হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে ৫ তেল
রান্নার তেল সংরক্ষণ ও ব্যবহার পদ্ধতির ওপরেও নির্ভর করে পুষ্টিগুণ।
রান্নাবান্নায় অতিরিক্ত চর্বি বা ভুল তেলের ব্যবহার অজান্তেই ধমনীতে চর্বি জমিয়ে রক্ত সঞ্চালনে বাধা তৈরি করে।
তবে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সব তেল হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর নয়।
রান্নায় স্যাচুরেইটেড চর্বিযুক্ত তেলের পরিবর্তে মনো-আনস্যাচুরেইটেড এবং পলি-আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ তেল ব্যবহার করলে, রক্তে ক্ষতিকর ‘এলডিএল’ খারাপ কোলেস্টেরল’ দ্রুত কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ ডটক’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, প্রতিদিনের রান্নায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ভালো রাখা সম্ভব।
এক্সট্রা-ভার্জিন অলিভ অয়েল
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের প্রথম এবং প্রধান পছন্দ হলো এক্সট্রা-ভার্জিন অলিভ অয়েল।
কেন উপকারী: মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেট সিলোভ বলেন, “অলিভ অয়েলে উচ্চমাত্রার মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা শরীরে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমায় এবং সুরক্ষামূলক এইচডিএল বা ‘ভালো কোলেস্টেরল’ বাড়াতে সাহায্য করে।”
এতে থাকা ‘পলিফেনল’ নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রক্তনালীকে সুরক্ষিত রাখে এবং অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমায়।
সাধারণ ধারণার বিপরীতে, ১৭৬.৭ থেকে ২১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩৫০-৪১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ‘স্মোক পয়েন্ট’ হওয়ায়, এই তেল দিয়ে ঘরের সাধারণ সব ধরনের তরকারি রান্না বা ভাজি করা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
অ্যাভোকাডো অয়েল
অলিভ অয়েলের মতোই স্বাস্থ্যের জন্য গুণী উপাদান হল অ্যাভোকাডো ফল থেকে তৈরি তেল।
কেন উপকারী: এর মৃদু স্বাদ এবং উচ্চ স্মোক পয়েন্ট (প্রায় ৫২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এটিকে রান্নার জন্য বহুমুখী করে তুলেছে।
প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি পুষ্টিবিদ মিশেল রাউথেনস্টাইন বলেন, “উচ্চ তাপমাত্রার রান্নায় অ্যাভোকাডো অয়েল ব্যবহার করলে, তেলের অক্সিডেশন বা চর্বি ভেঙে ক্ষতিকর উপজাত তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করে হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে।”
ক্যানোলা অয়েল
সাধারণ ডালডা বা সয়াবিনের চেয়ে ক্যানোলা অয়েলে অতি ক্ষতিকর স্যাচুরেইটেড ফ্যাটের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কম থাকে।
কেন উপকারী: ডা. ব্রেট সিলোভ, রোজকার সাধারণ রান্নার জন্য ক্যানোলা অয়েল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কারণ এর স্বাদ নিরপেক্ষ এবং এতে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডস থাকে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাসে ক্যানোলা তেল যোগ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।
সয়াবিন তেল
দেশে সয়াবিন তেল বেশ বহুল ব্যবহৃত।
কেন উপকারী: বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর জোয়ান সালগে ব্লেক বলেন, “সাধারণ ও সাশ্রয়ী তেলের মধ্যে সয়াবিন তেলেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ‘আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড (এএলএ)’ পাওয়া যায়। এই এসেনশল ফ্যাটি অ্যাসিডটি মানুষের লিভার বা যকৃতে গিয়ে হৃদযন্ত্র-বান্ধব ওমেগা-৩ চর্বিতে রূপান্তরিত হয়।”
প্রতিদিন মাত্র দেড় টেবিল-চামচ খাঁটি সয়াবিন তেল গ্রহণ করলে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।
আখরোটের তেল বা ওয়ালনাট অয়েল
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং হৃদযন্ত্রে সুরক্ষায় আখরোটের তেল উপকারী প্রাকৃতিক উৎস।
কেন উপকারী: এতে প্রচুর পরিমাণে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড (এএলএ) থাকে, যা রক্তনালীর অভ্যন্তরীণ কড়া প্রদাহ শান্ত করতে সাহায্য করে।
তবে পুষ্টিবিদদের কড়া নির্দেশ হল— ওয়ালনাট অয়েল চুলার উচ্চ তাপে খুব দ্রুত অক্সিডাইজড হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এটি রান্নার কাজে ব্যবহার না করে সালাদ ড্রেসিং, সেদ্ধ সবজির ওপর ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ঘরে তৈরি চাটনির ওপরে ব্যবহার করাই ভালো।
বর্জনীয় তেল ও সাধারণ ৩টি ভুল ধারণা
নারকেল তেল ও পাম অয়েলের বাণিজ্যিক ফাঁদ: ক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পুষ্টিবিদ জোয়ান সালগে ব্লেক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বড় বাণিজ্যিক বিভ্রান্তি দূর করেছেন।
অনেকেই ভাবেন সব উদ্ভিজ্জ তেলই ভালো। তবে নারিকেল তেলে বেশি পরিমাণে ধমনী ‘ব্লক’ বা আটকে দেওয়ার মতো ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ থাকে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, দিনে সর্বোচ্চ ১৩ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাওয়া নিরাপদ, অথচ মাত্র এক চামচ নারকেল তেলেই ১১ গ্রামের বেশি ক্ষতিকর চর্বি থাকে।
তাই নারকেল তেল, পাম অয়েল, ডালডা, চর্বি বা মাখন রান্না থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখাই নিরাপদ।
ভুল সংরক্ষণ: ডা. সিলোভ সতর্ক করে বলেন, “রান্নার তেল কখনো সরাসরি চুলার পাশে, কড়া আলোতে বা অতিরিক্ত গরম জায়গায় রাখা উচিত নয়।
আলো ও তাপ তেলের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। তাই তেল সবসময় অন্ধকার ও ঠান্ডা স্থানে সংরক্ষণ করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন
