১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আর্টনেস্ট: শিল্পে মানবতার নতুন ঠিকানা

শিল্পসংগঠন ‘আর্টনেস্ট’-এর আয়োজনে শুরু হয়েছে দলীয় চিত্রকলা প্রদর্শনী ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Aug 2026, 10:32 AM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

সাদা দেয়ালে সারি সারি শিল্পকর্ম। কোথাও মৃদু ধূসর রেখায় উঠে এসেছে মানুষ, প্রাণীর অবয়ব, কোথাও প্রকৃতির ভিন্ন রূপ। আবার কোথাও উজ্জ্বল হলুদ, লাল, নীল ও বেগুনির তীব্র উপস্থিতিতে ফুটে উঠেছে মানুষের মুখ ও শরীরের নানান ভঙ্গি।

দর্শনার্থীরা কখনও ছবির সামনে দাঁড়িয়ে, কখনও কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, কেউবা মোবাইল ফোনে ধরে রাখছেন পছন্দের শিল্পকর্ম।

লালমাটিয়ার গ্যালারি দ্য ইলিউশনসে শিল্পমুখর পরিবেশে ২০ অগাস্ট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে নতুন শিল্পসংগঠন ‘আর্টনেস্ট’।

তাদের প্রথম আয়োজন দলীয় শিল্পপ্রদর্শনী ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’। নামের মধ্যেই যেন প্রদর্শনীর মূল ভাবনার ছাপ আছে— মানুষ, মানবিকতা, সহমর্মিতা, আশা এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

২৫ অগাস্ট পর্যন্ত গ্যালারি দ্য ইলিউশনসে প্রদর্শনীটি প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

প্রথম প্রদর্শনীতেই আর্টনেস্ট, একসঙ্গে হাজির করেছে নয়জন শিল্পীর কাজ। তারা হলেন রশিদ আমিন, সাইফুদ্দিন মাহবুব আহমেদ, ফাহমিদা এনাম কাকলী, এ.এইচ.ধালি তোমাল, গোলাম ফারুক স্বপন, তারেক আমিন, সৌরভ চৌধুরী, মঞ্জুর রশিদ ও নাঈম জামান।

তাদের কাজের বিষয়, রং, রেখা ও প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে স্পষ্ট বৈচিত্র্য। ফলে ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’ শুধু নির্দিষ্ট ধরনের ছবি নিয়ে সাজানো প্রদর্শনী নয় বরং ভিন্ন শিল্পভাষার মধ্য দিয়ে একই মানবিক ভাবনাকে দেখারও সুযোগ।

প্রদর্শনীর শিল্পগুলোর দিকে তাকালে সেই বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হয়। কোন অংশে পাখি, প্রাণী, পাতা ও প্রকৃতির নানান উপাদান দেখা যায়। সূক্ষ্ম রেখা, সীমিত রং এবং সাজানো অবয়বও দেখা গেছে কিছু শিল্পকর্মে। তাই দেয়ালে পাশাপাশি ঝোলানো এসব কাজ দর্শকের চোখে গল্পের মতো ধরা দেয়।

অন্যদিকে দেখা যায় ধূসর ও কালোর রংয়ে আঁকা প্রাণী ও প্রকৃতির অবয়ব, চারপাশের পরিবেশকে রেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তুলে ধরা হয়েছে গৌতম বুদ্ধকে ধ্যানমগ্ন অবস্থাকে। সাদা-কালো রেখায় বুদ্ধের শান্ত মুখাবয়ব, লতা-পাতা, পদ্মফুল ও বিভিন্ন প্রতীক। নিখুঁত রেখার কাজ ও আলো-ছায়ায় শিল্পকর্মটিতে ফুটে উঠেছে প্রশান্তির আবহ।

আর এমন বৈচিত্র্যই ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’-এ যোগ করেছে ভিন্নতা। মানবতার কথা বলতে গিয়ে সব শিল্পী একই পথ বেছে নেননি। কেউ মানুষ, কেউ প্রাণী ও প্রকৃতির দিকে গেছেন, কেউ রেখা ও আলো-ছায়ায়, কেউবা রংয়ের বিস্তারের মধ্য দিয়ে নিজ অভিজ্ঞতাকে ধরার চেষ্টা করেছেন।

তাই প্রদর্শনীটি দর্শককে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাপিয়ে না দিয়ে, নিজের মতো করে ভাবার সুযোগও দেয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যেও শিল্পকে শুধু দেয়ালে ঝোলানো ছবি হিসেবে না দেখে সামাজিক ও মানবিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, শিল্পসমালোচক মঈনউদ্দিন খালেদ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার নাহিদ মাহতাব অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

প্রদর্শনীর শিল্পী রশিদ আমিনও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা লুভা নাহিদ চৌধুরীর বক্তব্যে শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিল্পচর্চার জন্য সক্রিয় পরিসর তৈরির প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। তার বক্তব্যের সঙ্গে আর্টনেস্টের পরিকল্পনারও যোগ রয়েছে।

প্রদর্শনীর পাশাপাশি শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি।

শিল্পসমালোচক মঈনউদ্দিন খালেদ, তার বক্তব্যে প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া নয়জন শিল্পীর কাজ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি প্রত্যেক শিল্পীর প্রদর্শিত শিল্পকর্মের বিষয়, ভাবনা, রং, রেখা ও নির্মাণশৈলী নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন।

অন্যদিকে নাহিদ মাহতাবের বক্তব্যে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পচর্চার নথি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রদর্শনীর শিল্পী রশিদ আমিনের বক্তব্যেও শিল্পকর্ম মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। তার মতে, শিল্পকর্ম শুধু প্রদর্শনীকক্ষে দর্শকের দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার পরিসর ছোট হয়ে যায়; শিল্পকর্ম মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানোও জরুরি।

‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’-এ নয়জন শিল্পী নয় ধরনের নিজস্ব শিল্পভাষা নিয়ে অংশ নিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আর্টনেস্ট এর আরম্ভই ‘ইনস্পায়ারিং হিউম্যানিটি থ্রু আর্ট’— শিল্পের মাধ্যমে মানবিকতাকে অনুপ্রাণিত করে। আর সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপ’ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে সংগঠনটি।

শিল্পীদের কাজ ও জীবন নথিবদ্ধ করা, অনলাইন প্রদর্শনী করা, শিল্পকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাই রয়েছে তাদের।