Published : 23 Aug 2026, 10:59 AM
ঢাকা শহরে থেমে থাকা যেন প্রায় অসম্ভব। সকাল শুরু হয় তাড়াহুড়োয়, দিনের বড় একটা সময় কেটে যায় যানজট, কাজের চাপ, ফোনের পর্দা আর নানান দায়িত্ব সামলাতে।
দিন শেষে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু মনকে একটু থামানোর সুযোগ হয়ত মেলে না।
এই ব্যস্ততার মাঝেই ২১ ও ২২ অগাস্ট রাজধানীর গুলশান শুটিং ক্লাবে বসেছিল ‘সামার ফ্লো ফেস্ট ২০২৬’। দ্য ফ্লো ফেস্টের আয়োজনে দুই দিনের এই অনুষ্ঠান শরীরচর্চার পাশাপাশি মনে করিয়ে দিয়েছে, সুস্থ থাকা মানে শুধু শরীরকে সচল রাখা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্রাম, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা ও নিজের অনুভূতির যত্নও।
আয়োজকদের ভাবনায় সুস্থতার আটটি দিক—শারীরিক সক্রিয়তা, পুষ্টি, মনোযোগ, বিশ্রাম, সামাজিক সংযোগ, কৃতজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও জীবনের উদ্দেশ্য।
‘দ্য ফ্লো ফেস্ট’-এর এবারের মূল ভাবনা ছিল ‘মুভ, মেইক, কানেক্ট, হিল’। সেই ভাবনাকে সামনে রেখে দুদিনজুড়ে ছিল শরীরচর্চা, মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির নানান আয়োজন।
আর সেই ধারণাই যেন পুরো উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনেও ছড়িয়ে ছিল। কোথাও শরীরচর্চা, কোথাও নাচ বা দৌড়, আবার কোথাও মানুষের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ।
ফলে উৎসবটি কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন হয়ে থাকেনি; বরং ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে নিজেকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।
হাতিরঝিলে ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারের ‘রেভ রান’ দিয়ে শুরুর পরে ছিল সাউন্ড হিলিং, শাজি ওমরের ‘অ্যালাইনিং উইথ শাজি ওম’, গুঞ্জনের ‘ইনার লাইট: মেডিটেইশন’ এবং ফারিয়ার ‘লাইটনেস অব বডি: যোগা’।
দ্বিতীয় দিনেও ছিল যোগব্যায়াম ও ধ্যানের একাধিক আয়োজন।
ফারিয়ার ‘এনিমেল যোগা ফর কিডস’ ও মাইয়ের ‘ফ্লো ইনটু প্রেজেন্স যোগা’র পাশাপাশি তাস পরিচালনা করেন ‘পিস উইদিন: মেডিটেইশন’। ফলে শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি মনকে স্থির করার সুযোগও ছিল আয়োজনে।
উৎসবের শুরুটা হয় ২১ অগাস্ট সকালে হাতিরঝিলে। জিপের সহযোগিতায় আয়োজিত সাড়ে সাত কিলোমিটারের ‘রেভ রান’-এ অংশ নেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ।
তবে এটি কেবল দৌড়ের প্রতিযোগিতা ছিল না। কেউ দৌড়েছেন, কেউ হেঁটেছেন, কেউ আবার সংগীতের তালে নেচে নেচে পথ পাড়ি দিয়েছেন। ভোরের হাতিরঝিলে একসঙ্গে এত মানুষের চলাচল চেনা শহরের দৃশ্যটা যেন কিছুটা বদলে দিয়েছিল।
এরপর গুলশান শুটিং ক্লাবে শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। একটি হলঘর যেটি বিয়ের উৎসবের জন্যই পরিচিত সেটিকে ‘ঢাকা জঙ্গল’-সবুজের আদলে সাজিয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বদ্ধ একটি স্থানেও কীভাবে সবুজে শ্বাস নেওয়া যায়। আর সেখানেই ছিল যোগব্যায়াম, ধ্যান, শব্দের মাধ্যমে প্রশান্তি তৈরির আয়োজন, শরীরচর্চা এবং নানান ধরনের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম। ছিল ‘আইরনস ফেন্সিং ক্লাবে’র তরবারি চালনার প্রশিক্ষণও।
নাচের আয়োজনে ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্য, সালসা, বলিউড নাচ ও জুম্বার মতো পরিবেশনা ছিল। ফলে কেউ শরীরচর্চায় অংশ নিয়েছেন, কেউ নাচে, কেউ আবার নিঃশব্দে নিজের জন্য কিছুটা সময় কাটিয়েছেন।
উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল মানসিক সুস্থতা নিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ। ‘শেয়ারাপি মেনস টেবিল’-এ পুরুষদের মানসিক অনুভূতি, ব্যর্থতা, ভুল এবং নিজের কথা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে, জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে ভুল করা বা সময়মতো কিছু করতে না পারা মানেই সবকিছুতে ব্যর্থ হওয়া নয়। বরং ভুলকে স্বীকার করে সেখান থেকে শেখার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
এই কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ শোনাতে পারে, তবে ব্যস্ত জীবনে নিজের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি করা সহজ নয়। কান্না করা, নিজের কষ্টের কথা বলা কিংবা প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নেওয়াকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
উৎসবের আলোচনায় সেই ধারণার বিপরীতে বলা হয়েছে, সাহায্য চাওয়াও সাহসের অংশ। একাকিত্বের বদলে মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করাও যে সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়, সেই বার্তাটি বিভিন্ন আয়োজনে ফিরে এসেছে।
মানুষের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে ছিল ‘স্পিড ফ্রেন্ডিং’। অর্থাৎ একই জায়গায় থাকা অপরিচিত মানুষদের মধ্যেও কথা বলার একটি সহজ সুযোগ।
আর যারা নিজের ভাবনা বা সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তাদের জন্য ছিল ‘প্রজেক্ট ঢাকার ক্রিয়েটিভ ওপেন মাইক’ ও ‘ট্যাবু: পোয়েট্রি স্ল্যাম’।
সন্ধ্যায় ‘হাভানা সালসা’র নাচ উৎসবের পরিবেশে যোগ করে ভিন্নতা।
অর্থাৎ শরীরচর্চার সঙ্গে কবিতা, সংগীত ও নাচের এই মেলবন্ধনই আয়োজনটিকে অন্য রকম করে তুলেছে।
তবে সুস্থতার ধারণাকে শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ রাখেনি এবারের সামার ফ্লো। ‘ইনক্লুসিভ ওয়েলনেস: রোহিঙ্গা রেসপন্স’ আলোচনায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন, মর্যাদা, দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা ও মানসিক সহায়তার মতো বিষয় সামনে আসে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, এএমএএন, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
এই অংশের গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়। সুস্থতাকে শুধু শহরের মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা শরীরচর্চার মধ্যে আটকে না রেখে সংকটে থাকা মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা নারীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য ও কারুশিল্পও উৎসবে প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। একটি পণ্য কেনার অর্থ সেখানে শুধু কেনাকাটা নয়; এর সঙ্গে কোনো পরিবারের আয়, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকতে পারে।
উৎসবের আরেকটি আকর্ষণ ছিল ‘ফ্লো মার্কেট’। বিভিন্ন স্থানীয় ও সচেতন উদ্যোগের পণ্য নিয়ে সাজানো এই বাজারে দর্শনার্থীরা যেমন কেনাকাটা করেছেন, তেমনি ছোট উদ্যোক্তাদের কাজ সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ উৎসবের বাণিজ্যিক অংশটিও মূল ভাবনার বাইরে ছিল না। স্থানীয় উদ্যোগ, সৃজনশীলতা ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ এখানে পাশাপাশি তৈরি হয়েছে।
আয়োজনের সঙ্গে ছিল একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রধান সহযোগী ছিল প্রাইম ব্যাংক। ‘রেভ রান’-এর সহযোগী ছিল ‘জিপ’।
এছাড়া ইউনাইটেড হেলথকেয়ার, স্বপ্ন ও স্যাভয় বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিল। রোহিঙ্গা সাড়া বিষয়ক আয়োজনে ইস্টার্ন ব্যাংক, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও এএমএএনের প্রতিনিধিত্ব ছিল।