Published : 16 Feb 2026, 01:32 AM
বিজ্ঞানী বলতে আমরা অনেক সময় শুধু সাদা কোট, জটিল যন্ত্র আর কঠিন সূত্রের মানুষকে কল্পনা করি। কিন্তু আসলে একজন বিজ্ঞানী হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রতিদিন প্রশ্ন করেন- “কেন এমন হয়?”, “এটা কি আরও ভালোভাবে করা যায়?”
তারপর তিনি ধৈর্য, পরীক্ষা ও যুক্তির সাহায্যে উত্তর খুঁজে বের করেন। কোনো গবেষকের পথচলা সাধারণত সরলরেখা নয়; সেখানে থাকে বাধা, দিক বদল, নতুন করে শুরু, আবার শেখা আর নিজের ভেতরের কৌতূহলকে শৃঙ্খলায় রূপ দেওয়ার অনুশীলন। ঠিক এই ধরনের এক যাত্রার বাস্তব উদাহরণ ড. মো. জাবেদ হোসেন।
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সীমিত সুযোগ-সুবিধার পরিবেশ থেকে উঠে এসে আজ তিনি চীনের গুয়াংজু ইউনিভার্সিটির স্কুল অব লাইফ সায়েন্সে অধ্যাপনা ও গবেষণায় যুক্ত। তিনি সিন্থেটিক বায়োলজি ও বায়োম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে সবুজ জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।
কিছুদিন আগে এই গুণী বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় আমার। সেই আলাপ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তুলে ধরা হলো:
মশিউর রহমান: ‘সিন্থেটিক বায়োলজি’ আসলে কী? এটি কি নতুন ধরনের জীব তৈরি করা?
জাবেদ হোসেন: সিন্থেটিক বায়োলজি হলো জীবকে ‘পুনরায় নকশা’ করার বিজ্ঞান। যেমন আপনি একটি যন্ত্রের অংশ বদলে তাকে আরও কার্যকর করেন, তেমনি আমরা জীবাণু বা কোষের জিন (জীবের নির্দেশপুস্তক) বদলে তাকে নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রস্তুত করি। উদ্দেশ্য নতুন জীব ‘তৈরি’ করা নয়; উদ্দেশ্য হলো প্রাকৃতিক জীবকে মানুষের উপকারে আরও দক্ষ করা। যেমন- সবুজ জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক এবং ওষুধের উপাদান ইত্যাদি।
মশিউর রহমান: আপনার গবেষণার প্রধান লক্ষ্য কী?
জাবেদ হোসেন: আমার লক্ষ্য হলো বায়োম্যানুফ্যাকচারিং অর্থাৎ জীবাণু দিয়ে শিল্পপণ্য তৈরি। এর মাধ্যমে একটি টেকসই সবুজ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আজ অনেক রাসায়নিক ও জ্বালানি ফসিল ফুয়েল (তেল-গ্যাস ভিত্তিক উৎস) থেকে বানানো হয়, যা কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়। আমরা চাই জীবাণুকে এমনভাবে কাজে লাগাতে যেন নবায়নযোগ্য উৎস (যেমন কৃষিজ বর্জ্য) বা এমনকি কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকেও দরকারি পণ্য তৈরি করা যায়।
মশিউর রহমান: বায়োম্যানুফ্যাকচারিং বলতে কি ‘জীবাণুর কারখানা’ বোঝায়?
জাবেদ হোসেন: ঠিক তাই। বায়োম্যানুফ্যাকচারিং মানে হলো জীবাণু বা কোষকে ছোট্ট কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা। যেমন খামির দিয়ে রুটি ফুলে ওঠে বা দুধ থেকে দই জমে, এগুলোও এক ধরনের জৈব-উৎপাদন। আধুনিক গবেষণায় আমরা সেই প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও দক্ষ করি। কোন জীবাণু কী খাবে, কোন পথে (মেটাবলিক পথ) যাবে আর শেষে কোন পণ্য তৈরি করবে- তার সবই ল্যাবরেটরিতে পরিকল্পনা করা হয়।

মশিউর রহমান: আপনার কাজের ভিত যে এনজাইম, সেটি কী?
জাবেদ হোসেন: এনজাইম হলো জীবদেহের প্রাকৃতিক ক্যাটালিস্ট বা রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্রুত করার সহকারী। রান্নায় যেমন আগুনের তাপ দ্রুত সেদ্ধ করে, এনজাইম তেমনি কোষের ভেতর বিক্রিয়াগুলো দ্রুত ঘটায়। শিল্পকারখানায় অনেক সময় উচ্চ তাপমাত্রা বা কঠিন পরিবেশে কাজ করতে হয়, সেখানে সাধারণ এনজাইম টিকে থাকে না। তাই আমরা এনজাইম ইঞ্জিনিয়ারিং (এনজাইমকে উন্নত করা) করি, যাতে তা আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়।
মশিউর রহমান: ‘মেটাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ আসলে কী?
জাবেদ হোসেন: মেটাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং মানে হলো জীবাণুর ভেতরের রাসায়নিক পথ (মেটাবলিজম: খাদ্যকে শক্তি ও উপাদানে বদলানোর প্রক্রিয়া) ঠিক করে দেওয়া, যেন সে কম বর্জ্য তৈরি করে বেশি দরকারি পণ্য দেয়। ধরুন, আপনি একটি নদীর প্রবাহ বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট খালে পানি পাঠালেন; এখানে নদী হলো কোষের ভেতরের বিক্রিয়ার প্রবাহ আর খাল হলো কাঙ্ক্ষিত পণ্য তৈরির পথ।
মশিউর রহমান: আপনি তো বায়োফুয়েল নিয়েও কাজ করেছেন। বায়োফুয়েলের সমস্যা কোথায়?
জাবেদ হোসেন: বায়োফুয়েল পরিবেশবান্ধব হওয়ার আশা জাগালেও এটি অর্থনৈতিকভাবে সবসময় সহজ নয়। প্রথম প্রজন্মের বায়োফুয়েলে সরাসরি খাদ্যশস্য ব্যবহার করার প্রশ্ন আসে (ফুড ভার্সেস ফুয়েল: খাবার নাকি জ্বালানি?)। দ্বিতীয় প্রজন্মে কৃষিজ বর্জ্য (খড়, তুষ ও কাঠের গুঁড়ো) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এগুলো ভাঙতে এনজাইম লাগে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়। তাই গবেষণার লক্ষ্য এখন আরও কার্যকর ও উচ্চমূল্যের বায়োকেমিক্যাল বা নতুন প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে।
মশিউর রহমান: কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) থেকে পণ্য বানানো কীভাবে সম্ভব?
জাবেদ হোসেন: CO₂-কে আমরা সাধারণত ‘বর্জ্য গ্যাস’ ভাবি, কিন্তু বিজ্ঞান এটিকে কাঁচামাল বানাতে চাইছে। নির্দিষ্ট অণুজীব বা বায়ো-প্রক্রিয়ার সাহায্যে CO₂ ধরে (কার্বন ক্যাপচার: গ্যাস সংগ্রহ) তা থেকে ছোট জৈব-অণু তৈরি করা যায়। যেমন- অ্যাসিটেট (দুই-কার্বনযুক্ত যৌগ), যা পরে নানা পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি শত্রুকে বন্ধু বানানোর মতো; একদিকে বায়ুমণ্ডলে গ্যাস কমানো, অন্যদিকে মূল্যবান পণ্য উৎপাদন।
মশিউর রহমান: আপনার জীবনে সবচেয়ে বড় বাঁক কোনটি ছিল?
জাবেদ হোসেন: আমার জন্য বড় বাঁক ছিল মেডিকেলে চান্স না হওয়া, তারপর বিষয় বদলানো। আবার শিল্প-গবেষণায় কাজ করে শিক্ষকতায় ফেরা এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে চীনে পোস্টডক্টরাল সুযোগটি ছিল আমার জন্য একটি ‘গড-গিফটেড অপরচুনিটি’। সুযোগ এলে সব প্রস্তুতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। তবে সুযোগ একা কিছু নয়; সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা আর শেখার ধৈর্য লাগে।
মশিউর রহমান: বাংলাদেশে গবেষণা করতে চাইলে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
জাবেদ হোসেন: আমি দুটি প্রধান সমস্যা দেখি; একটি অবকাঠামো (যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সুবিধা) আর অন্যটি মানসিক প্রস্তুতি। ল্যাবের সীমাবদ্ধতা সত্যি; কিন্তু লক্ষ্য ঠিক না করা, ধারাবাহিক পরিশ্রম না করা এবং সহজে হতাশ হয়ে পড়া- এগুলোও বড় বাধা। আমি অনেক সময় বলি, বক্তা নয়, কর্মী হোন। কাজ করতে করতে শেখাই গবেষণার সবচেয়ে বাস্তব স্কুল।
মশিউর রহমান: ভবিষ্যতে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) আপনার ক্ষেত্রকে কীভাবে বদলাবে?
জাবেদ হোসেন: এআই গবেষণার গতি অনেক বাড়িয়ে দেবে। আগে আমরা অনেক কিছু ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ (বারবার চেষ্টা করে দেখা) পদ্ধতিতে করতাম। জিনের কোন পরিবর্তন (মিউটেশন) ভালো হবে কি না তা বুঝতে সময় লাগত। এখন বড় ডেটা বিশ্লেষণ করে এআই অনেক দ্রুত পূর্বাভাস দিতে পারে, কোন প্রোটিনে কোন পরিবর্তন করলে স্থায়িত্ব বাড়বে বা কোন পথ বদলালে উৎপাদন বাড়বে। তবে মনে রাখবেন, এআই হলো শক্তিশালী সহকারী; প্রশ্ন তৈরি, পরীক্ষা নকশা আর নৈতিকতা (ভালো-মন্দের সীমা) ঠিক করার দায়িত্ব মানুষেরই।
ড. মো. জাবেদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে উপলব্ধি হলো, বিজ্ঞান মানেই কেবল পরীক্ষাগার নয়, এটি মানুষের জীবনের অন্ধকার ভেদ করারও পথ। সন্দ্বীপের সংকট, টিউশনির পরিশ্রম, শিল্প-গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বিদেশে দিশাহীন দুই বছর- সব মিলিয়ে তিনি বুঝেছেন: গবেষণা মানে সব জানতে পারা নয়, বারবার পড়ে, ভেবে ও করে শিখে ওঠা।
সিন্থেটিক বায়োলজি ও বায়োম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে তিনি সবুজ উৎপাদন, কার্বন কমানো এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানির সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আপনি যদি আজ থেকেই ছোট্ট এক প্রশ্নকে গুরুত্ব দেন, একটি প্রবন্ধ বারবার পড়ে বোঝার চেষ্টা করেন আর প্রতিদিন একটু করে কাজ করেন, তবে বিজ্ঞান আপনার জন্যও খুলে যাবে। যদি প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পান, তবেই শুরু হবে আপনার বৈজ্ঞানিক যাত্রা।