Published : 03 Feb 2026, 02:18 AM
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য জিনিস ব্যবহার করি, কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি এই জিনিসগুলো আসলে কার মস্তিষ্কপ্রসূত? অবাক করার মতো বিষয় হলো, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এমন কিছু মানুষের হাত ধরে এসেছে, যাদের নাম আমরা ইতিহাসের বইতে খুব একটা খুঁজে পাই না। বিশেষ করে সেই উদ্ভাবক নারীদের কথা আমরা জানিই না, যারা সমস্ত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে পৃথিবীকে নতুন কিছু উপহার দিয়েছিলেন।
আমরা কি জানি, আজকের যে ‘ওয়ার্ড প্রসেসর’ ব্যবহার করে আমরা কম্পিউটার বা মোবাইলে লেখালেখি করি, তার প্রাথমিক প্রোটোটাইপ বা নকশাটি তৈরি করেছিলেন একজন নারী? তিনি এটি তৈরি করেছিলেন মূলত সেই সময়ের নারী অফিস সহকারীদের (সেক্রেটারি) কাজ সহজ করার জন্য।
কিংবা ধরুন, আপনার চশমার কাচ, ক্যামেরার লেন্স বা গাড়ির সামনের উইন্ডশিল্ডে যে প্রতিফলন-বিরোধী প্রলেপ থাকে, সেটিও একজন নারীর পেটেন্ট করা। শুধু তাই নয়, ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের রকেটকে মহাকাশে পাঠাতে ব্যবহৃত বিশেষ জ্বালানি ‘হাইডিন’ থেকে শুরু করে সাগরের তেজস্ক্রিয়তা মাপার পদ্ধতি- এসবের নেপথ্যে ছিলেন মেধাবী কিছু নারী।
আজ আমরা এমন পাঁচজন নারী উদ্ভাবকের কথা জানবো, যাদের আবিষ্কার আমাদের আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের গল্প শুধু আবিষ্কারের নয়, বরং অসম্ভব সামাজিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকার গল্প।
১. এভলিন বেরেজিন: ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের জননী
আজকের মাইক্রোসফট ওয়ার্ড বা গুগল ডকস- এসবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এভলিন বেরেজিন। ১৯৫১ সালে তিনি যখন একটি অফিসে কাজ শুরু করেন, তখন তিনি ছিলেন সেখানে একমাত্র নারী। তাকে হুট করে বলা হলো, “একটি কম্পিউটার ডিজাইন করো।” এর আগে তিনি কখনো কম্পিউটার দেখেননি, তবুও তিনি দমে যাননি। অবিশ্বাস্য দক্ষতায় তিনি সেই কাজ সম্পন্ন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ‘রেডাক্ট্রন কর্পোরেশন’ নামে একটি স্টার্টআপ গড়ে তোলেন, যা ছিল বিশ্বের প্রথম কম্পিউটারাইজড টাইপরাইটার তৈরির কোম্পানি।
তার আবিষ্কৃত যন্ত্রটির নাম ছিল ‘ডেটা সেক্রেটারি’। আজকের ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের সঙ্গে এর চেহারার কোনো মিলই ছিল না। এটি ছিল একটা ছোট ফ্রিজের মতো যন্ত্র, যার কোনো স্ক্রিন বা মনিটর ছিল না। কিন্তু এটি সেই সময়ের নারী অফিস সহকারীদের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো টেক্সট বা লেখা এডিট করা, ডিলিট করা এবং কাট-পেস্ট করার সুযোগ তৈরি হয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ১৯৭২ সালে তাকে একজন ‘দক্ষ সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার এবং তুখোড় বিক্রয় নির্বাহী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। এমন এক যুগে তিনি সফল হয়েছিলেন যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি ছিল প্রায় কল্পনাতীত।
২. ক্যাথরিন বার ব্লজেট: অদৃশ্য কাচের জাদুকর
আধুনিক বিজ্ঞানের এমন অনেক আবিষ্কার আছে যা ক্যাথরিন বার ব্লজেটের অবদান ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। এই পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ ১৯৩৮ সালে ‘অদৃশ্য’ বা প্রতিফলন-হীন কাচ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আমরা যখন চশমা পরি কিংবা কোনো অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ দেখি, তখন যদি কাচের ওপর আলোর প্রতিফলন বা ঝিলিক পড়তো, তবে কিছুই দেখা যেতো না। ক্যাথরিন প্রায় দশ বছর ধরে গবেষণার পর সাবানের একটি সূক্ষ্ম আস্তরণ ব্যবহার করে আলোর এই প্রতিফলন দূর করার উপায় বের করেন।
তিনি অণুর সমান পাতলা আস্তরণ একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে প্রায় ৩ হাজার স্তর পর্যন্ত তৈরি করতেন। এর ফলে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন ঠিক কতটুকু আলো সেই কাচের মধ্য দিয়ে যেতে পারবে। যদিও তার সেই শুরুর দিকের সাবানের প্রলেপ খুব সহজেই ধুয়ে যেত, কিন্তু তার সেই পেটেন্টই আজকের আধুনিক এবং স্থায়ী প্রতিফলন-রোধী কোটিংয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
৩. মেরি বিট্রিস ডেভিডসন কেনের: এক নির্ভীক উদ্ভাবক
মেরি বিট্রিস কেনের নাম হয়তো আমরা আগে শুনিনি, কিন্তু তার আবিষ্কারের সুফল আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। তিনি এমন এক পরিবার থেকে এসেছিলেন যেখানে সবাই কিছু না কিছু আবিষ্কার করতেন। মেরি নিজে পাঁচটি পেটেন্টের অধিকারী ছিলেন, যা আজও কোনো আফ্রিকান-আমেরিকান নারীর জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যা। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ছিল ‘স্যানিটারি বেল্ট’, যা ঋতুস্রাবের সময় রক্ত জামাকাপড়ে লেগে যাওয়া রোধ করতো।
মেরি ১৯২০ সালে এটি প্রথম তৈরি করলেও অর্থের অভাবে পেটেন্ট করতে পারেননি। ১৯৫৭ সালে একটি বড় কোম্পানি তার এই আইডিয়াটি বাজারজাত করতে চাইলেও পরবর্তীতে তারা পিছিয়ে যায় শুধু এই কারণে যে, মেরি একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী ছিলেন। বর্ণবাদের সেই ভয়াবহ সময়েও মেরি থেমে থাকেননি। পরবর্তীতে তিনি হুইলচেয়ারের সাথে যুক্ত করা যায় এমন বিশেষ ব্যাগ, টয়লেট পেপার হোল্ডার এবং শরীর মালিশ করার যন্ত্রও আবিষ্কার করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তার মেধা দিয়ে মানুষের উপকার করে গেছেন।
৪. মেরি শেরম্যান মরগান: রকেট বিজ্ঞানের নেপথ্য কারিগর
যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশ যুগে নিয়ে যাওয়ার পেছনে মেরি শেরম্যান মরগানের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে উত্তর ডাকোটার এক খামারে জন্ম নেওয়া মেরির শৈশব ছিল কঠিন। নয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি স্কুলেই যাননি। পরবর্তীতে ওহিওতে কলেজে পড়তে গেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি পড়াশোনা ছেড়ে একটি অস্ত্রের কারখানায় কাজে যোগ দেন। যুদ্ধের পর তিনি যখন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কাজ শুরু করেন, তখন সেখানে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী এবং পুরো বিভাগে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যার কোনো কলেজ ডিগ্রি ছিল না।
তাকে একটি কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হয়: জুপিটার-সি রকেটের জন্য এমন এক জ্বালানি তৈরি করতে হবে যা রকেটটিকে কক্ষপথে পৌঁছানোর শক্তি যোগাবে। সমস্যা ছিল, রকেটের ইঞ্জিন আগে থেকেই তৈরি ছিল, তাই মেরিকে তার নতুন জ্বালানিটি সেই ইঞ্জিনের উপযোগী করে তৈরি করতে হয়েছিল। অসম্ভবকে সম্ভব করে মেরি তৈরি করেন ‘হাইডিন’ নামক জ্বালানি, যার শক্তিতে ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্যাটেলাইট ‘এক্সপ্লোরার-১’ মহাকাশে পাড়ি জমায়। মেরি খুব রসিক মানুষ ছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন তার এই নতুন জ্বালানির নাম হোক ‘ব্যাগেল’, কিন্তু সেনাবাহিনী সেই রসিকতা বুঝতে না পারায় শেষ পর্যন্ত নাম হয় হাইডিন।
৫. কাৎসুকো সারুহাশি: সমুদ্র ও জলবায়ুর পাহারাদার
জাপানি ভূ-রসায়নবিদ কাৎসুকো সারুহাশী প্রথম বিজ্ঞানী যিনি সমুদ্রের পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইডের (CO2) পরিমাণ মাপার পদ্ধতি বের করেন। আজকের যুগে আমরা জলবায়ু সংকট নিয়ে যে গভীর গবেষণা করি, তার মূলে রয়েছে তার এই পরিমাপ পদ্ধতি। সারুহাশী মাত্র ২১ বছর বয়সে বিজ্ঞানের জগতে পা রাখেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানি নারীদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাকে বিজ্ঞানচর্চা করে স্বাবলম্বী হতে হবে।
তার গবেষণার আরেকটি বড় দিক ছিল সাগরের পানিতে পারমাণবিক দূষণ শনাক্ত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক পরীক্ষা চালাচ্ছিল, তখন সারুহাশি প্রমাণ করে দেন যে সমুদ্রের স্রোত সেই তেজস্ক্রিয়াকে সরাসরি জাপানের দিকে নিয়ে আসছে। তার এই নিখুঁত ও সাহসী গবেষণা সেই সময়ে ভূ-পৃষ্ঠে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া তিনি ‘সোসাইটি অফ জাপানিজ উইমেন সায়েন্টিস্টস’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যাতে নারী বিজ্ঞানীরা তাদের সমস্যার কথা বলার জায়গা পান।
এই পাঁচজন নারীর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উদ্ভাবন কোনো লিঙ্গ বা বর্ণের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে অদম্য কৌতূহল এবং কাজ করার জেদের ওপর। আজকের প্রজন্মের তরুণ পাঠকদের জন্য এই গল্পগুলো কেবল তথ্যের উৎস নয়, বরং এক একটি অনুপ্রেরণা। তারা যদি প্রতিকূলতার পাহাড় টপকে বিশ্ব জয় করতে পারেন, তবে আমরা কেন পারবো না?
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন