রবীন্দ্রনাথের শিশুরা

ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের জীবন কেটেছে বন্দিদশায়। সে দুঃখ নানা লেখায় ফুটে উঠেছে।

>> আবুল মোমেনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 May 2014, 12:46 PM
Updated : 12 May 2014, 12:46 PM

জীবনস্মৃতি থেকেই জানা যাক-- “আমাদের এক চাকর ছিল, তাহার নাম শ্যাম। শ্যামবর্ণ দোহারা বালক, মাথায় লম্বা চুল, খুলনা জেলায় তাহার বাড়ি। সে আমাকে ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসাইয়া আমার চারিদিকে খড়ি দিয়া গন্ডি কাটিয়া দিত। গম্ভীর মুখ করিয়া তর্জনি তুলিয়া বলিয়া যাইত, গন্ডির বাহিরে গেলে বিষম বিপদ।”

বন্দিশিশুর মন কি শিকল পরে? সে বাহ্য বন্ধন ছিন্ন করে মুক্তি খোঁজে। কতভাবেই না কবি এই মুক্তির কথা বলেছেন। কয়েকটি গানের চরণ থেকে পরিণত বয়সে ব্যক্ত সে আকুতি ও প্রত্যয় জানা যাক--

১. কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা   মনে মনে?

    মেলে দিলেম গানের সুরের এই ডানা   মনে মনে।

২. আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,

    আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।

৩. ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে ওরে পাখি,

    যা উড়ে যা উড়ে, যা রে একাকী।

ছোটদের জীবনে তো চাই মুক্তির আনন্দ, অসীম স্বাধীনতা। কিন্তু সংসারে কেবল বাধা, কেবল বন্ধন, কেবলই নিষেধের নিগড়।

তাঁর ছোটগল্পে অনেকগুলো শিশুচরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। তারা প্রায় সব্বাই আমাদের মনের বেদনার তন্ত্রীটিতে ঘা দিয়ে যায়। কতভাবেই না তাদের বড় হওয়ার পরিবেশটা মাঠে মারা যায়, তা বড়রা বুঝতেই চায় না।

আশুর কথা মনে পড়ে? গিন্নি গল্পের নায়ক আশুতোষ। একটু গোবেচারা ভালোমানুষ শিশুটি চালাকি জানে না। সংসারে অনেক গুরুজন চালাকচতুর, স্মার্ট বালকের প্রতি প্রশ্রয়প্রবণ হলেও শান্তশিষ্ট গোবেচারাদের ক্ষেত্রে হন কঠোর। শান্তভাবে তাদের চূড়ান্ত অসহায়তার প্রকাশ ঘটে, আর তাতে শিক্ষকের প্রতাপ জাহির হয় বাঁধভাঙা নিষ্ঠুরতায়। কখনও কখনও প্রহারের চেয়ে তির্যক মন্তব্য ও বিদ্রুপবাণী দুঃসহ যন্ত্রণা দেয়। আশুর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেছিল শিবনাথ পণ্ডিতের হাতে।

আশু পরিপাটি হয়ে স্কুলে আসত। বাড়ির দাসি দুপুরে রেকাবি সাজিয়ে টিফিন আনত। এতে আশু যে বাড়ির যত্নে থাকা গৃহপালিত সুবোধ প্রাণী, তা-ই যেন ফুটে উঠত পণ্ডিতমশাই ও অন্য অনেকের ব্যবহারে। তাই, এ ছিল তার জন্য বিব্রতকর এক অবস্থা।

এসব মিলিয়ে পণ্ডিতমশাই এই শান্ত বালকটিকে পরিহাসের পাত্র বানিয়ে যথেচ্ছ উত্যক্ত করতেন। এক ছুটির দিনে আশু ছোটবোনের সঙ্গে গ্যারেজে পুতুল খেলছিল। এমন সময় আকস্মিকভাবে বৃষ্টির উৎপাত। পথচারীদের কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে। সেদিন ছিল ওদের পুতুলের বিয়ে। মিছেমিছি-খাবারের আয়োজন চলছে। একসময় বিয়ের লগ্ন এল, পুরোহিত পাবে কোথায়? ছোটবোন তো নেহায়েৎ শিশু, ছুটে গিয়ে বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে ছাতা গুটিয়ে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোককে হাত ধরে ডেকে পুরোহিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাল।

দূর থেকে আশু দেখল এ যে পণ্ডিতমশাই। দেখেই তো তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। ছুটে পালাল। খেলা ভণ্ডুল হয়ে গেল। তখনকার মতো পরিত্রাণ মিললেও শেষরক্ষা হল না। পরের দিন স্কুলে যেতেই পণ্ডিতমশাই ওকে দেখিয়ে অন্য ছাত্রদের বললেন, গিন্নি এসেছে। তারপর রসিয়ে রসিয়ে আগের দিনের ঘটনাটা ভেঙে বললেন।

পণ্ডিতমশাইয়ের প্রশ্রয়ে বাকিরা এই সুবোধ শান্ত বালকের পেছনে লাগল গিন্নি গিন্নি রব তুলে।

তখন তার মনের অবস্থাটা কেমন হয়েছিল?-- “পৃথিবীর সমস্ত মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সবলে বালককে নিচের দিকে টানিতে লাগিল। কিন্তু ক্ষুদ্র আশু সেই বেঞ্চির উপর হইতে একখানি কোঁচা ও দুইখানি পা ঝুলাইয়া ক্লাসের সকল বালকের লক্ষ্যস্থল হইয়া বসিয়া রহিল। এতদিনে আশুর অনেক বয়স হইয়া থাকিবে। এবং তাহার জীবনে অনেক গুরুতর দুঃখলজ্জার দিন আসিয়াছে সন্দেহ নাই, কিন্তু সেই দিনকার বালক হৃদয়ের ইতিহাসের সহিত কোনোদিনের তুলনা হইতে পারে না।”

ছুটি গল্পের ফটিক ছিল পিতৃহীন। দরিদ্র পরিবারে বিধবা মায়ের পক্ষে ঠিকমতো শৈশবের পরিচর্যা করাও সম্ভব হয়নি। সে হয়ে উঠেছিল দস্যিছেলে, গাঁয়ের সমবয়সী ও ছোটদের দুষ্টুমির দলপতি। দুষ্টুমির জন্য নালিশ আসত বাড়িতে। মায়ের তিরস্কার জুটত কপালে। যত্নের অভাবে পড়ালেখাতেও পিছিয়ে পড়ছিল সে। ওকে কেমন করে বড় করবেন, এ নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা বাড়ছিল দিন দিন। এমন সময় ওদের বড়মামা এসে হাজির। তিনি বোনের কষ্ট দেখে ফটিককে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে। উদ্দেশ্য, পড়ালেখা করিয়ে মানুষ করে দেবেন।

কিন্তু কপালটা বড় মন্দ ফটিকের। মামিমা কিছুতেই ওকে ভালোভাবে নিলেন না। ভাবলেন, বাড়িতে একটা আপদ এল। কথাবার্তা আচার-আচরণে সে মনোভাব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন।

ফটিক দুষ্টু ছিল বটে, কিন্তু খারাপ ছিল না। সে চেষ্টা করল প্রাণপণ মাসির মন জুগিয়ে চলতে। কিন্তু ওঁর মন টলে না। নিজের সন্তানের জন্য অগাধ স্নেহ, প্রশ্রয়। কিন্তু পরের ছেলের জন্যে হৃদয়টি পাষাণ তাঁর। এমন সময়ে জ্বরে পড়ল ফটিক। ঘোর জ্বর। বেঁহুশ প্রায় জ্বরে। জ্বরের বিকারে সে মায়ের কাছে যাওয়ার বায়না ধরেছে। জাহাজে করে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখছে। জাহাজের খালাসির মতো সুর করে বলতে থাকে--

‘এক বাঁও মেলে না। দো বাঁও মেলে-এ-এ-না।’

খবর পেয়ে ওর মা আসতে আসতে ওর শেষ অবস্থা। এই আমাদের সমাজ। বিনা দোষে একটা শিশু তার শৈশবের আনন্দ হারায়, জীবন গড়ার সুযোগ হারায়, এমনকি নিষ্ঠুর বাস্তবতার দৌরাত্ম্যে শেষ পর্যন্ত জীবনও হারায়।

অতিথি গল্পের তারাপদ আবার অন্যরকম ছেলে। ভারি সুন্দর, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। খুব গুণী, গাইতে পারে ভালো, চট করে যে কোনো কাজ শিখে ফেলে, এমনকি রান্না পর্যন্ত। পুঁথি পড়ে চমৎকার। বড়দের মন জয় করতে ওস্তাদ। মানুষকে মায়ায় বাঁধে অনায়াসে, আর মানুষ ওকে ভালোবাসায় বাঁধে অন্তরের টানে। কিন্তু ওর ভেতরে একটা মন আছে বড্ড উদাসি। এক জায়গায়, এক পরিবেশে বেশিদিন মন টেকে না। নিজের মতো চলে বেড়ায়।

এমন ছেলে তারাপদকে ভালো না লেগে পারা যায় না।

তারাপদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি উক্তি স্মরণ করা যায়--

১. অজ্ঞাত বহিঃপৃথিবীর স্নেহহীন স্বাধীনতার জন্য তাহার চিত্ত অশান্ত হইয়া উঠিত।

২. তারাপদ হরিণ শিশুর মতো বন্ধনভীরু আবার হরিণেরই মতো সংগীতমুগ্ধ।

৩. অন্তরের মধ্যে সে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত এবং মুক্ত ছিল।

৪. সে এই সংসারের পঙ্কিল জলের উপর দিয়া শুভ্রপক্ষ রাজহংসের মতো সাঁতার দিয়া বেড়াইত।

আবার দেখি পোস্টমাস্টার গল্পের রতন। মাত্র ৮-৯ বছরের মেয়ে। পুতুল খেলার বয়স। কিন্তু দারিদ্রের কারণে তাকেও কাজ করে খেতে হয়। আর সেকালে মেয়েদের অল্পবয়সে বিয়ে হত, অল্প বয়সেই গৃহস্থালি কাজকর্ম শিখতে হত। ঐ বয়সে রতন কিনা গাঁয়ের পোস্টমাস্টারের গৃহকর্ম করত। রান্নাবান্না থেকে ঘরদোর গোছানো, বাবুর তামাকটিও সেজে দিতে হত। এমনকি কলকাতার বাবু গ্রামে এসে জ্বরে পড়লে তাঁর সেবাও করেছে, পথ্য রেঁধে তা খাইয়েছে, ঔষুধ দিয়েছে। আর বড়দের মতো প্রায় একজন মায়ের মন নিয়ে উৎকণ্ঠার সঙ্গে পোস্টমাস্টারের আরোগ্যের জন্য ধৈর্য ধরে সস্নেহে সেবা করে গেছে।

এমনভাবে একটা মানুষের কাজ করলে সে তো আর কেবল বাঁধা বেতনের দাসিটি থাকে না। সবতাতে সে মন লাগিয়েছে। তাই পোস্টমাস্টার রতনের ছোট্ট জীবনেও তার মনে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছিল। পোস্টমাস্টারের মন ছুঁয়েছিল সে।

কিন্তু শহুরে মানুষ পোস্টমাস্টার চেষ্টা-তদ্বির করে শহরে বদলি নিলেন। তাঁর জন্য সেটাই ছিল স্বাভাবিক কাজ। তাঁরা অসমবয়সী, অসম তাঁদের সামাজিক অবস্থান, তার উপর রতন নিতান্ত শিশু। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিদায়ের সময় বোঝা গেল মনটা কীভাবে বাঁধা পড়েছিল। এক সময় পোস্টমাস্টারের নৌকা ছেড়ে দেয় আর রতন যেন কোথায় হারিয়ে যেতে থাকে--

“রতনের মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হইল না। সে সেই পোস্ট অফিসের গৃহের চারদিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল।”

রতনের জন্য মনটা কেমন করে-- না করে উপায় থাকে না।

‘এভাবে আমরা কাবুলিওয়ালার মিনিকে পাব-- যার বয়স মাত্র পাঁচ। কিন্তু ঐ পুঁচকে মেয়েটিও দাগ কাটে মনে। গাছপাগল বলাইকে ভোলা যায় না।

এইসব শিশু চরিত্রের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সাহিত্যকর্মে এবং বিশ্বসাহিত্যের ভাণ্ডারে এরা অতুলনীয় মানুষ। ওদের সঙ্গে পরিচয়টা ঝালিয়ে নেওয়া দরকার সবার।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক