১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পোষা প্রাণীর ‘প্রথম’ কবরস্থান: ভালোবাসার বিপ্লবের গল্প

অনেকে বলে ফেলেন, “আরে ধুর, ওটা তো স্রেফ একটা বিড়াল, এত কাঁদার কী আছে?”

পোষা প্রাণীর ‘প্রথম’ কবরস্থান: ভালোবাসার বিপ্লবের গল্প
উনিশ শতকের শেষ দিকে, শোকাহত পোষা প্রাণীর মালিকরা লন্ডনের হাইড পার্কে এসে তাদের কুকুর বা বিড়ালকে সেখানে সমাহিত করার অনুমতি চাইতেন। ছবি: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Feb 2026, 03:08 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:50 PM

আমরা যারা বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল পুষি, তারা জানি এই অবুঝ প্রাণীগুলো আমাদের জীবনের কতটা জুড়ে থাকে। তারা শুধু আমাদের খেলার সাথী নয়, বরং পরিবারের একেকজন সদস্যের মতোই হয়ে ওঠে। 

কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে মৃত পোষা প্রাণীর শেষ বিদায় জানানোর কোনো সম্মানজনক ব্যবস্থা ছিল না? সেই সময়কার এক সাধারণ পরিবার আর তাদের আদরের কুকুরের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত আর সুন্দর বিপ্লব।

পুরানো দিনের লন্ডনের কথা ভাবুন। ১৮৮০ সালের দিকে বড় বড় শহরেও পোষা প্রাণীর মৃত্যুর পর খুব কষ্টদায়ক কাজ করতে হতো মালিকদের। হয় মৃত দেহটি টেমস নদীতে ভাসিয়ে দিতে হতো, নয়তো ময়লার স্তূপে ফেলে আসতে হতো। 

এমনকি অনেক সময় মরা পশুদের হাড় দিয়ে আঠা তৈরির কারখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। নিজের খুব আদরের বন্ধুটির এমন বিদায় দেখে অনেক মালিকই গোপনে চোখের জল ফেলতেন, কিন্তু করার কিছু ছিল না। কারণ সেই সময় প্রাণীদের জন্য কোনো আলাদা কবরস্থান ছিল না।

এই প্রথা বদলে দেওয়ার শুরু হয় ১৮৮১ সালে। লন্ডনের এক পরিবার তাদের ছোট্ট সাদা রঙের মাল্টিজ কুকুরটিকে খুব ভালোবাসত। তার নাম ছিল ‘চেরি’। চেরি যখন বার্ধক্যের কারণে মারা গেল, তখন তার মালিকরা ঠিক করলেন তারা চেরিকে অসম্মান করে কোথাও ফেলে দেবেন না। 

তারা লন্ডনের বিখ্যাত ‘হাইড পার্ক’-এর গেট কিপার বা পাহারাদার মিস্টার উইনব্রিজের কাছে গেলেন। কাঁচুমাচু হয়ে অনুরোধ করলেন, উইনব্রিজের কটেজের সামনের এক চিলতে বাগানে চেরিকে কি একটু মাটি দেওয়া যাবে?

উইনব্রিজ মানুষটি দয়ালু ছিলেন। তিনি তাদের ফিরিয়ে দিলেন না। বাগানের এক কোণে চেরিকে কবর দেওয়া হলো। কবরের ওপর ছোট একটা পাথর বসিয়ে সেখানে লিখে দেওয়া হলো- “বেচারা চেরি। মারা গেছে ২৮ এপ্রিল, ১৮৮১।” 

এটাই ছিল শুরু। চেরির পরিবার সম্ভবত বুঝতেও পারেনি তারা এক ঐতিহাসিক কাজ করে ফেলেছে। খবরটা খুব দ্রুত লন্ডনের এক কান থেকে অন্য কানে পৌঁছে গেল। যাদের নিজেদের বাড়িতে জায়গা ছিল না, তারা লাইন লাগালেন মিস্টার উইনব্রিজের দরজায়। সবাই তার কাছে অনুরোধ করতে লাগলেন, “আমার আদরের বিড়ালটাকেও কি একটু জায়গা দেওয়া যাবে?” বা “আমার বিশ্বস্ত কুকুরটা কি এখানে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ পাবে?” 

দেখতে দেখতে উইনব্রিজের ছোট্ট বাগানটি অনেকগুলো ছোট ছোট সমাধিফলকে ভরে উঠল। আর এভাবেই জন্ম নিল পৃথিবীর প্রথম পরিকল্পিত পোষা প্রাণীর কবরস্থান।

ইতিহাসবিদ পল কুডুনারিস এই পুরো বিষয়টি নিয়ে অনেক বছর ধরে গবেষণা করেছেন। তিনি বলছেন, এটি কেবল একটি কবরস্থান ছিল না, ছিল মানুষের মনের ভেতরের একটি নীরব বিপ্লব। মানুষ যে প্রাণী আর মানুষের ভালোবাসাকে এক কাতারে নিয়ে আসছে, তার প্রমাণ ছিল এই হাইড পার্কের বাগানটি। মানুষ বুঝতে শুরু করল যে, একটি অবুঝ প্রাণীর মৃত্যুতে মন খারাপ করা কোনো পাগলামি নয়।

কুডুনারিস তার গবেষণার প্রয়োজনে পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেরিয়েছেন। তিনি দেখেছেন, এই ভালোবাসার গল্পটা সব দেশেই এক। ১৯০০ সালের দিকে প্যারিসের কাছে যখন প্রথম সরকারি পশু কবরস্থান খোলা হলো, তখন চার্চের লোকজন খুব আপত্তি করেছিল। তাদের কথা ছিল- মানুষের জন্য যে জায়গা, সেখানে প্রাণীরা কেন আসবে? শেষ পর্যন্ত একটা শর্তে তারা রাজি হয়- কবরের ওপর কোনো ধর্মীয় চিহ্ন ব্যবহার করা যাবে না। 

আজও সেই কবরস্থানে গেলে আপনি দেখবেন, সেখানে ক্রুশ বা কোনো ধর্মীয় ছবি নেই। কিন্তু তাতে মানুষের ভালোবাসায় কোনো কমতি পড়েনি। মানুষ সেখানে তাদের প্রিয় বন্ধুর মূর্তিও বানিয়ে রেখেছে।

আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যায় আরেক অদ্ভুত দৃশ্য। সেখানে মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তরে খনি শ্রমিকরা তাদের বিশ্বস্ত ঘোড়া বা কুকুরদের জন্য নিজেরাই পাথর কেটে কবর বানাত। কুডুনারিস যখন সেই এলাকাগুলো ঘুরে দেখেছেন, তখন রীতিমতো অবাক হয়েছেন। কেউ তার মৃত কুকুরের জন্য একটা ডাকবাক্স বসিয়েছেন যাতে সেখানে চিঠি লিখে রেখে আসা যায়। কেউবা এমন কিছু বানিয়েছেন যা দেখলে বোঝা যায় মালিক তার বন্ধুকে কতটা মনে রাখেন।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। আজও যখন কারো পোষা প্রাণী মারা যায়, তখন অনেকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে বলে ফেলেন, “আরে ধুর, ওটা তো স্রেফ একটা কুকুর, এত কাঁদার কী আছে?” কুডুনারিস বলছেন, এই অবহেলাটা কাটানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি যখন শোকগ্রস্ত মালিকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তখন দেখেছেন তাদের দুঃখটা কোনো মানুষের বিয়োগব্যথার চেয়ে কম নয়।

আজকের দিনে যখন আমরা আমাদের পোষা প্রাণীকে পরিবারের অংশ ভাবি, তখন তার পেছনে চেরি আর মিস্টার উইনব্রিজের সেই ছোট্ট বাগানের অনেক বড় অবদান আছে। হাইড পার্কের সেই ছোট্ট পাথরগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ভালোবাসা আসলে কোনো নিয়ম বা প্রজাতির সীমানা মানে না। একটি অবুঝ প্রাণী সারাজীবন আমাদের যেভাবে সঙ্গ দিয়ে যায়, বিনিময়ে আমাদের কাছ থেকে তার একটু সম্মান পাওয়ার অধিকার নিশ্চয়ই আছে।

পরিশেষে বলা যায়, এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে শোক কোনো হাস্যকর বিষয় নয়। যে প্রাণীটি আমাদের একাকীত্ব দূর করল, যে আমাদের কোনো স্বার্থ ছাড়াই ভালোবাসল, তাকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানো আসলে আমাদেরই মানবিকতার পরিচয়।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন