বৈষম্য দূর করতে ইংল্যান্ডে নতুন নারীস্বাস্থ্য নীতিমালা

যুক্তরাজ্যে নারীদের জীবনের এক চতুর্থাংশেই কাটে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে, যেখানে পুরুষের বেলায় তা এক পঞ্চমাংশ।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 August 2022, 07:09 AM
Updated : 1 August 2022, 07:09 AM

নারীদের ক্ষেত্রে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করতে নতুন একটি পরিকল্পনা সামনে এনেছেন ইংল্যান্ডের মন্ত্রীরা।

এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে চিকিৎসকদের জন্য নারী স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে; পাশাপাশি বাড়বে ক্যান্সার শনাক্ত করার পরীক্ষা এবং ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আওতায় সব সেবা মেলার ‘ওয়ান-স্পট শপ’।

নারী স্বাস্থ্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম এই নীতিমালা প্রকাশিত হয়েছে গত ২০ জুলাই। জন্মনিয়ন্ত্রণ, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা টেস্ট টিউব পদ্ধতি এবং মাতৃত্বকালীন সেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেখানে।

এই নীতিমালার বাস্তবায়ন হলে গর্ভের সন্তান ছয় মাসের আগে মারা গেলে ‘বেবি লস সার্টিফিকেট’ দেওয়া হবে দম্পতিকে। জাতীয় পর্যায়ে শরীরচর্চার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে, যেখানে বয়স্ক নারীদের পেশীর জোর বাড়াতে এবং সক্রিয় থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।

ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টিভ বার্কলে বলেন, “আমাদের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ তাদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা পায় না শুধুমাত্র তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

“সারা দেশে নারী স্বাস্থ্যে যে অসমতা, তা দূর করে উন্নত স্বাস্থ্য সেবা দিতে এই নীতিমালা একটি মাইলফলক হয়ে উঠবে।”

গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাজ্যে নারীর গড় আয়ু পুরুষের চেয়ে বেশি। কিন্তু নারীদের জীবনের এক চতুর্থাংশেই কাটে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে, যেখানে পুরুষের বেলায় তা এক পঞ্চমাংশ।

১২৭ পৃষ্ঠার এই নীতিমালা বলছে, ঐতিহাসিকভাবে স্বাস্থ্য ও সেবা ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে ‘পুরুষের দ্বারা এবং পুরুষের জন্য’। আর্থিকভাবে ধনী ও অসচ্ছল এলাকার নারীদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতেও রয়েছে পার্থক্য।

গত এপ্রিলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ইংল্যান্ডে দরিদ্র অঞ্চলের নারীরা যে কোনো দেশের নারীদের গড় আয়ু পূর্ণ করার আগেই মারা যাচ্ছেন।

ব্রিটেনের নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী মারিয়া কলফিল্ড জানান, এ নীতিমালা করার সময় প্রায় এক লাখ নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা ছিল ‘শিউরে ওঠার মত’।

স্বাস্থ্য সেবায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার কাজটি যে সহজ হবে না, এই ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ তা জানেন। তবে পুরুষের মত নারীও যেন সার্বিকভাবে এবং সবসময় একই মানের সেবা পায়, না নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।

নীতিমালা প্রকাশের পর নারীস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন গবেষণা হবে; আর তাতে তথ্য ঘাটতি কমে আসবে, নারীর জন্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা আগের চেয়ে ভালোভাবে নিশ্চিত করা যাবে।

ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ওয়েবসাইটে নারীস্বাস্থ্য বিভাগটিও ঢেলে সাজানো হবে। স্তন-পরীক্ষা করার কার্যক্রমে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে ব্রিটিশ সরকার। এর আওতায় স্তন পরীক্ষায় ২৫টি নতুন ইউনিট চালু করা হবে।

নারীকে সঠিক সেবা দিতে সব চিকিৎসককেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। মেডিকেল শিক্ষার্থী ও যারা চিকিৎসক হওয়ার পথে, তাদেরও বাধ্যতামূলকভাবে নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হবে।

সেবা পেতে বিলম্ব অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য ও জীবনে প্রভাব ফেলছে নারীদের বেলায়। যারা সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ৮৪ শতাংশ বলেছেন, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কাছে সেবা চাইতে গিয়ে অনেক সময় তারা অবহেলিত বোধ করেছেন।

প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের মেনোপজ, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিষয়ে শেখানো হবে এবং তাদের শিক্ষা যাচাই করবে নারী স্বাস্থ্য বিষয়ক জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল।

জেনারেল ফিজিশিয়ান বা ফিজিওথেরাপিস্ট হতে চলেছেন যারা, তারাও নারীস্বাস্থ্য নিয়ে পড়বেন। অন্যদিকে যারা চিকিৎসক, প্রয়োজনে তারাও বাড়তি বিষয় নিয়ে নিজেদের জানার পরিধি বাড়াবেন।

নীতিমালার একজায়গায় বলা হয়েছে, অনেক নারী তাদের ব্যথার কথা বলেছেন, কিন্তু তাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের বলা হয়েছে, পিরিয়ডে অতিরিক্ত রক্তপাত ও ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক, কিংবা বলা হয়েছে- এসব নিয়েই বড় হতে হবে।

এমন অনেকে আছেন, যাদের এখন এন্ডোমেট্রিওসিস ধরা পড়েছে, অথচ তারা বছরের পর বছর ডাক্তারের কাছে গেছেন, তাদের রোগ ঠিকমত শনাক্ত হয়নি।

ব্রিটিশ সরকারের নারীস্বাস্থ্য অ্যাম্বাসেডর ড্যাম লেসলি রিগান বলেন, নারীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের বহু বছরের ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন যাত্রা শুরুর একটি সুযোগ এনে দিয়েছে এই নীতিমালা।

শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্যও আরেকটি স্বাস্থ্যনীতি করতে চলেছে ব্রিটিশ সরকার; যা জুলাই মাসে প্রকাশের কথা থাকলেও আগামী গ্রীষ্ম পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক