১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন চীনের অচিন পথে, তৃতীয় পর্ব

একটি অপরিচিত শহরকে কীভাবে চিনতে হয়? ভাবতে ভাবতে দুপুরের পর হোটেলরুম থেকে বের হয়ে লিফটে করে নিচে নামছিলাম।

নতুন চীনের অচিন পথে, তৃতীয় পর্ব
চীনের স্ট্রিট-সাইড শপে লেখক।

বাহার লেনিন বাহার লেনিন

Published : 27 Oct 2025, 12:40 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:33 PM

একটা ঢাল বেয়ে উঠছি। পাহাড়ি ঢাল। খাড়া। উপরে রোদ। নিচে তুষার। সাদা শুভ্র তুষারাবৃত পাহাড়ি ঢাল। হিম শীতল। ঠায় দাঁড়িয়ে আছি নিঃসঙ্গ। কোথায় এটা? আশপাশে কেউ নেই। কোনো পাখি নেই। কোনো শ্বেত ভল্লুক নেই। কোনো গুপ্ত নেকড়ে নেই। কোথায় এটা? হাঁপিয়ে উঠি। দ্বিধা জাগে, দাঁড়াবো নাকি এগুবো? সিদ্ধান্তহীন। 

হাতঘড়িতে তাকাই। সময় নেই। অনেক পথ বাকি। উপরে চূড়া। নিচে খাড়া ঢাল। কোথায় এটা? হঠাৎ কে ডাকে, লেনিন! চমকে উঠি। কে! কোথায়? চারদিক দৃষ্টি ফেরাই। ডানে। বামে। সামনে। পেছনে। চোখ আটকে যায় দূরে। শুভ্র আকাশে কীসের একটা বিন্দু! দূরে। কী ওটা? দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করি। চোখের ওপর হাত রেখে রোদ আড়াল করি। ধূসর একটা বিন্দু। সন্ধ্যাতারার মতো তিরতির করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে বড় হচ্ছে। বড় হতে হতে এগিয়ে আসছে। 

হাওয়ার বেগ বাড়ছে। আরো কাছে আসছে। চোখ সরু করি। অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে ধূসর ডানায় পরিণত হয়। পতপত ডানা ঝাপটার শব্দ কানে আসে। চোখে পড়ে লম্বা গ্রীবা। লাল টিকি। সূচ্যগ্র দৃষ্টিতে ডানা দুটি একসময় পাখিতে পরিণত হয়। সারস পাখি। লেনিন, সারসের পিঠ কেউ একজন! কে? দেখা যায় না। চেনা যায় না। ডানা ঝাপটে সারসটা একেবারে মাথার উপরে চলে আসতেই চোখ খুলে দেখি জানালায় রোদ। কাচের শার্সি। অর্ধগুটানো সাদা পর্দা। হোটেল রুম। সকাল।

ওপেনিং সেরিমনি লাঞ্চে বাঁ থেকে লেখকের সঙ্গে এমি।

ওপেনিং সেরিমনি লাঞ্চে বাঁ থেকে লেখকের সঙ্গে এমি।

বিছানায় পড়ে ছিলাম। হঠাৎ পিপ পিপ অ্যালার্ম বাজতেই হাত বাড়িয়ে পাশ টেবিল থেকে মোবাইল টেনে দেখি আটটা দশ। মনে পড়ে, আজ সেমিনারের উদ্বোধনী দিন। কাল চীনা ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রধান এমি বলে দিয়েছিল, অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল দশটায়। কিন্তু যেতে হবে একটু আগে। পৌনে দশটায়। তার আগে ব্রেকফাস্ট। ডাইনিং খুলবে আটটায়। আমাদের দলনেতা মুকুল স্যারও (শাহ আলম মুকুল, বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব) আমাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, নো লেট। 

চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসি। ঘরভর্তি আলো। বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে বাম পাশ থেকে সাট করে পুরো পর্দা টেনে দিতেই রুদ্রোজ্জল উরুমচি। আহ! কি অপরূপ। স্নিগ্ধ উরুমচি! সুউচ্চ ভবনগুলোর গায়ে গায়ে সকালের ঝলমলে রোদ। পেছনে তিয়ানশান পর্বত। শুভ্র। সাদা। গতকাল বিকেলেও… হঠাৎ মনে খোঁচা লাগে। এই শেষ রাতে কি একটা স্বপ্ন দেখছিলাম না! হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল না? পাহাড়! পাখি! শুভ্র! আহা, নিজ মনেই হেসে ফেলি। স্বপ্ন বড় অদ্ভুত! যার উৎপত্তি ও লয় অননুমেয়। 

সেজেগুঁজে ব্রেকফাস্ট সেরে পৌনে দশটার মধ্যেই আমরা সবাই অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে যাই। ভেন্যু ছিল মূল ভবনে। দ্বিতীয় তলায়। বড় কক্ষ। সাজানো গোছানো। ছিমছাম। সামনের দিকে এন্ট্রি। উল্টোদিকে ডায়াস। ডায়াসে তেলতেলে বাদামি রঙের টাইলস। তার পেছনে ইলেকট্রনিক স্ক্রিন। স্ক্রিনে ডিজিটাল ব্যাপার। ব্যানারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও চীনের রাষ্ট্রপতি সি চিন পিং-এর করমর্দের ছবি। দুপাশে স্ট্যান্ডে ঝোলানো বাংলাদেশ-চীনের দুটি করে পতাকা। সামনে আমরা। 

সহকর্মীদের সঙ্গে লেখক।

সহকর্মীদের সঙ্গে লেখক।

যথা সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। চীনারা কাজে বেশ নিখুঁত। গোছালো। যাই করে পরিকল্পনা নিয়ে করে। চর্চা করে। যেমন আজকের অনুষ্ঠান। গতকাল বিকেলেই ওরা এর সম্পর্কে যাবতীয় ব্রিফ করে দিয়েছিল। পইপই করে বুঝিয়ে দিয়েছিল আমাদের করণীয় নিয়ে। আমরাও সেটা সাধ্যানুযায়ী অনুসরণ করে চলছিলাম। যেমন আমাদের নিজ নিজ নেমপ্লেট-সম্বলিত টেবিলগুলোতে যথাযথ আসন গ্রহণ করেছিলাম। আমার সামনে, পেছনে, পাশে যথাক্রমে সহকর্মী মো. আসাদুল ইসলাম, মো. হাসান আলী ও আহমেদ ইকবাল।

স্মিতহাস্যের এক নারী অনুষ্ঠান শুরু করলেন। সম্ভাষণ জানালেন। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হলেন এন্টারপ্রেটর। তিনি রোবটের মতো সেটা ইংরেজি করে দিলেন। একে একে সবার নাম উচ্চারিত হলো। আমরা নাম অনুযায়ী উঠে সামান্য মাথা নুয়ে মুচকি হাসলাম। পরিচয় পর্ব শেষ হলো। তারপর প্রথমে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চমৎকার একটি প্রেজেন্টেশন দিলেন আমাদের দলনেতা মুকুল স্যার। তারপর দিল চীনারা। সম্মানিত অতিথিদের স্বাগত বক্তব্যে আমরা সিক্ত হলাম। কেতাদুরস্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান! দুপুর ১২টার দিকে আমাদের লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠানের পর্দা পড়লো।  

হোটেলের নিচতলায় ছিল ডাইনিং রুম। ঢুকে দেখি পরিপাটি সাজানো গোছানো বড়সড় এক মেজবান খানা। গোল গোল টেবিল। ৭-৮ জন করে বসার ব্যবস্থা। টেবিলের পাটাতনের উপর অপেক্ষাকৃত ছোট আর একটি গোল ঘূর্ণায়মান পাটাতন। আমরা সবগুলো টেবিল দখল করে বসি। আমি বসেছিলাম কোনার দিকের একটি টেবিলে। সেখানে উড়ে এসে পড়ল এমি। বেচারি সবদিক সামলাতে গিয়ে শেষমেষ কোথাও জায়গা পায়নি। খাবার আসছে না। দু’হাত ঘষে শান দিতে থাকি। চোখ ঘুরিয়ে দেখি দেয়ালে দেয়ালে বাহারি চিত্র। চীনা ফুল। পাহাড়। নদী। নাক উঁচু লাল বাড়ি। সুন্দর। খুব সুন্দর। চীনাদের সৌন্দর্যবোধ খাপে খাপ। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। 

হোটেল থেকে বের হয়ে সিটি সেন্টারের পথে।

হোটেল থেকে বের হয়ে সিটি সেন্টারের পথে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে গরম ভাপ উঠা খাবার আসা শুরু করল। ঘূর্ণায়মান টেবিলের পাটাতন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই খাবার আমরা পাতে তুলে নিতে থাকলাম। কিন্তু এমির খুব সম্ভ্রম। কাঠি দিয়ে খোঁচা দেয় তো দেয় না। কিছু পাতে নেয় তো নেয় না। এদিকে আমাদের সময় নেই। ফুল স্পিডে খেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু চীনারা ব্যতিক্রম। ওরা খাবার খায় ধীরে ধীরে। গল্প করতে করতে। নিচু স্বরে। সম্পর্ক গড়তে গড়তে। 

একটি অপরিচিত শহরকে কীভাবে চিনতে হয়? কীভাবে জানতে হয়? কীভাবে বুঝতে হয়? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দুপুরের পর হোটেলরুম থেকে বের হয়ে লিফটে করে ১০-৯-৮-৭.. ধারায় নিচে নামছিলাম। নিচে অপেক্ষা করছিলেন সহকর্মী মো. আসাদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার সিনিয়র অফিসার। সঙ্গে ছিলেন অপর দুই সহকর্মী মো. জিল্লুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম। ক্রিং শব্দে লিফট মাটি ছুঁলে বাইরে বের হতেই আসাদের ফোন, ভাই আমরা গেইটের দিকে আছি। আপনি চলে আসেন। ওকে আসছি, বলে আমি দ্রুত পা চালাই।

উরুমচির যে হোটেলে আমরা ছিলাম তার নাম ছিল ‘উরুমচি এডুকেশনাল অ্যান্ড ট্রেনিং বেইস অব দ্য জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস’। ট্রেনিং কাম হোটেল কমপ্লেক্স। মোট ৪টি ভবন। ৩টি ১১ তলা আবাসিক ভবন আর একটি ৩ তলা অফিস ভবন। আমরা থাকতাম ‘ডি’ নম্বার ভবনটায়। সেটা ছিল কমপ্লেক্সের উত্তর-পূর্ব দিকে। সেখান থেকে বেরোবার পথে ছিল ছোট্ট একটি বাগান, পার্কের মতো সাজানো। বাঁধানো চত্বর। ছোট ছোট পাতার গাছ। স্বল্প উচ্চতার। বিক্ষিপ্ত কিছু লোহার হেলান বেঞ্চ। মাঝ দিয়ে সরু পথ। এক কোনায় আপেল গাছ। 

দুপুরে একটা ঘটনা ঘটেছিল। লাঞ্চ শেষে আমি আর কামরুল হাসান রুমে ফিরছিলাম। তখন হঠাৎ কামরুল দাঁড়িয়ে পড়লো- ভাই, আপেল গাছ না! পরখ করে বলি, হ্যাঁ! আপেলই তো! ওই যে ছোট ছোট আপেল ধরেছে। কামরুল সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে টপ করে দুটি আপেল ছিঁড়ে নেয়। আরে কী করছেন, গাছের গায়ে সাইনবোর্ড বাঁধা। ওফ! খেয়াল করি নাই। কী লিখছে দেখেন তো ভাই?

সহকর্মীদের সঙ্গে লেখক।

সহকর্মীদের সঙ্গে লেখক।

কামরুলের কথায় দ্রুত পকেট থেকে মোবাইল বের করে ‘বাইদো অ্যাপ’ দিয়ে লেখাটা স্ক্যান করে পড়ে দেখি ‘ইট ইজ ফরবিডেন টু প্লাক ফ্রুট ফ্রম ট্রিজ’। কামরুল বেদনায় নীল হলো! কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি! কী আর করা! ছিন্ন আপেল কি পুনরায় বোঁটায় গাঁথা যায়? অগত্যা কচি আপেল দন্তপৃষ্ঠে চর্বণে প্রয়াণ।

হায়! নিজ মনে হেসে হেসে রাস্তা ধরে এগুনোর পথে কে একজন হঠাৎ পাশ থেকে ডাকলো। থেমে দেখি এমি। রাস্তার পাশে পার্কিং করা গাড়িতে উঠছিল। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছো? আমি উত্তর দিলাম, এই বাইরে। ঘুরতে।

কোথায়?

সিটিতে।

ওহ। চলো আমি নামিয়ে দিই।

বুঝলাম চীনারা কতটা সহজ আর পরোপকারী। অপরিচিত ভিনদেশি এক পুরুষকে কীভাবে নিজ গাড়িতে এগিয়ে দিতে চাচ্ছে। আমি বিনয় করে বললাম, ধন্যবাদ। আমার দুইজন সহকর্মী গেইটে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

ও আচ্ছা। ঠিক আছে, তুমি যাও।

এমি তার গাড়িতে ঢুকে পড়লে আমি বাঁ পাশে ঘুরে মেইন বিল্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে শর্টকাটে বেড়িয়ে সামনের গেইটের কাছে চলে আসি। আমাকে দেখে আসাদ এগিয়ে এসে বলে, ভাই দেরি করলেন!

হঠাৎ এমি ডাকলো। ওর গাড়িতে উঠতে বলছিল। 

এ কথা শুনে পেছন থেকে রফিক এগিয়ে এলো, উঠলেন না কেন ভাই? এখন কই এমি?

ও এদিক দিয়েই বের হবে। তোমরা চাইলে ওকে বলতে পারি আমাদের লিভ দিতে পারে। 

তখনই দেখলাম এমি গাড়ি নিয়ে হোটেল গেইটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা পাশ থেকে হাত তুললে এমি থেমে যায়। কাছে গিয়ে আমাদের লিভের কথা বললে সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, উঠে পড়ো। কোথায় যাবে তোমরা?

ইন্টারন্যাশনাল গ্র্যান্ড বাজার।

ওকে, কাছাকাছি কোনো মেট্রো স্টেশনে তোমাদের নামিয়ে দেবো। সেখানে থেকে মেট্রো ধরে সহজেই তোমরা গ্র্যান্ড বাজারে চলে যেতে পারবে।

এমির এ কথায় আমরা দ্রুত গাড়িতে চড়ে বসলাম। সাদা শার্ট, কালো স্কার্ট পরিহিত হালকা পাতলা পরোপকারী নারীটি অ্যাক্সেলেটর চেপে হোটেল থেকে বের হয়ে ডান দিকে ঘুরে সামনের বড় ইন্টারসেকশন পাড় হয়ে ভোঁ ভোঁ সিটি সেন্টারের দিকে ছুটলো.. .

চলবে…