২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও করণীয়

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত শাসক দলের আদর্শিক ঝোঁক দ্বারা নির্ধারিত হয়, জাতীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। এই দলীয়করণ কূটনৈতিক ধারাবাহিকতাকে বিপন্ন করে।

বাংলাদেশের কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও করণীয়
স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি অনুসরণের কথা বলে আসছে বাংলাদেশ; কিন্তু বাস্তবে আঞ্চলিক চাপে, দেশীয় রাজনৈতিক সমীকরণে ও পরাশক্তির স্বার্থের কারণে সেখান থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

মঞ্জুরে খোদা মঞ্জুরে খোদা

Published : 13 Aug 2026, 10:07 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

কূটনীতি হলো রাষ্ট্রসমূহের সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আলোচনা, প্রতিনিধিত্ব এবং চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় কার্যপ্রণালি। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক দূতাবাসভিত্তিক কার্যক্রম নয়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও অর্জনের লক্ষ্যে প্রয়োগকৃত একটি রাজনৈতিক কৌশলও।

আর্নেস্ট স্যাটো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ গাইড টু ডিপ্লোম্যাটিক প্র্যাকটিস’-এ কূটনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের সরকারগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক পরিচালনায় বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রয়োগ।” জোসেফ নাই ‘সফট পাওয়ার’ কূটনীতির ধারণা উপস্থাপন করেন, যেখানে সামরিক বল প্রয়োগের পরিবর্তে সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও কূটনৈতিক আকর্ষণ দিয়ে প্রভাব বিস্তার করা হয়।

বাংলাদেশের কূটনীতিতে মূলত তিনটি বিষয়ে মুখ্য: ১) ভারত ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, ২) পশ্চিম এশিয়া, পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে উন্নয়ন সম্পর্ক এবং ৩) প্রবাসী রেমিট্যান্স রক্ষায় শ্রমকূটনীতি।

স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি অনুসরণের কথা বলে আসছে বাংলাদেশ; কিন্তু বাস্তবে আঞ্চলিক চাপে, দেশীয় রাজনৈতিক সমীকরণে ও পরাশক্তির স্বার্থের কারণে এখান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো কূটনৈতিক দুর্বলতা, পেশাদার কূটনীতির অভাব, দলীয় রাজনীতির প্রভাবে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অনুপস্থিতি।

স্বাধীন অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সমীকরণ

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য 'উন্নয়ন কূটনীতি' বা 'অর্থনৈতিক কূটনীতি' সবচেয়ে কার্যকর ধারা হিসেবে স্বীকৃত। এই কূটনীতি মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এফডিআই (বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ) আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ শ্রমশক্তির বাজার নিশ্চিত করা। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো 'কৌশলগত স্বাধীনতার' নীতিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির বলয়ে না গিয়ে সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক ধারা হলো অর্থনৈতিক, শ্রম ও পরিবেশ কূটনীতি; এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক বহুপক্ষীয় নীতি।

বর্তমান বিশ্বে সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কোনো ছোট বা মাঝারি শক্তির জন্য বাস্তবসম্মত নয়, তবে একটি আপেক্ষিক স্বতন্ত্র নীতি অর্জন সম্ভব। যেমন তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে; ভিয়েতনাম একদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এবং অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক একই সঙ্গে পরিচালনা করছে; মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া আসিয়ানের ছাতার নিচে থেকে বৃহৎ শক্তির চাপ থেকে কিছুটা নিরাপত্তা পাচ্ছে; আবার সিঙ্গাপুর একটি ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র হয়েও মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে 'কৌশলগত অস্পষ্টতা' নীতিতে নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে আঞ্চলিক সংহতি (সার্ক, বিমসটেক), বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনীতির বাস্তবতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে: (ক) জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা; (খ) অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা; (গ) আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান; (ঘ) আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্মান; (ঙ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা ও বর্ণবাদের বিরোধিতা।

বাস্তবতা হলো, এই সাংবিধানিক আদর্শ পূর্ণমাত্রায় পালিত হয়নি। শেখ হাসিনার আমলে (২০০৯–২০২৪) ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অনেক সমালোচক মনে করেন যে, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার নীতি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ঋণকূটনীতি এবং মার্কিন চাপের মধ্যে বাংলাদেশ কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত শাসক দলের আদর্শিক ঝোঁক দ্বারা নির্ধারিত হয়, জাতীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। এই দলীয়করণ কূটনৈতিক ধারাবাহিকতাকে বিপন্ন করে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টিন ফেয়ার মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত ভারত বা চীনের কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে, দুই দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। তবে তা কার্যকর করতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক শক্তি আরও বাড়াতে হবে।

ভারত, চীন ও নতুন সরকারের কৌশল

ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তিস্তা চুক্তি, ফারাক্কা বাঁধের পানি, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সংকট বিদ্যমান। শেখ হাসিনার সময়কাল নিয়ে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন যে, ভারতের সমর্থনে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার টিকে ছিল, যা সম্পর্কের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কোনো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা অপ্রতিসম অবস্থানে থাকলেও দরকষাকষির দক্ষতা, বিকল্প অংশীদারিত্ব ও আঞ্চলিক জোট থাকলে তা নতজানু কূটনীতিতে রূপ নেয় না। ওই লক্ষ্যে তিস্তা ও সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য, ট্রানজিট চুক্তির পুনর্বিন্যাস এবং বিমসটেক ও সার্ককে কার্যকর করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম আমদানি উৎস ও অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে চীনা প্রভাববলয় থেকে দূরে রাখা। তাই বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, বিআরআই প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ থাকা। শ্রীলঙ্কার ঋণজালের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে, আবার একতরফাভাবে চীন থেকে দূরে সরে বিশাল বিনিয়োগ ও বাজারও হারানো যাবে না।

বিএনপির নেতৃত্বে নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে। প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার বাইরে গিয়ে কি তারেক রহমান স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিতে পারবেন? উত্তর হয়তো হ্যাঁ, তবে সেখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে পশ্চিমা বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের সঙ্গেও। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে চীনা বিনিয়োগের প্রবাহ না থামানো, ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বৈধতা নিশ্চিত করা।

তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে নির্বাচন করা কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক টানাপোড়েন ও তাদের উদ্বেগের জায়গা থাকলেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজারগুলোর একটি এবং চীন সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। তবে চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ও ট্রানজিট সুবিধার কারণে ভারতকে দীর্ঘ সময় অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরকারটির উচিত হবে চীন ও মালয়েশিয়া সফরের পর ভারত সফরের পরিকল্পনা করা এবং তিস্তা, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুতে মর্যাদার সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করা।

কানাডার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের শিক্ষা

ষাটের দশকের শেষ দিকে কানাডায় একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে, কানাডা কি ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? ওই সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পাশে বাস করা অনেকটা একটি হাতির পাশে ঘুমানোর মতো। প্রাণীটি যতই বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্ত স্বভাবের হোক না কেন, তার প্রতিটি নড়াচড়া ও গর্জনের প্রভাব আমাদের ওপর পড়ে।” পরবর্তীতে যে বিষয়টি একাধিক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের শিরোনাম হয়েছে ও আলোচিত কূটনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এই ভাবনা 'থার্ড অপশন' নামেও পরিচিতি পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তির পাশে থেকে কানাডা নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, সংস্কৃতি ও বিকল্প বাণিজ্য (ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে) গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছে। কানাডার রাজনীতিতে এই ‘হাতির পাশে ঘুমানো’ উক্তিটি আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, মূল বার্তা হলো ছোট রাষ্ট্রকে পরাশক্তির পাশে থেকে বন্ধুত্ব বজায় রেখে নিজের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশও তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কানাডার এই নীতি ও অভিজ্ঞতা নিজেদের বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করে অনুসরণ করতে পারে।

মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com