Published : 07 Aug 2026, 02:45 AM
শ্রাবণের আকাশে মেঘ জমতে শুরু করলেই কোথাও না কোথাও একটা সুর বেজে ওঠে। কখনো নিজের অজান্তেই গুনগুন করে, কখনো বা ভেসে আসে দূরের কোনো জানালা থেকে। বাঙালির এমন কোনো ঋতু নেই, এমন কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি নেই, যাকে ধরে রাখার জন্য একটি রবীন্দ্রসংগীত তৈরি হয়ে বসে নেই।
প্রতি বছর বাইশে শ্রাবণ এই সত্যটাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। কীভাবে একজন মানুষ একা হাতে একটি জাতির সমস্ত অনুভূতিকে ছুঁতে পারেন, সুরের ভাষাটাই বদলে দিতে পারেন? ১৯৪১ সালের ৭ অগাস্ট (বাংলা ১৩৪৮-এর ২২ শ্রাবণ) যে মানুষটি চোখ বুজেছিলেন, তিনি রেখে গিয়েছিলেন দুই হাজারেরও বেশি গান।
আজ প্রায় ৮৫ বছর পরও বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও অতন্দ্র প্রহরীর মতো বেজে ওঠে সেই সুর। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ১৮৬১ সালের ৭ মে জন্ম নেওয়া রবীন্দ্রনাথ বড় হয়েছেন এক গানে-ভরা পরিবেশে। বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন রাগসংগীত ও পাশ্চাত্য সংগীত দুই ধারাতেই পারদর্শী, মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ লিখতেন ব্রহ্মসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান। আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পিয়ানোয় দেশি-বিদেশি সুরের মিশ্রণে তৈরি করতেন নতুন নতুন সুর, তারই হাত ধরে শুরু হয় কিশোর রবীন্দ্রনাথের গান বাঁধার প্রথম পাঠ।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তার হাতেখড়ি হয়েছিল বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে, পরে তালিম নেন যদুভট্টের কাছে, যাকে তিনি ‘ভারতের দ্বিতীয় তানসেন’ বলতেন। ষোলো-সতেরো বছর বয়সেই তিনি নিজের গানে নিজে সুর দিতে শুরু করেন এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘পুরুবিক্রম’ ও ‘সরোজিনী’ নাটকের জন্য গান লেখেন।
রবীন্দ্রনাথ তার সংগীত জীবনের প্রথম পর্বে হিন্দুস্থানি ধ্রুপদ-ধামারের অনুগামী থাকলেও গতানুগতিক ছাঁচে তিনি বেশিদিন বন্দি থাকেননি। ১৮৮১ সালের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ আর ১৮৮২ সালের ‘কালমৃগয়া’- দুই রচনাতেই কাহিনি বলা হয়েছে সম্পূর্ণ সুরের মাধ্যমে, আর বনদেবীদের সমবেত গানে ছিল স্পষ্ট পাশ্চাত্য, স্কচ ও আইরিশ সুরের ছাপ।
বিলেতে শোনা ইউরোপীয় সুর থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বা ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’র মতো কালজয়ী গান। পরের জীবনে নৃত্যনাট্যেও গানই হয়ে ওঠে কাহিনি বলার প্রধান মাধ্যম; ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’ ও ‘শ্যামা’র প্রতিটি সংকটমুহূর্ত গানে গানেই ফুটে ওঠে।
রবীন্দ্রসংগীতের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি কখনও কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা থাকেনি। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তের সুর তিনি নতুন করে গড়েছেন- মারাঠি সুরে ‘বিশ্ববীণারবে’, গুজরাটি সুরে ‘নমি নমি ভারতী’, পাঞ্জাবি ভজনের আদলে ‘গগনের থালে রবিচন্দ্র’, আসামের লোকসুরে ‘হে বধূ কোন মায়া’, এমনকি কর্ণাটকি সুরে তিনি বেঁধেছেন ‘আজি শুভদিনে’। আর ভাগ্নি সরলা দেবীর সংগ্রহ করা মহীশূরের এক ভজন-সুর থেকেই জন্ম নেয় ‘এসো হে গৃহদেবতা’।
এভাবে ভক্তি, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও মানবতাবোধ- জীবনের প্রায় কোনো অনুভূতিই তার গানের বাইরে থাকেনি, আর তাই তার গান কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা সময়ে আটকে না থেকে হয়ে উঠেছে বাঙালির জীবনযাপনের ভাষা। বাংলার মাটির সুর তাঁকে টেনেছে সবচেয়ে বেশি।
জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত পদ্মাপাড়ের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে যাতায়াতের সময় তিনি বাউল ও লোকসংগীতের গভীরে প্রবেশ করেন। এই সময়েই শিলাইদহ পোস্ট অফিসের ডাকহরকরা গগন হরকরার সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। গগনের গাওয়া ‘কোথায় পাব তারে’ গানের সুরেই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা’, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠে।
লালন ফকিরের গান ও দর্শনও তাকে প্রভাবিত করে; ক্ষিতিমোহন সেনের সংগৃহীত লালনগীতি পড়ে মুগ্ধ হয়ে তিনি ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডের হিবার্ট বক্তৃতায় লালনের ভাবধারা নিয়ে আলোচনা করেন। তার বাউলাঙ্গের গানগুলোর মধ্যে ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ বা ‘আমি কান পেতে রই’ আজও মানুষের হৃদয়ে দোলা দেয়। কীর্তনও তাকে সমানভাবে মুগ্ধ করেছিল। বিদ্যাপতি ও জয়দেবের অনুসরণে কিশোর বয়সেই তিনি লিখেছিলেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে প্রাচীন ব্রজবুলি ভাষায় লেখা সেই পদগুলো প্রথমে অনেকে প্রাচীন কোনো পদকর্তার রচনা বলে ভুল করেছিলেন। সুরের মতো তালের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বিদ্রোহী। প্রচলিত তালের গণ্ডি ভেঙে তিনি নিজেই তৈরি করেন নতুন ছয়টি তাল; তার যুক্তি ছিল সরল, কবিতায় ছন্দের যে কাজ, গানে তালেরও সেই একই কাজ।
দুই হাজারের বেশি গানের এই বিশাল সম্ভারকে সংগীতবিদরা সাধারণত ছয়টি পর্যায়ে ভাগ করেন—পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, আনুষ্ঠানিক ও বিচিত্র। পূজা পর্যায়েই গানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তবে তা কোনো প্রথাগত উপাসনা নয়, বরং নিজের ‘জীবনদেবতা’-র প্রতি নিবেদিত সংগীত, যার উদাহরণ ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’ বা ‘নব আনন্দে জাগো’। প্রেম পর্যায়ের গানগুলো ব্যক্তিগত প্রেমকাহিনির সীমা ছাড়িয়ে মানুষের চিরকালীন হৃদয়াবেগের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে।
প্রকৃতি পর্যায়ে তার প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা ও বসন্ত; বর্ষার বিরহকাতর ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ কিংবা গ্রীষ্মকে স্বাগত জানানো ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’ অথবা বসন্তের উৎসবমুখর ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ তার প্রমাণ। স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলোর শিকড় হিন্দুমেলা থেকে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী সভায় গাওয়া হয় ‘একবার তোরা মা বলিয়া ডাক’, টাউন হলের প্রতিবাদসভায় বাউল সুরে ধ্বনিত হয় ‘আমার সোনার বাংলা’, আর রাখিবন্ধন উৎসবে গাওয়া হয় ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’।
১৯০৬ সালে তিনি নিজের কণ্ঠে বেশ কিছু স্বদেশী গান রেকর্ড করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি’ এবং ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’। পরবর্তী সময়ে লেখা ‘সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান’ আজও মানুষের মনের জড়তা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস জাগানোর ডাক দেয়।
রবীন্দ্রনাথের গানকে বাকি সব থেকে আলাদা করে তোলে কথা আর সুরের এক অদ্ভুত মিলন। ‘জীবনস্মৃতি’-তে তিনি লিখেছেন, “সুর কথাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে কথা একা হেঁটে পৌঁছাতে পারত না।” এই কারণেই তার গানগুলোকে সংগীত-সমালোচকরা ‘কাব্যসংগীত’ নামে আলাদা করে চেনেন। আর এপার-ওপার বাংলার জাতীয় সংগীতই যে তার হাতে লেখা—ভারতের ‘জনগণমন’ আর গগন হরকরার সুরে গড়া বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’—এর চেয়ে বড় প্রমাণ বোধহয় আর নেই যে, কতখানি গভীরভাবে তার সুর মিশে আছে এই জনপদের সম্মিলিত পরিচয়ে।
মৃত্যুর মাত্র সাত মাস আগে, ১৯৪১ সালের ৯ জানুয়ারি, শান্তিনিকেতনের ‘উদয়ন’-এর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথ নিজের সৃষ্টিকর্মের হিসাব কষছিলেন প্রায় আত্মসমালোচকের ভঙ্গিতে। রানী চন্দের ‘আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে ধরা আছে সেদিনের সেই কথোপকথন। নিজের বিপুল রচনাসম্ভার নিয়ে তিনি তখন প্রায় সংকোচই প্রকাশ করেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন যে জীবনভর যা লিখেছেন তার সবটুকু কালের কষ্টিপাথরে টিকবে না।
কিন্তু একটি জায়গায় তার কণ্ঠে ছিল সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন নিশ্চয়তা, নিজের গান প্রসঙ্গে। তিনি বলে গিয়েছিলেন, “জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে তা বলতে পারিনে। কিছু ইঁদুরে খাবে, তবুও বাকি থাকবে কিছু। জোর করে বলা যায় না; যুগ বদলায়, কাল বদলায়, তার সঙ্গে সব কিছুই তো বদলায়। তবে সবচেয়ে স্থায়ী হবে আমার গান এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালিরা, শোকে দুঃখে, সুখে আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এই গান তাদের গাইতে হবেই।”
মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বলা এই কথাটির সত্যতা শুধু তার নিজের বিশ্বাসেই থেমে থাকেনি, পরবর্তীতে বহু প্রতিকূলতার মুখেও তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। সাহিত্যিক ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ তার ‘জলপাই রঙের অন্ধকার’ (১৯৯২) বইয়ে ‘নষ্টদের কবলে দুই কবি’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে যতবারই প্রতিক্রিয়াশীল মহল রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে, ততবারই ফল হয়েছে ঠিক তার উল্টো। বাদ দেওয়ার প্রতিটি চেষ্টা তাকে বাঙালির হৃদয়ে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ— যাঁকে বাতিলের চেষ্টা করে আসছে নষ্টরা পবিত্র পাকিস্তানের কাল থেকে; পেরে ওঠেনি।” বাইশে শ্রাবণে তাকে স্মরণ করার সহজতম উপায়টি হলো তারই কোনো একটা গান আরেকবার গেয়ে ওঠা, কারণ তার সুরেই লুকিয়ে আছে বাঙালির চিরকালীন আশ্রয়।
তথ্যসূত্র:
১. দেবব্রত দত্ত; সংগীত-তত্ত্ব (রবীন্দ্র প্রসঙ্গ); সংগীত প্রভাকর (এলাহাবাদ)।
২. প্রভাত কুমার গোস্বামী; ভারতীয় সংগীতের কথা; শ্রীমতি বসুধা গোস্বামী, কলকাতা।
৩. শান্তিদেব ঘোষ; রবীন্দ্রসংগীত বিচিত্রা; বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; জীবনস্মৃতি; বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
৫. শৈলজারঞ্জন মজুমদার; রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গ; আনন্দ পাবলিশার্স।
৬. রানী চন্দ; আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ; বিশ্বভারতী।
৭. হুমায়ুন আজাদ; জলপাই রঙের অন্ধকার; আগামী প্রকাশনী।