১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

নিজের ভাগ্যের চাকা নিজেই যেভাবে ঘোরাবেন

সৌভাগ্য অলৌকিক বস্তু নয়। যে কেউ নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। তবে জানতে হবে সঠিক কৌশল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 19 Oct 2026, 06:28 PM

Updated : 19 Oct 2026, 06:27 PM

জগতে কিছু মানুষকে দেখে মনে হয় তারা যেন সবসময় সৌভাগ্যের পরশপাথর সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। যেখানেই যান, একটা না একটা ভালো সুযোগ তাদের সামনে এসে হাজির হয়।

অন্যদিকে, আরেক দলের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত; শত চেষ্টা করেও যেন তারা দুর্ভাগ্যের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেন না।

কিন্তু সত্যিই কি 'ভাগ্য' বা 'কপাল' সম্পূর্ণ অলৌকিক কোনও বিষয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের নিজস্ব মনস্তত্ত্ব?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাগ্য আসলে কোনো আকাশ থেকে পড়া অলৌকিক শক্তি নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতারই একটি প্রতিফলন। মানুষ চাইলে তার মনস্তত্ত্ব ও অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করতে পারে।

মুক্ত মনের মানুষেরাই বেশি ভাগ্যবান

মনস্তাত্ত্বিক-বিষয়ক ওয়েবসাইট সাইকোলজি টুডে-র নির্বাহী সম্পাদক ও মার্কিন লেখক লাইবি মা, সাম্প্রতিক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, “যারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন, তারা সাধারণত অত্যন্ত নমনীয়, আশাবাদী, স্থিতিস্থাপক এবং মুক্ত মনের অধিকারী হয়ে থাকেন। তারা জীবনের প্রতি মোড়ে ইতিবাচক সুযোগ ও সুন্দর আকস্মিকতার জন্য চোখ-কান খোলা রাখেন।”

বিপরীতে, যারা নিজেদের সবসময় 'অভিশপ্ত' বা 'পোড়া কপাল' মনে করেন, তারা অবচেতনভাবেই নিজেদের জীবনে নেতিবাচকতাকে ডেকে আনেন, যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় 'নেগেটিভ সেলফ-ফুলফিলিং প্রফেসি'।

অর্থাৎ, যদি আগেই ধরে নেওয়া হয় খারাপ কিছু ঘটবে, তবে অবচেতন মন সেই খারাপ পরিস্থিতির দিকেই ধাবিত করবে।

যা বলছে বিজ্ঞান, রিচার্ড ওয়াইজম্যানের ১০ বছরের গবেষণা

যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. রিচার্ড ওয়াইজম্যান, ভাগ্য নিয়ে ১০ বছর ধরে ৪০০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবীর ওপর একটি নিবিড় বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।

তার এই গবেষণার ফলাফল ‘দ্য লাক ফ্যাক্টর’-এ বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

ডা. ওয়াইজম্যান গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ভাগ্যবান মানুষরা মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট আচরণের মাধ্যমে নিজেদের সুযোগ নিজেরা তৈরি করেন।

১. সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার: তারা নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি সদয় থাকেন এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখেন।

২. অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভরসা: তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজেদের সহজাত অনুভূতি বা 'গাট ফিলিং'-কে গুরুত্ব দেন।

৩. ইতিবাচক প্রত্যাশা: তারা সবসময় বিশ্বাস করেন যে, ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে ভালো কিছুই ঘটবে।

৪. খারাপকে ভালোয় রূপান্তর: কোনও দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি তৈরি হলেও তারা ভেঙে পড়েন না, বরং সেটার ভেতরের ইতিবাচক দিকটি খুঁজে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান।

ওয়াইজম্যানের একটি বিখ্যাত পরীক্ষা ছিল 'সংবাদপত্রের পরীক্ষা'। তিনি নিজেকে ভাগ্যবান ও দুর্ভাগ্যবান মনে করা দুটি দলকে একটি সংবাদপত্র দিয়ে তার ভেতরের ছবিগুলো গুনতে বলেন।

সংবাদপত্রের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বিশাল বড় অক্ষরে লেখা ছিল,  ‘গোনার দরকার নেই, এখানে ৪৩টি ছবি আছে’। যারা নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতেন, তারা মুহূর্তের মধ্যে লেখাটি খেয়াল করে গণনা থামিয়ে দেন।

অন্যদিকে, দুর্ভাগ্যবান দাবি করা ব্যক্তিরা মনমরা ও অতিরিক্ত সংকীর্ণ মনোযোগের কারণে লেখাটি দেখতেই পাননি এবং ছবি গুনতে দীর্ঘ সময় নষ্ট করেন।

এই গবেষণা প্রমাণ করে, সুযোগ সবার সামনেই আসে, কিন্তু মুক্ত ও শিথিল মনের মানুষেরাই কেবল তা লুফে নিতে পারেন।

ভাগ্য ও 'দ্য ম্যাথিউ ইফেক্ট'

প্রতিবেদনে লাইবি মা, সমাজবিজ্ঞানের একটি তত্ত্বের কথা উল্লেখ করেন, যা ‘দ্য ম্যাথিউ ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।

১৯৬৮ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন এবং তাঁর সহকর্মী হ্যারিয়েট জাকারম্যান, বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি নিয়ে গবেষণার পর এই তত্ত্বটি প্রচার করেন।

বাইবেলের মথি লিখিত সুসমাচারের একটি রূপক বার্তার ওপর ভিত্তি করে এই নামকরণ করা হয়, যার সহজ অর্থ হল— ‘যার আছে, তাকে আরও দেওয়া হবে’।

এটি যেমন আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ধনীদের আরও ধনী হওয়ার প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করে, তেমনি ভাগ্যের ক্ষেত্রেও খাটে।

জীবনের শুরুতে যারা ছোটখাটো ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পান, তারা পরবর্তী সময়ে আরও বড় সুযোগের আশা করেন এবং তা খুঁজে নেন। অর্থাৎ, সুসংবাদই আরও নতুন সুসংবাদের পথ তৈরি করে।

ভাগ্য নিয়ে এক অবিশ্বাস্য সত্য গল্প

নিবন্ধে লেখিকা তার নিজের বাবা-মায়ের জীবন থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময়কার এক সৌভাগ্যের গল্প বলেন।

মাও সেতুং-এর বিপ্লবের সময়, তার সরকারি চাকুরে ও শিক্ষিত বাবা দেশ ছাড়ার টিকিট পাননি, কিন্তু পরিবারকে বিমানে তুলে দিতে পেরেছিলেন। পরে ইংরেজি জানা থাকার কারণে আমেরিকার 'ফ্লাইং টাইগার্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্লেয়ার লি শেনল্ট, তার বাবাকে সাহায্য করেন এবং তিন দিন ভেড়ার পশমের স্তূপে লুকিয়ে রেখে বিমানযোগে উদ্ধার করেন।

এদিকে তার মা গুয়াংডং-এ এসে ভেবেছিলেন স্বামী হয়ত মারা গেছেন। একদিন এক রিফিউজি ক্যাম্পের লিফটের দিকে তাকিয়ে মায়ের হঠাৎ মনে হলো তিনি তার স্বামীকে দেখছেন, তবে নানি ভাবলেন মা অতিরিক্ত কেঁদে ভুল দেখছেন। কিন্তু পরক্ষণেই লিফট খুলতেই সেখান থেকে তার বাবা বেরিয়ে আসেন।

লেখিকার মতে, “তার বাবা সবসময় বিশ্বাস করতেন তিনি একজন ভাগ্যবান মানুষ। আর এই বিশ্বাসই তাকে জীবনের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও চারপাশের সম্ভাবনাগুলোকে দেখতে এবং বেঁচে থাকার সুযোগগুলো লুফে নিতে সাহায্য করেছিল।”

সুতরাং, ভাগ্য কোনও লটারি বা অন্ধ নিয়তি নয়। মন থেকে নেতিবাচক চিন্তা দূর করে, নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখলে এবং চারপাশের সুযোগগুলোর প্রতি সচেতন থাকলে নিজের ভাগ্যকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

পুরনো খবর:

দীর্ঘজীবন পেতে অল্প সময়ে কঠিন ব্যায়াম
অর্থ সঞ্চয়ের জন্য উপকারী হতে পারে ‘অর্থ বন্ধু’
ধনী হওয়ার স্বপ্নে সর্বস্ব হারায় যেভাবে