স্মরণ
Published : 03 Dec 2025, 01:54 PM
শিশুর মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং তাদের সম্মানের আসনে বসানো, পৃথিবীতে খুব কম মানুষই এই কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছেন। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে রোকনুজ্জামান খান (৯ এপ্রিল ১৯২৫ –৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯), যিনি আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে ‘দাদাভাই’ নামেই বেশি পরিচিত, ছিলেন তেমনই এক নক্ষত্র।
আজ আমরা ফিরে দেখব এই মানুষটির জীবন, কর্ম এবং তার মানবিক দর্শনের গভীরতা। যে কারও কিশোর বয়সের স্মৃতিগুলো মনের মণিকোঠায় গেঁথে থাকে প্রবলভাবে। আমার স্মৃতিতে দাদাভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখার মুহূর্তটি ঠিক তেমনই উজ্জ্বল।
দাদাভাইকে প্রথম দেখি আমার স্কুল কুলিয়ারচর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। কুলিয়ারচর শাপলা কচি-কাঁচার আমন্ত্রণে তিনিসহ বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক এবং চিত্রশিল্পীরা কুলিয়ারচরে এসেছিলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন কুলিয়ারচরের সন্তান, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অভিবাসন আইনজীবী ও সাংবাদিক কাউসার খান। কুলিয়ারচর শাপলা কচি-কাঁচার মেলা এবং কাউসার ভাইয়ের কল্যাণে জীবনে প্রথমবার একসঙ্গে এতগুলো গুণী মানুষের দেখা পাই।
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘এ’ সেকশন থেকে শুরু করে ‘বি’ সেকশন, সপ্তম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি পেরিয়ে গুণী মানুষগুলো নবম শ্রেণির কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানালাম। বিস্ময় চোখে তাকিয়ে রইলাম দাদাভাইয়ের দিকে। এই সেই দাদাভাই! যিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন- “বাক্ বাক্ কুম পায়রা/ মাথায় দিয়ে টায়রা/ বউ সাজবে কাল কি?/ চড়বে সোনার পালকি?” কিংবা “হাসতে নাকি জানে না কেউ/ কে বলেছে ভাই?/ এই শোন না কত হাসির/ খবর বলে যাই।”
এরকম অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ছড়া। যিনি প্রতি বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘কচি-কাঁচার আসর’ বিভাগটি সম্পাদনা করেন। যে পাতাটি পড়ার জন্য পুরো সপ্তাহ জুড়ে অপেক্ষায় থাকি। বুধবার সকাল সকাল কুলিয়ারচর বাজারে অবস্থিত জীবন ডাক্তারের হোমিওপ্যাথি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি পত্রিকা হাতে, কখন হকার আসবে। বাড়ির কাছাকাছি একমাত্র ওই দোকানটিতেই তখন ইত্তেফাক পত্রিকাটি পাওয়া যেত।
এই দাদাভাইকে সামনে থেকে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া। সেদিন শ্রেণিকক্ষে দাদাভাইয়ের সঙ্গে সামান্য আলাপ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। সত্তরোর্ধ্ব বয়সের মানুষটা ঢাকায় ফিরে সেই আলাপের কথা মনে রাখলেন। আমাকে মনে রাখলেন। হস্তাক্ষরে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর আমার জন্য তিনটি বই পাঠালেন। মফস্বল শহরে বসে পাওয়া চমৎকার সব ছবি ও লেখার বই তিনটি তখন অবধি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্যের বই। কাগজে, মুদ্রণে ও বাঁধাইয়ে এত সুন্দর বই এর আগে কখনো আমি দেখিনি।
তারপর একাধিকবার দাদাভাইয়ের সান্নিধ্য লাভ করি। কখনো রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ইত্তেফাক ভবনে। কখনো সেগুনবাগিচায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার অফিস কচি-কাঁচা ভবনে। যখনই সামনে যেতাম হাসিমুখে আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাগত জানাতেন। কখনো পাশের চেয়ারে বসিয়ে আমায় ছড়ায় ছন্দ ও মিলের ব্যবহার শেখাতেন। কখনো সামনের চেয়ারে বসে দাদাভাইকে দেখতাম আর শিখতাম কীভাবে ভালো ব্যবহার করতে হয়। সুন্দর সুন্দর অনেক স্মৃতি আছে দাদাভাইয়ের সঙ্গে আমার। একটি স্মৃতির কথা আজ বলি।
বার, তারিখ, সন কিছুই মনে নেই। সময়টা মনে আছে। সকাল। তখনো স্কুলে পড়ি। কুলিয়ারচর থেকে ঢাকায় বেড়াতে এলে দাদাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা চাই-ই চাই। সেদিন সকালে দেখা করতে দাদাভাইয়ের সেগুনবাগিচার অফিসে যাই। আমাকে দেখেই হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। সামনের চেয়ারটায় বসতে বললেন। কিছু একটা কাজ করছিলেন। সেটি করতে করতেই কুশল বিনিময় করলেন। কুলিয়ারচরের সবাই কেমন আছেন জানতে চাইলেন। ঢাকায় কবে এসেছি, কোথায় আছি, কোথায় কোথায় বেড়ালাম, কী বই পড়ছি এসব বলতে বলতে হাতের কাজটি শেষ করলেন।
তারপর আরও কতো কথা! আমি মুগ্ধ হয়ে দাদাভাইয়ে কথা শুনছি। প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। এরই মধ্যে দাদাভাইয়ের অফিস সহকারী সামনের টেবিলে আলাদা দুটি প্লেটে বিস্কুট, কেক আর দুই গ্লাস পানি রেখে গেলেন। একটি গ্লাস স্টিলের। পুরানো। স্ক্র্যাচ পড়া। দেখে মনে হয় গ্লাসের গায়ে রাজ্যের ময়লা জমে আছে। এই গ্লাসটি আমার সামনে রাখে।
অন্যটি কাচের। চকচকে। পরিষ্কার। এমন পরিষ্কার গ্লাসে জল দেখলে মুহূর্তেই পান করতে ইচ্ছে করে। কাচের গ্লাসটি রাখে দাদাভাইয়ের সামনে। দুটো দু’রকম গ্লাস। কোনটা কার সামনে রাখা তখন অবধি এই বিষয়গুলো নিয়ে কিচ্ছুটি আসেনি আমার মাথায়। ঠিক কী কারণে মনে নেই, আমি মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাই। ফের সামনে তাকিয়ে দেখি স্টিলের গ্লাসটি আমার সামনে নেই। ওটা দাদাভাইয়ের সামনে। আমার সামনে চকচকে, পরিষ্কার কাচের গ্লাসটি।
সেদিন দাদাভাইয়ের নিজের হাতে গ্লাস দু’টির স্থান বদলে দেওয়ার ব্যাপারটা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। আজও অতিথিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর যে দীক্ষা আমার মাঝে বিরাজমান, সেটি আমি দাদাভাইয়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।
আজ তেসরা ডিসেম্বর মহান এই মানুষটির প্রয়াণ দিবস। আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল।