Published : 15 Aug 2026, 12:01 PM
বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। ঘরে আলো জ্বালানো, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, কৃষির সেচ, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই এখন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে কোনো পরিবর্তন যখন মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে, তখন সেটিকে কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বার্থ, ভোক্তার অধিকার, স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
সম্প্রতি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার বড়খাতা হাইস্কুল মাঠে সামাজিক আন্দোলন পরিষদের আয়োজনে প্রি-পেইড মিটার বাতিলসহ জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। সমাবেশের দৃশ্য বলছে, বিষয়টি কেবল কয়েকজন গ্রাহকের অসন্তোষ নয়; এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর জনভোগান্তির অভিজ্ঞতা। এ বিক্ষোভ সমাবেশ শুধু বড়খাতেই হচ্ছে এমন নয়, গোটা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইতোমধ্যে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার বাতিল, অতিরিক্ত বিল ও মিটার ভাড়ার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ, নীলফামারী, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাগরিক সমাজ ও সাধারণ গ্রাহকেরা প্রি-পেইড মিটারের কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। রংপুর অঞ্চলের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রেজেকা সুলতানা ফেন্সী এই দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে কথা বলেছেন। তিস্তার দুই তীরের ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর অনেক সংগঠকও প্রি-পেইড মিটারের অসঙ্গতি ও ভোগান্তি নিয়ে বিক্ষুব্ধ।
প্রশ্ন হলো—প্রি-পেইড মিটার কি সত্যিই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার আধুনিক সমাধান, নাকি মানুষের ওপর নতুন ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করছে?
প্রি-পেইড মিটারের পক্ষে যুক্তি অবশ্যই আছে। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেও প্রি-পেইড বা স্মার্ট মিটার ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া হওয়ার ঝুঁকি কমে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দ্রুত পাওয়া যায় এবং গ্রাহক নিজে ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানেরও মিটার রিডিং, বিল সংগ্রহ ও বকেয়া ব্যবস্থাপনায় কিছু সুবিধা হতে পারে।
কিন্তু একটি প্রযুক্তি সফল হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনবান্ধব হয়ে যায় না। প্রযুক্তির মূল্যায়ন করতে হয় তার সামাজিক ফলাফল দিয়ে।
এখানেই বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। একজন শহুরে মধ্যবিত্ত গ্রাহক এবং একজন গ্রামীণ নিম্নআয়ের পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাস্তবতা এক নয়। শহরের একজন গ্রাহক সহজেই অনলাইনে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা রিচার্জ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার একজন কৃষক, দিনমজুর, প্রবীণ মানুষ কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত গ্রাহকের জন্য বারবার মিটার রিচার্জ করা একটি অতিরিক্ত ঝামেলা।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—গ্রাহকের ঘরে টাকা নেই, আর মিটারে টাকা শেষ হয়ে গেলে বিদ্যুৎও নেই!
প্রি-পেইড ব্যবস্থার মূল দর্শন হচ্ছে ‘আগে টাকা, পরে সেবা’। কিন্তু বিদ্যুৎ কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মাসের শেষ দিকে একটি পরিবার সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়লে পোস্টপেইড ব্যবস্থায় তারা কিছুদিন পর বিল পরিশোধের সুযোগ পেত। প্রি-পেইড ব্যবস্থায় সেই নমনীয়তা অনেক কম। ফলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এখানে আরেকটি তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। মিটার আধুনিক হলো, কিন্তু সেবার মান কি একইভাবে আধুনিক হয়েছে? বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ভোল্টেজের ওঠানামা, মিটার-সংক্রান্ত জটিলতা, রিচার্জ ব্যবস্থার সমস্যা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা যদি থেকেই যায়, তাহলে শুধু মিটার পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য?
প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন সহজ করা। যদি প্রযুক্তি মানুষের সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ বাড়ায়, তাহলে সেই প্রযুক্তির নকশা ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।
প্রি-পেইড মিটার নিয়ে জনগণের আপত্তির আরেকটি দিক হলো স্বচ্ছতা। একজন গ্রাহককে শুধু টাকা দিতে বললেই হবে না; তাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্য কত, অন্যান্য চার্জ কী, জরুরি ব্যালান্সের নিয়ম কী এবং মিটার বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে দ্রুত সংযোগ পুনরুদ্ধার করা যাবে। গ্রাহক যদি হিসাব বুঝতেই না পারেন, তাহলে প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, সেটিকে জনবান্ধব বলা কঠিন।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকেও কিছু বাস্তব যুক্তি আছে। বিল আদায়ের ব্যয় কমানো, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ, বকেয়া কমানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ—এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসব প্রশাসনিক সুবিধার পুরো বোঝা যদি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার হবে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্মার্ট মিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—প্রযুক্তির সঙ্গে গ্রাহক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি চালুর পাশাপাশি গ্রাহকের অধিকার, তথ্যের স্বচ্ছতা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, দুর্বল জনগোষ্ঠির সুরক্ষা এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।
বাংলাদেশেও তাই বিতর্কটি ‘প্রি-পেইড মিটার থাকবে কি থাকবে না’—এই সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া উচিত। জনগণের প্রতিবাদকে অবজ্ঞা না করে সরকার ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে—কোথায় সমস্যা, কারা বেশি ভুগছে এবং কীভাবে সমাধান করা যায়।
বড়খাতার সমাবেশের তাৎপর্য এখানেই। একটি স্থানীয় মাঠে মানুষের জমায়েতকে কেবল একটি আঞ্চলিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে বহু জাতীয় ইস্যুর সূত্রপাত হয়েছে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে। যখন মানুষ বলে, “প্রি-পেইড মিটার বাতিল করো, জনগণের ভোগান্তি বন্ধ করো”, তখন সেই স্লোগানের পেছনে থাকা অভিজ্ঞতাগুলো শোনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে আন্দোলনের পাশাপাশি সমাধানের পথও স্পষ্ট হওয়া দরকার: ১. যাচাই ও মূল্যায়ন: যেসব এলাকায় প্রি-পেইড মিটার নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে, সেখানে স্বাধীনভাবে গ্রাহক-সন্তুষ্টি ও ভোগান্তি যাচাই করা যেতে পারে। ২. বিশেষ সহায়তা: নিম্নআয়ের পরিবার, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। ৩. হিসাবে স্বচ্ছতা: মিটারের সব ধরনের চার্জ ও কর্তনের হিসাব সহজ ভাষায় জানাতে হবে। ৪. দ্রুত সেবা: মিটার বিকল বা রিচার্জ-সংক্রান্ত সমস্যায় দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ৫. নীতি পুনর্বিবেচনা: গ্রাহকের মতামত ছাড়া ব্যাপকভাবে মিটার পরিবর্তনের নীতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হবে মানুষের জন্য, মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে যাওয়ার পথে প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু স্মার্ট রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু স্মার্ট মিটারে নয়; স্মার্ট রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচায়, খরচ কমায়, সেবা সহজ করে এবং নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করে।
তাই বড়খাতার মাঠের প্রতিবাদকে শুধু ‘প্রি-পেইড মিটারবিরোধী আন্দোলন’ হিসেবে না দেখে জনবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দাবিতে একটি সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সরকার চাইলে এই ক্ষোভকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে সংলাপে রূপান্তর করতে পারে।
মানুষ প্রযুক্তির বিরোধী নয়, মানুষ ভোগান্তির বিরোধী। মানুষ আধুনিক ব্যবস্থার বিরোধী নয়; মানুষ এমন আধুনিকতার বিরোধী, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা প্রতিষ্ঠানের আর দায়ভার পড়ে গ্রাহকের ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই খুব সরল: মিটার কি মানুষের সেবা করবে, নাকি মানুষ মিটারের সেবা করবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—প্রি-পেইড মিটার বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের হাতিয়ার হবে, নাকি জনভোগান্তির আরেকটি প্রতীক হয়ে উঠবে।
নজরুল ইসলাম হক্কানী শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক। ই-মেইল: nazrul.hakkani@gmail.com