তামিল নাড়ুর ৭ গ্রামে হলুদ পাগলা পিঁপড়া আতঙ্ক

এ পিঁপড়া কামড়ায় না, ‍হুলও ফোটায় না; ফরমিক অ্যাসিড ছিটায়, যা প্রাণীদেহে নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 August 2022, 01:09 PM
Updated : 18 August 2022, 01:09 PM

হলুদ পাগলা পিঁপড়ার উপদ্রবে খাবি খাওয়ার কথা জানিয়েছেন ভারতের তামিল নাড়ুর সাত গ্রামের শত শত বাসিন্দা।

এই পিঁপড়া তাদের গবাদিপশু, ক্ষেতের ফসলের ওপর হামলা করে তাদের জীবন-জীবিকাকে চরম বিপাকে ফেলছে বলেই অভিযোগ তাদের।

বিশ্বে যেসব প্রাণীকে ভয়াবহ আক্রমণকারী বিবেচনা করা হয়, এই হলুদ পাগলা পিঁপড়া তার অন্যতম বলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বিবিসি।

এ পিঁপড়া কামড়ায় না কিংবা ‍হুলও ফোটায় না; তবে ফরমিক অ্যাসিড ছিটায়, যা প্রাণীদেহে নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

এই হলুদ পাগলা পিঁপড়ার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যানোপ্লোলেডিস গ্র্যাসিলাইপস; সাধারণত ক্রান্তীয় এবং উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলগুলোতে এর দেখা মেলে।

তাদের পথ চলা এলোমেলো, সমন্বয়হীন; বাধা পেলে এ পিঁপড়েরা আরও উন্মত্ত হয়ে ওঠে।

এই জাতের পিঁপড়া দ্রুত বংশবিস্তার এবং স্থানীয় অন্যান্য প্রাণীকূলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। অস্ট্রেলিয়ার বিশাল অংশজুড়েও এদের উৎপাতের খবর পাওয়া গেছে।

হলুদ পাগলা পিঁপড়ার ওপর গবেষণা করা কীটতত্ত্ববিদ ড. প্রণয় বৈদ্য এই প্রজাতির পিঁপড়াকে অভিহিত করেছেন ‘সুবিধাবাদী প্রজাতি’ হিসেবে।

“তাদের কোনো পছন্দের খাবার নেই। তারা যে কোনো কিছু এবং সবকিছু খেতে পারে,” বলেছেন তিনি।

এই পিঁপড়া এমনকী অন্য প্রজাতির পিঁপড়া, মৌমাছি এবং ভিমরুলকেও শিকার করতে পারে।

এদের উৎপাতে দিশেহারা তামিল নাড়ুর গ্রামগুলো দিনদিগুল জেলার কারনাথামালাই জঙ্গলের আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এসব গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজ ও গবাদিপশু লালনপালনের ওপর নির্ভরশীল।

“যখনই আমরা জঙ্গলের কাছে যাই, এই পিঁপড়াগুলো আমাদের গায়ে উঠে যায় এবং জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। আমরা এমনকী খাবার পানিও নিয়ে যেতে পারি না, দেখা যায় সেই পানিতেও ঝাঁকে ঝাঁকে ওই পিঁপড়া। কী করবো, জানি না,” বলেছেন ৫৫ বছর বয়সী এক কৃষক সেলভাম।

গ্রামবাসীরা বিবিসিকে বলছেন, তারা গত কয়েক বছর ধরে জঙ্গলে এই পিঁপড়া দেখা গেলেও এবারই প্রথম গ্রামের ভেতরেও তাদের সদম্ভ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা লোকজনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।

জঙ্গলের কাছে বাস করা অনেক গবাদি পশুপালক এই পিঁপড়ার উপদ্রব থেকে বাঁচতে বাড়িঘর ছেড়ে গ্রামের আরও ভেতরে চলে এসেছেন।

“যখন থেকে আমার বাড়িতে এ পিঁপড়ার উৎপাত শুরু হয়, আমি গ্রামে চলে আসি। আমরা সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে,” বলেছেন নাগাম্মাল, যার একাধিক ছাগল এ হলুদ পাগলা পিঁপড়ার আক্রমণের শিকার হয়েছে।

স্থানীয় বন কর্মকর্তা প্রভু বিবিসিকে বলেছেন, এই পিঁপড়া প্রাদুর্ভাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জরিপ চালাতে এবং একটি প্রতিবেদন দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

“প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না,” বলেছেন তিনি।

এই হলুদ পাগলা পিঁপড়াকে দেখতে স্বাভাবিক পিঁপড়ার মতো লাগে বলেই জানিয়েছেন সরকারি পশুচিকিৎসক ড. সিঙ্গামুথু।

“কেন তারা বাড়ছে, জানি না আমরা। কীভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাও জানি না। মানুষ এবং গবাদিপশু এই কারণে সমস্যার মুখে পড়েছে, সুনির্দিষ্ট করে সেই কারণটাও বলতে পারছি না আমরা,” বলেছেন।

গ্রামবাসীদের আপাতত তাদের গরু-ছাগল যেন্ জঙ্গলে না যায়, সে ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

গবাদিপশুর পাশাপাশি সাপ, ইঁদুরও এই পিঁপড়ার আক্রমণে মারা পড়ছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।

ড. বৈদ্য বলছেন, শত শত পিঁপড়ার ছিটানো ফরমিক অ্যাসিড বিভিন্ন পশুর চোখের ক্ষতিসাধন করতে পারে।

“তবে পিঁপড়াগুলো যে সুনির্দিষ্টভাবে চোখেই আক্রমণ করে, তা বলা যাচ্ছে না,” বলেছেন তিনি।

মানুষের ক্ষেত্রে এই অ্যাসিডে অ্যালার্জিজাতীয় প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তবে তাও প্রাণসংহারী নয়।

এই পিঁপড়ার বংশবিস্তার ওই অঞ্চলের বাস্তুসংস্তানে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।

ড. বৈদ্য জানান, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিস্টমাস দ্বীপে যখন প্রথম এই পিঁপড়া আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন তারা সেখানকার স্থানীয় পিঁপড়াকে উচ্ছেদ করেছিল এবং স্থানীয় পিঁপড়ার খাদ্যের উৎসগুলো দখলে নিয়েছিল। তারা দ্বীপের লাখ লাখ লাল কাঁকড়াকে অন্ধ, অক্ষম করে দিয়ে মেরে ফেলেছিল।

কীটতত্ত্ববিদ প্রিয়দর্শন ধর্মরঞ্জনের ধারণা, তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় হলুদ পাগলা পিঁপড়ার বিস্তার এবং তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়ছে।

“যখন পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ে, তখন তাদের বিপাকের হারও বেড়ে যায়, যে কারণে তারা খায়ও বেশি। এটি একটি কারণ হতে পারে,” তবে তথ্য-উপাত্ত ছাড়া এটি নিশ্চিত হওয়া যাবে না বলে সতর্কও করেছেন ধর্মরঞ্জন।

“যে এলাকায় তাদের উপদ্রব সেখানকার আবহাওয়ার প্যাটার্ন নিয়ে আমাদের আরও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং তা পর্যালোচনা করতে হবে,” বলেছেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক