১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পারস্যের রূপকথার কয়েকটি অতিপ্রাকৃত চরিত্র

লিখেছে প্রমিত সালাম, বয়স ১১, পঞ্চম শ্রেণি।

পারস্যের রূপকথার কয়েকটি অতিপ্রাকৃত চরিত্র
পারস্য লোকগল্পের রক্তচোষা চরিত্র ‘পালিস’, ১৯২১ সালের ‘কিতাব-ই আজাইব-ই মাখলুকাত’ থেকে নেওয়া, ছবি: সংগৃহীত।

প্রমিত সালাম প্রমিত সালাম

Published : 10 Aug 2026, 02:31 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

পারসিক রূপকথা মানেই এমন একটি জগৎ, যেখানে আকাশে উড়ে বেড়ায় বিশাল জাদুর পাখি, পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে থাকে দৈত্য, রাতের অন্ধকারে দেখা মেলে জিনের, আর কোনো এক পুরোনো প্রাসাদে হয়তো বসে আছে হাজার বছরের কোন এক অতিপ্রাকৃত শক্তিধর। 

প্রাচীন পারস্যের লোককথা, কিংবদন্তি আর মহাকাব্যে এরকম সব আশ্চর্য, অদ্ভুত চরিত্রদের মিলনমেলা। এই গল্পগুলো কেবল আনন্দের জন্য নয়, সেখানে শিক্ষাও আছে। সেখানে আছে ভালো-মন্দের লড়াই, বীরত্বের ঘটনা এবং জাদুর ক্ষমতা। এরকমই কিছু আজব চরিত্রের কথা নিচে দেওয়া হলো:

১. সিমুর্গ: জাদুর বিশাল পাখি ও প্রজ্ঞার প্রতীক

সিমুর্গ হলো এমন এক বিশাল ও জ্ঞানী পাখি, যে আকাশ ঢেকে ফেলতে পারে এবং মানুষের বিপদে বন্ধুর মতো এগিয়ে আসে। সাহিত্যে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাওয়া যায় পারস্যের দুটি অমর ক্লাসিকে। এ পাখির উল্লেখ আছে মহাকবি ফিরদৌসীর ‘শাহনামা’য়। পারস্যের জাতীয় এ মহাকাব্যে সিমুর্গের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি রয়েছে। 

রাজা জালের জন্মের পর তার চুল ছিল সাদা, যাকে ‘অশুভ’ মনে করে তার বাবা সাম তাকে আলবোর্জ পর্বতে ফেলে আসেন। সেখানে সিমুর্গ তাকে উদ্ধার করে এবং পরম মমতায় নিজের বাসায় বড় করে তোলে। পরবর্তীকালে জাল যখন লোকালয়ে ফিরে আসে, সিমুর্গ তাকে নিজের একটি পালক উপহার দেয় এবং বলে, বিপদে পড়লে এই পালক আগুনে পোড়ালেই সে হাজির হবে। 

‘শাহনামা’ মহাকাব্যে সিমুর্গের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি রয়েছে, ছবি: সংগৃহীত।

‘শাহনামা’ মহাকাব্যে সিমুর্গের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি রয়েছে,

জালের স্ত্রী রুদাবের যখন সন্তান জন্মদানে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল এবং উভয়ের জীবন বিপন্ন ছিল, তখন জাল সেই পালক পুড়িয়ে সিমুর্গকে ডাকে। সিমুর্গের দেওয়া চিকিৎসাবিদ্যা ও নির্দেশনায় জন্ম নেয় পারস্যের বীর ‘রুস্তম’। এখানে সিমুর্গ কেবল জাদুর পাখি নয়, বরং এক জ্ঞানী চিকিৎসক ও রক্ষাকর্তা।

ফরিদুদ্দিন আত্তারের ‘মানতেকুত তায়ির’ (দ্য কনফারেন্স অব দ্য বার্ডস) বইয়েও এ পাখির কথা আছে। দ্বাদশ শতাব্দীর এই বিশ্ববিখ্যাত সুফি কাব্যে সিমুর্গকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আধ্যাত্মিক রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে পৃথিবীর সমস্ত পাখি মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা তাদের রাজা ‘সিমুর্গ’-এর খোঁজে বের হবে। 

সাতটি দুর্গম উপত্যকা পার হয়ে অবশেষে মাত্র ৩০টি পাখি (ফারসি ভাষায় ‘সি’ মানে ৩০, আর ‘মুর্গ’ মানে পাখি) গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। সেখানে গিয়ে তারা কোনো বিশাল পাখিকে দেখতে পায় না, বরং একটি আয়নায় তারা নিজেদের প্রতিবিম্বই দেখতে পায়। অর্থাৎ, আত্তারের লেখায় ‘সিমুর্গ’ হলো খোদ ঈশ্বর বা পরম সত্যের প্রতীক, যা মানুষের নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।

২. পারী বা পরী: রহস্যময় সুন্দরী ও জাদুকরী সত্তা

‘পারী’ বলতে আমরা যে ডানাওয়ালা, জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী সুন্দরীদের বুঝি, পারস্যের সাহিত্যে তাদের উপস্থিতি হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন ‘আভেস্তা’ ধর্মবইয়ে এর খোঁজ পাওয়া যায়। জরথুস্ত্রীয় ধর্মে এদেরকে ‘পায়রিকা’ বলা হয়েছে। 

মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীনকালে এদেরকে খুব ভালো চোখে দেখা হতো না। আভেস্তায় তারা ছিল ‘অশুভ জাদুকরী’ বা ‘মায়াবিনী’, যারা উল্কা বা ধূমকেতুর মতো উড়ে বেড়াত এবং খরা বা মহামারি নিয়ে আসত। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসলামী যুগে এসে এদের চরিত্রটি বদলে যায় এবং এরা মানুষের কল্যাণকামী ও সুন্দর অতিপ্রাকৃত চরিত্র হিসেবে সাহিত্যে জায়গা করে নেয়।

পরী হলো মানুষের সহায়তাকারী এক রহস্যময় প্রেমিকা ও বন্ধু, ছবি: সংগৃহীত।

পরী হলো মানুষের সহায়তাকারী এক রহস্যময় প্রেমিকা ও বন্ধু,

আরব্য রজনীর গল্পগুলোতে মূলত আরবীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকলেও, এতে পারস্যের সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। কারণ এই বইটির মূল কাঠামো পারস্যের ‘হাজার আফসানা’ (হাজার গল্প) থেকে নেওয়া। আরব্য রজনীর গল্প ‘প্রিন্স আহমেদ অ্যান্ড দ্য ফেইরি পারী-বানু’-তে পরীর এক চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়। 

সেখানে পারী-বানু হলো এমন এক জাদুকরী রাজকন্যা যে রাজকুমার আহমেদকে নানা বিপদে সাহায্য করে এবং তাকে জাদুকরী তাঁবু ও আপেল উপহার দেয়। এখানে পরী হলো মানুষের সহায়তাকারী এক রহস্যময় প্রেমিকা ও বন্ধু।

৩. জিন: অদৃশ্য জগতের প্রাণী ও সমান্তরাল সমাজ

জিন মধ্যপ্রাচ্য এবং পারস্যের পুরাণ ও লোককথার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জিনদের নিজস্ব সমাজ ও জীবন আছে এবং এরা ভূত নয়। আরব্য রজনীর প্রায় প্রতিটি খণ্ডেই জিনের দেখা মেলে। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি হলো ‘জেলে ও জিন’। সেখানে এক দরিদ্র জেলে সমুদ্র থেকে একটি পিতলের পাত্র উদ্ধার করে, যার মুখ রাজা সুলাইমান (সোলায়মান নবী)-এর মোহর দিয়ে বন্ধ করা ছিল। পাত্র খুলতেই ধোঁয়ার মতো এক বিশাল জিন বেরিয়ে আসে, যে কিনা শত শত বছর ধরে বন্দি ছিল। 

পাত্র খুলতেই ধোঁয়ার মতো এক বিশাল জিন বেরিয়ে আসে, যে কিনা শত শত বছর ধরে বন্দি ছিল, ছবি: সংগৃহীত।

পাত্র খুলতেই ধোঁয়ার মতো এক বিশাল জিন বেরিয়ে আসে, যে কিনা শত শত বছর ধরে বন্দি ছিল,

এছাড়াও পারস্যের জনপ্রিয় মহাকাব্যিক লোককাহিনি ‘আমির আরসালান’-এ দেখা যায়, জিনদের রাজা এবং তাদের বিশাল সেনাবাহিনী রয়েছে। সেখানে ভালো জিনদের বলা হয় ‘মুসলমান জিন’ এবং খারাপ বা অশুভ জিনদের বলা হয় ‘অবিশ্বাসী জিন’। এই বইগুলোতে জিনদের নিজস্ব প্রাসাদ, জাদুর ক্ষমতা, পরিবার এবং রাজনীতির চমৎকার বর্ণনা রয়েছে।

৪. দিভ: শক্তিশালী দৈত্য ও ধ্বংসের প্রতীক

‘দিভ’ হলো পারস্যের গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং শক্তিশালী খলনায়ক। এদের সঙ্গে বীরদের লড়াইয়ের কাহিনি পারস্যের সাহিত্যের অন্যতম আকর্ষণ। মহাকবি ফিরদৌসীর শাহনামায় ‘দিভ’-এর উপস্থিতি রয়েছে। ‘সাদা দিভ’ শাহনামার অন্যতম রোমাঞ্চকর অধ্যায়। পারস্যের রাজা কায়কাউস যখন মাজান্দারান নামক এক জাদুর দেশে অভিযান চালান, তখন সাদা দিভ তার জাদুবলে রাজাসহ পুরো সৈন্যবাহিনীকে অন্ধ করে বন্দি করে রাখে। 

‘দিভ’ শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন আভেস্তান শব্দ ‘দায়েভা’ থেকে, যার অর্থ মিথ্যা দেবতা বা শয়তানের অনুচর, ছবি: সংগৃহীত।

‘দিভ’ শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন আভেস্তান শব্দ ‘দায়েভা’ থেকে, যার অর্থ মিথ্যা দেবতা বা শয়তানের অনুচর,

রাজাকে বাঁচাতে বীর রুস্তমকে সাতটি ভয়ংকর পরীক্ষার (যাকে ‘হাফত খান’ বলা হয়) মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সপ্তম এবং শেষ ধাপে রুস্তম সেই অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করেন, যেখানে সাদা দিভ বাস করত। দিভের বিশাল শরীর আর শক্তির বিরুদ্ধে রুস্তমকে এক মরণপণ লড়াই করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত দিভকে হত্যা করে তার রক্ত দিয়ে তিনি রাজা কায়কাউসের চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনেন।

‘দিভ’ শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন আভেস্তান শব্দ ‘দায়েভা’ থেকে, যার অর্থ মিথ্যা দেবতা বা শয়তানের অনুচর। প্রাচীন পারসিকরা মনে করত, এরা হলো এমন দানব যারা মানুষের মধ্যে লোভ, রাগ এবং ধ্বংসের বীজ বপন করে।

৫. আজদাহা: আগুনের ড্রাগন ও অশুভ শক্তির রূপ

আজদাহা বা ড্রাগন পারস্যের সাহিত্যে ভয়ংকর ধ্বংস ও অন্ধকারের প্রতীক হিসেবে বহুবার এসেছে। শাহনামায় ‘জোহাক’ বা ‘আঝিদাহাকা’ নামের এক অত্যাচারী রাজার গল্প আছে। শয়তানের প্ররোচনায় এই রাজার দুই কাঁধ থেকে দুটি ভয়ংকর সাপ বা আজদাহা বের হয়েছিল। 

এই সাপগুলোকে শান্ত রাখার জন্য প্রতিদিন দুজন যুবকের মগজ খাওয়াতে হতো, ছবি: সংগৃহীত।

এই সাপগুলোকে শান্ত রাখার জন্য প্রতিদিন দুজন যুবকের মগজ খাওয়াতে হতো,

এই সাপগুলোকে শান্ত রাখার জন্য প্রতিদিন দুজন যুবকের মগজ খাওয়াতে হতো। জোহাক এখানে কেবল একজন মানুষ নয়, বরং সে নিজেই একটি ড্রাগন বা আজদাহার মতো অশুভ শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। পরে বীর ফেরেদুন তাকে পরাজিত করেন।

এছাড়া শাহনামায় বীর রুস্তমের সাতটি অভিযানের (হাফত খান) তৃতীয় ধাপে একটি বিশাল আজদাহার মুখোমুখি হওয়ার গল্প আছে। রুস্তম যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন অন্ধকারে একটি বিশাল ড্রাগন তাকে আক্রমণ করতে আসে। রুস্তমের বিশ্বস্ত ঘোড়া ‘রাখশ’ বারবার রুস্তমকে জাগিয়ে দেয়। অবশেষে রুস্তম তার তরবারি দিয়ে সেই ভয়ংকর আগুন-ঝরানো ড্রাগনকে হত্যা করে পৃথিবীকে বিপদমুক্ত করেন।

৬. হুমা: সৌভাগ্যের পাখি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক

হুমা এমন এক আশ্চর্য পাখি, যা পারস্যের সাহিত্যে সৌভাগ্য, রাজত্ব এবং আধ্যাত্মিক উচ্চতার প্রতীক হিসেবে বারবার এসেছে। একে ‘হুমায়ুন’ বা ‘বার্ড অব প্যারাডাইস’ও বলা হয়।

মোগল সম্রাটরাও এই হুমার ধারণায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন, ছবি: সংগৃহীত।

মোগল সম্রাটরাও এই হুমার ধারণায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন,

পারস্যের গীতিকবি হাফিজ শিরাজী এবং মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির কবিতায় ‘হুমা’ পাখির উল্লেখ বারবার পাওয়া যায়। ক্লাসিক সাহিত্যে বলা হয়েছে, ‘হুমা’ পাখি কখনোই মাটিতে বসে না। সে সারা জীবন আকাশের অনেক উঁচুতে উড়ে বেড়ায় এবং কেবল মরা প্রাণীর হাড় খেয়ে বেঁচে থাকে, তাই সে কাউকে আঘাত করে না। সুফি দর্শনে এবং হাফিজের কবিতায় (দিওয়ান-এ-হাফিজ) হুমাকে এমন এক আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা দুনিয়ার তুচ্ছ জিনিস (হাড়) নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং অহংকারমুক্ত। 

প্রাচীন পারসিকরা বিশ্বাস করত যে, এই পাখি যদি উড়ে যাওয়ার সময় কারও মাথার ওপর ছায়া ফেলে, তবে সেই ব্যক্তি অচিরেই সম্রাট বা রাজা হবে। মোগল সম্রাটরাও এই হুমার ধারণায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন; এমনকি অনেক মোগল রাজপ্রাসাদ ও সিংহাসনের নকশায় হুমা পাখির প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হতো।