্কার জাতীয় গর্বের প্রতীক রাষ্ট্রপতি ভবনের গেট ভেঙে ঢুকে পড়া ও ভাঙচুর করা। তিন. কিছু অভ্যুত্থানবিরোধীদের হত্যা করা। সেখানেও দেখা যায় কেউ শ্রীলঙ্কার শিল্পকর্ম ধ্বংস করেনি। কেউ ধর্মীয় উন্মাদনায় স্থাপত্য বা শিল্পকর্ম ধ্বংস করেনি। কেউ কোনো শিল্পীর বাড়িতে আগুন দেয়নি।

এবার যদি ৫ অগাস্ট সংগঠিত বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাই সেখানেও নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এক. ক্ষমতাসীনদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুট। দুই. বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে জড়িত চিহ্নগুলো ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়া। তিন. সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও লুট। চার. শিল্পাঙ্গনে হামলা করে ভাঙচুর ও লুট এবং শিল্প চর্চার সঙ্গে জড়িতদের ওপর হামলা। পাঁচ. বিভিন্ন স্থাপত্য শিল্প, পাঠাগার ভাঙচুর, প্রতিস্থাপন ও লুট।

বিশ্বের অন্যান্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এই অভ্যুত্থানকে তুলনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, প্রথমটি ছাড়া এখানে অন্যগুলো অনুপস্থিত। একটা গণঅভ্যুত্থানের পরে শোষণের সঙ্গে জড়িতদের ওপর হামলা পরিবর্তিত প্রক্রিয়ার সাধারণ বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের পর সংগঠিত পরবর্তী চারটি বৈশিষ্ট্য অন্য অর্থ দেয়। যদি দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলি নির্বিচারে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে জড়িত চিহ্নগুলো ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়া’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনোভাবেই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী নয়। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন হলো, সেই স্বাধীনতা তো সবার। জাতীয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা তো সবার সম্পদ। সেখানে হামলা ও ভাঙচুর কেন? শুধু একটি বা দুটি নয়, পুরো বাংলাদেশে এই হামলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ঐতিহাসিক মুজিবনগরের স্বাধীনতার যেসব অমর স্মৃতিচিহ্ন, সেখানে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ভাঙা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ চত্বরের প্রায় সব ভাস্কর্য। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতার স্থপতির বাড়িতে তার নামে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘর, যা কোনোভাবেই এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে না। মেহেরপুরে মুজিবনগর সরকার কমপ্লেক্সে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে।

আমরা যদি তৃতীয় বৈশিষ্ট্য দেখি ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও লুট’। সংখ্যালঘুরা কোনোভাবেই এই অভ্যুত্থানবিরোধী নয়। তারাও এই মাটির সন্তান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কোনোভাবেই এই শোষণের অংশ নয়। বরং তারা সব সরকারের আমলেই নিপীড়নের শিকার, সেটা কম আর বেশি। বিভিন্ন সরকারের আমলে তাদের শাসকের প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হয়েছে। তাই, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অন্য অর্থ দেয়। যা কোনোভাবেই অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া নয়। বরং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে এই হামলা ও লুট।

আমরা যদি চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি দেখি, ‘শিল্পাঙ্গনে হামলা করে ভাঙচুর ও লুট এবং শিল্প চর্চার সঙ্গে জড়িতদের ওপর হামলা’— সেটাও সন্দেহের সৃষ্টি করে। কারণ শিল্প চর্চার এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবেই শোষণের হাতিয়ার নয়। মুক্ত সংস্কৃতি চর্চার বিরোধী গোষ্ঠী ছাড়া কারও জন্যেই এই স্থাপনাগুলো শত্রু নয়। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সেটির সত্যতাও দেখা গেছে।

পঞ্চম ও শেষ বৈশিষ্ট্য ‘বিভিন্ন স্থাপত্য, ম্যুরাল ভাঙচুর ও প্রতিস্থাপন’, যা আরও বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ। অভ্যুত্থানের দিন থেকেই দেখা যায় দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দলবেঁধে বিভিন্ন স্থাপত্য ভাঙচুর করতে শুরু করে। এটি সাধারণ ভাঙচুর নয়। রীতিমত ‘শিল্প-গণহত্যা’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে গড়া জাদুঘর ভেঙে ক্ষ্যান্ত হয়নি। সর্বশেষ শোকাবহ ১৫ অগাস্টের আগের রাত থেকে দখল করে রাখা হয় ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের বাড়িটি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ওই বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন অনেক নারী-পুরুষ।