২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

অভ্যাস ও খাদ্যাভ্যাসে কমবে ওজন

ওজন কমানোর জন্য রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Nov 2025, 04:54 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:11 PM

সাধারণভাবে বলা হয় ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে সার্বিকভাবে রক্তে শর্করার মাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখা পুরো শরীরের জন্য উপকারী।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখা। আর এটি নির্দিষ্ট ওজন বজায় রাখার কাজটিও করে।

এই তথ্য জানিয়ে দিনাজপুরের ‘রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’য়ের পুষ্টিবিদ লিনা আকতার বলেন, “রক্তে শর্করার মাত্রা হরমোনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষুধা এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।”

রক্তে শর্করা বলতে যা বোঝায়

রক্তে শর্করা বলতে রক্তপ্রবাহে চিনির পরিমাণ বোঝায়। রক্তে শর্করা হল শক্তির প্রধান উৎস।

এটি তখনই উৎপন্ন হয় যখন শরীর খাবার থেকে যে কোনো ধরনের কার্বোহাইড্রেইট বা চিনি ভেঙে দেয়।

রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিনি দৈনন্দিন কাজে শক্তি হিসেবে ব্যবহার হয়। তবে খুব বেশি পরিমাণে চিনি থাকলে এটি চর্বি হিসেবে শরীরে সংরক্ষণ করে।

এই কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লিনা আকতার বলেন, “আবার রক্তে শর্করার সাথে ইনসুলিনের সম্পর্ক রয়েছে। ইনসুলিন হল অগ্ন্যাশয় থেকে উৎপাদিত একটি হরমোন যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের শরীরের ৮০ মি.লি. থেকে ১২০ মি.লি. পর্যন্ত বজায় রাখা উচিত।”

যে খাবার খাওয়া হয় তা শক্তি হিসেবে গ্লুকোজ সরবরাহ করে। শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিনি থাকলে ইনসুলিন একে চর্বি হিসেবে সংরক্ষন করে।

এভাবে রক্তে শর্করার ভারসামহীনতা ওজন বৃদ্ধি করে। এই কারণে ওজন কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখা।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে যা করবেন

কার্বোহাইড্রেইট গ্রহণের ওপর নজর দিন: কার্বোহাইড্রেইট যেমন- রুটি, পাস্তা, আলু, মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার, ভাত এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। তাই এসব কার্বোহাইড্রেইট সমৃদ্ধ খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে।

“পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেইট-যুক্ত খাবার কম খাবেন বা এড়িয়ে চলতে হবে”- বলেন এই পুষ্টিবিদ, “কারণ পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেইট যুক্ত খাবারগুলোতে আঁশ এবং গুরুত্বপূর্ন পুষ্টি উপাদান হারিয়ে যায়।”

যেমন- সাদা চাল, সাদা রুটি, সাদা চিনি, সাদা পাউরুটি, ইন্সট্যান্ট নুডুলস ইত্যাদি। এগুলো দ্রুত হজম হয় এবং গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

এর পরিবর্তে জটিল শর্করাযুক্ত খাবার বেছে নিতে হবে। কারণ এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় না।

জটিল শর্করাযুক্ত খাবারের মধ্যে আছে- গোটা শস্য, বাদামি চাল, আটা, ওটস, কুইনোয়া, কাউন, বার্লি ইত্যাদি।

বেশি আঁশ খেতে হবে: রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখার জন্য আঁশ আপনার বন্ধু হতে পারে।

কারণ আঁশ হজম এবং চিনির শোষনকে ধীর করে দেয় যা গ্লুকোজের বৃদ্ধি রোধ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ গ্রাম আঁশ খাওয়া উচিত।

আঁশযুক্ত খাবার অবশ্যই ধীরে ধীরে শুরু করবেন এবং পেট ফাঁপা এড়াতে প্রচুর পানি পান করতে হবে- পরামর্শ দেন লিনা আকতার।

আঁশের উৎস হিসেবে রয়েছে- ফল, আস্ত শস্য, বাদাম, (অদ্রবণীয় আঁশ), ওটস, বিনস বা শুঁটি, আপেল, তিসির বীজ, (দ্রবণীয় আঁশ)।

প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির সাথে কার্বোহাইড্রেইটযুক্ত খাবার গ্রহণ করা: রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে কার্বেহাইড্রেট যুক্ত খাবারের সাথে স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।

কারণ এগুলো খাবারের সাথে খেলে খাবারের শোষণকে ধীর করে দেয় যা হঠাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পেতে দেয় না।

তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যকর চর্বি ও চর্বিহীন প্রোটিন বেছে নিতে হবে খাদ্য তালিকায়। যেমন- অলিভ অয়েল, বাদাম, বীজ, চর্বি ছাড়া মাংস, ছোট মাছ, বড় মাছ ইত্যাদি।

অতিরিক্ত প্রোটিন ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করা যাবে না। এটি আবার গ্লুকোজে রূপান্তরিত হবে যা ওজন বাড়াতে পারে।

সবুজ শাকসবজি: সবুজ ও গাঢ় রঙের শাকসবজিতে ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থে ভরপুর। এগুলো শরীরের বিভিন্ন উপকার করে।

সবুজ শাকসবজিতে ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে যা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে প্রমাণিত। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভালো।

পাশাপাশি সবুজ শাকসবজিতে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম-সহ নানান খনিজ উপাদান রয়েছে। এগুলো রক্তচাপ, হজমশক্তি, কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

এর আঁশ পেট ভরা রাখে অনেকক্ষণ যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

 পর্যাপ্ত পানি পান: পানি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। কারণ এটি শরীরকে আর্দ্র রাখতে পারে।

প্রসাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত চিনি অপসারণ করতে সাহায্য করে পানি।

গবেষনায় দেখা গেছে কম পানি পান করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকে।

খাবার এড়িয়ে না চলা: এক বেলার খাবার বাদ দিলে পরের বেলায় অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা থাকে। ফলে হঠাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এজন্য খাবার সঠিক সময়ে নিয়মিত গ্রহণ করতে হবে।

লিনা আকতার বলেন, “দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার ছোট ছোট আকারে খাবার গ্রহণ করুন। প্রতিটি খাবারে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং আঁশ গ্রহণ করুন। নাস্তা হিসেবে পেয়ারা, টকদই, বাদাম খেতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে লিভার বা যকৃতে গ্লুকোজ, কর্টিসল এবং চিনিও বাড়ে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা: মানসিক চাপের কারণে শরীর গ্লুকাগন এবং কর্টিসল নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে শরীরে তৃষ্ণা বাড়তে পারে এবং চর্বি জমতে সাহায্য করে।

মানসিক চাপ কমাতে শখের কোনো কাজ করুন। সেটা হতে পারে বই পড়া, যোগব্যায়াম, প্রকৃতির মাঝে গিয়ে গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া।

মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

খাবারের প্লেট সুষম বানান: প্লেটের এক চতুর্থাংশ কার্বোহাইড্রেইট, অর্ধেক স্টার্চবিহীন সবজি এবং এক চতুর্থাংশ চর্বিহীন প্রোটিন রাখতে হবে; যেখানে স্যাচুরেইটেড ফ্যাটের পরিমাণ কম থাকবে।

ঘুমের মান উন্নত করা: কম ঘুম ‘ঘ্রেলিন’ এবং ‘লেপটিন’য়ের মতো ক্ষুধার হরমোনগুলোকে ব্যাহত করতে পারে। যার ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে ওজন বেড়ে যেতে পারে।

এজন্য ভালো ঘুমের রুটিন তৈরি করতে হবে।

লিনা আকতার বলেন, “প্রতিদিন একই সময়ে উঠবেন এবং একই সময়ে ঘুমাবেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন’য়ের মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে রাতে সাত থেকে নয় ঘন্টা ঘুমানো উচিত।

ঘুমানোর আগে কোনো ডিভাইস বা যন্ত্র যেমন- মোবাইল, টিভি, ল্যাপটোপ, কম্পিউটার ব্যবহার করবেন না। এছাড়া ঘুমানোর আগে কোনো ধরনের ক্যাফিন-ধর্মী পানীয় যেমন- চা, কফি পান করবেন না- পরামর্শ দেন এই পুষ্টিবিদ।

স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা: স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখলে রক্তে শর্করার মাত্রা ভালো রাখতে সাহায্য করে যা পরে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।

এজন্য বয়স, ওজন, উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন রাখার চেষ্টা করতে হবে।

 ব্যায়াম: বিপাক এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরে রক্তাসঞ্চালণ বাড়িয়ে হৃদপিণ্ড, কিডনি বা বৃক্ক, লিভার বা যকৃত ভালো রাখতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত হাটলে ২২ শতাংশ ২৫ শতাংশ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।

টিপস

আরও পড়ুন

চল্লিশের পর সকালের নাস্তা থেকেও বাড়তে পারে ওজন

ওজন কমাতে খাবারের আদর্শ পরিমাণ

ওজন কমানোর লক্ষ্য ভ্রষ্ট করতে পারে ‘ডায়েট’ খাবার