১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্রায়ান লারার চোখে তার সেরা ১০ মুহূর্ত

ত্রিনিদাদের সেই রাজপুত্র, যিনি ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে ছবি আঁকতেন।

ব্রায়ান লারার চোখে তার সেরা ১০ মুহূর্ত
ছবি: আইসিসি

বিডিনিউজ২৪

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Jun 2025, 03:33 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:16 PM

ব্রায়ান লারা। ত্রিনিদাদের সেই রাজপুত্র, যিনি ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে ছবি আঁকতেন। গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হেইন্স আর ভিভ রিচার্ডসদের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং যেন পুরোপুরি তার কাঁধেই উঠে এসেছিল। শচীন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং আর জ্যাক ক্যালিসদের পাশে তিনিও ছিলেন ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল তারকা। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের প্রায় একক প্রতিভূ হয়ে ছিলেন তিনি।

১৭ বছরের ক্যারিয়ারে করেছেন ২২ হাজারের বেশি রান। একসময় টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও ছিলেন। কিন্তু যেসব ইনিংস তাকে কিংবদন্তি করে তুলেছে, সেগুলোর মধ্যে তিনটি সবচেয়ে বড়— ৩৭৫, অপরাজিত ৫০১ আর অপরাজিত ৪০০। চলুন শুনি, এই অসাধারণ গল্পগুলো তার নিজের মুখে—

১. সোবার্সের সঙ্গে প্রথম দেখা

স্যার গ্যারি সোবার্স স্কুল টুর্নামেন্ট, বার্বাডোজ | ১৯৮৬

আমি তখন ফাতিমা কলেজের হয়ে খেলি। দলে ভালো ক্রিকেটার ছিল, তাই ব্যাট করতে নামতাম সাত বা আট নম্বরে। এক শুক্রবার প্রতিপক্ষের বোলার হ্যাটট্রিক করায় আমি আগেভাগেই ব্যাটিংয়ে নেমে পড়ি। তখন বয়স ১৪, খেলছি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে। সেদিন সেঞ্চুরি করার পরই বুঝেছিলাম, এই খেলাটায় আমি কিছু একটা করতে পারি।

এর কয়েক বছর পর, বার্বাডোজে স্যার গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে প্রথম দেখা। তিনি আমার খেলা পছন্দ করেছিলেন। এত বড় একজন মানুষ যখন উৎসাহ দেন, তখনই মনে হয়েছিল— এটাই আমার পথ।

২. হঠাৎ অভিষেক

ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম পাকিস্তান | তৃতীয় টেস্ট, লাহোর | ১৯৯০

এই ম্যাচে আমি দলে ছিলাম না। কিন্তু কার্লাইল বেস্ট প্র্যাকটিসে স্লিপে দাঁড়িয়ে হাতের চোটে ছিটকে যান। তার জায়গায় আমার ডাক পড়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে খেলতে নেমে দেখি সামনে ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুস! ভয়, রোমাঞ্চ আর কৌতূহল সব একসঙ্গে।

৪৪ রান করেছিলাম। ছোট অবদান হলেও আমার কাছে খুব বড় ছিল। কারণ এটাই ছিল টেস্ট ক্রিকেটে আমার প্রথম পদার্পণ।

৩. সিডনির মহাকাব্য

২৭৭ রান | ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম অস্ট্রেলিয়া | তৃতীয় টেস্ট, সিডনি | ১৯৯৩

সিরিজে আমরা পিছিয়ে ছিলাম। সিডনি এমন একটা মাঠ, যেখানে অতীতে আমাদের ভালো ফল হয়নি। সেখানে আমি খেললাম ২৭৭ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস। টি ব্রেকের সময় আমি ছিলাম ১২০ রানে। তখন কোচ রোহন কানহাই বললেন, “জমে গিয়ে খেলে যাও। ইনিংসটা যতটা সম্ভব লম্বা করো।” সেদিনই বুঝেছিলাম, শতরান কোনো গন্তব্য নয়, সেটা তো কেবল শুরু। এই ইনিংসটিই আমার ভবিষ্যতের টেমপ্লেট হয়ে যায়। এই ইনিংস এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আমার মেয়ের নাম রেখেছি ‘সিডনি’।

৪. ৩৭৫: ইতিহাস গড়া দিন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড | অ্যান্টিগা | ১৯৯৪

আগের টেস্টে ইংল্যান্ড আমাদের হারিয়েছিল। সিরিজ আগেই জিতে নিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ ম্যাচে চেয়েছিলাম জাঁকজমকপূর্ণ এক সমাপ্তি। ব্যাট করতে নেমে লক্ষ্য ছিল কেবল ক্রিজে টিকে থাকা, যতক্ষণ না অধিনায়ক ইনিংস ঘোষণা করেন। তখনো জানতাম না, আমি ইতিহাসের দিকে হাঁটছি। শেষে যখন ৩৭৫ রানে পৌঁছলাম, সামনে গ্যালারিতে বসে আছেন স্যার গ্যারি সোবার্স, নিজের রেকর্ড হারিয়ে খুশিতে চোখে জল। এই দিনটা, এই ইনিংসটা, আমার জীবনের মোড় ঘোরানো এক অধ্যায়।

৫. অপরাজিত ৫০১: চিরকালীন রেকর্ড

ওয়ারউইকশায়ার বনাম ডারহাম | কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ, এজবাস্টন | ১৯৯৪

ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলাম, মনে মনে ভাবছিলাম, এবার হয়তো রান আসবে না। কারণ প্রথম দিকের অনুশীলনে ছোটখাটো মিডিয়াম পেসারদের সামলাতেই কষ্ট হচ্ছিল। তবু প্রথম সাত ইনিংসে ছয়টি সেঞ্চুরি করে চমকে দিই। এই ম্যাচে ১০ রানে একবার বোল্ড হয়েছিলাম, নো বল বাঁচিয়েছে। এরপর ১৪ রানে কিপার ক্যাচ ফেলে দেন। তখন আম্পায়ারকে বলেছিলাম, “আমি ক্লান্ত, মনে হয় রান ফুরিয়ে এসেছে।” কিন্তু দেড় দিন পর যখন স্কোরবোর্ডে লেখা হলো অপরাজিত ৫০১ রান, তখন বুঝলাম আমি অমরত্ব ছুঁয়ে ফেলেছি।

৬. ওভালে সিরিজ রক্ষা

১৭৯ রান | ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড | ষষ্ঠ টেস্ট, দ্য ওভাল | ১৯৯৫

কঠিন এক সিরিজ চলছিল। আমরা ২-২ সমতায় এসেছিলাম, আর ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতে সিরিজ নিতে মরিয়া। আমি খেলেছিলাম গুরুত্বপূর্ণ এক ইনিংস, কার্ল হুপারের সঙ্গে বড় জুটি গড়ে ইংল্যান্ডকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিই। যদিও জয় আসেনি, তবু ওই ইনিংস ওয়েস্ট ইন্ডিজকে রক্ষা করেছিল। আমার ইচ্ছা ছিল এই রান যেন জয় এনে দেয়। কারণ, ইংল্যান্ডকে হারানোই তো ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বাভাবিক নিয়ম!

৭. একার লড়াই

৬৮৮ রান গড়ে ১১৪.৬৬ | ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম শ্রীলঙ্কা | ২০০১

এই সফর ছিল চরম হতাশার। তিন টেস্টেই হেরেছিলাম। তবুও আমি নিজে করেছিলাম ৬৮৮ রান, যার মধ্যে ছিল একটি সেঞ্চুরি ও একটি ডাবল সেঞ্চুরি এক ম্যাচেই! তিন ম্যাচ হেরে যাওয়া দলের একজন খেলোয়াড়কে সিরিজ সেরা নির্বাচন করা, এটাই বলে দেয় আমি কী লড়াই করেছিলাম। এমন এক ইনিংস ছিল, যেখানে আমি খেলেও জিতিনি। তবে হেরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

৮. অপরাজিত ৪০০: রেকর্ড পুনরুদ্ধার

ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড | অ্যান্টিগা | ২০০৪

দশ বছর আগে যখন ৩৭৫ করেছিলাম, তখন সিরিজে এগিয়ে ছিলাম। এবার ৩-০ তে পিছিয়ে। আমার ভাবনা ছিল, এই ম্যাচটা হারা যাবে না। ক্যাপ্টেন হিসেবে চেয়েছিলাম একজন বড় ইনিংস খেলুক। আর সেই মানুষটাই হলাম আমি। ইংল্যান্ড দলে তখনও ছিল নাসের হুসেইন, গ্রাহাম থর্প, যারা ৩৭৫-র সাক্ষী ছিল। এবার আবার তারা দেখল অপরাজিত ৪০০! ওদের মুখে তখন খুশির চিহ্ন ছিল না।

৯. চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জয়ের আনন্দ

১৪ রান | ফাইনাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড | দ্য ওভাল | ২০০৪

সেই সময় ইংল্যান্ডের কাছে আমরা টানা সাতটা টেস্ট হেরেছি। সবাই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তখনই গেলাম বারমুডায়, একটু রিফ্রেশ হতে। ফিরে এলাম নতুন উদ্যম নিয়ে, খেললাম চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। দলের মধ্যে তখনো বিভক্তি। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি, কিন্তু তবু একসঙ্গে খেলতে শিখলাম। আর শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ট্রফি জিতলাম। একজন অধিনায়ক হিসেবে এটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

১০. আমার প্রিয়তম ইনিংস

২১৩ রান | ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম অস্ট্রেলিয়া | দ্বিতীয় টেস্ট, জ্যামাইকা | ১৯৯৯

বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন, বার্বাডোজে আমার অপরাজিত ১৫৩ ইনিংসটাই সেরা। কিন্তু আমার কাছে, জ্যামাইকায় করা ২১৩ রান সবচেয়ে বেশি গর্বের। তখন সদ্য দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৫-০ ব্যবধানে হারার পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টও হেরেছি। আমার ওপর অধিনায়ক হিসেবে চাপ, দলের ওপর ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বাস। এই ইনিংসে আমি নিজেকে চেনাতে পেরেছিলাম, আমি শুধু স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান নই, সংকটে পড়ে নেতৃত্ব দিতেও পারি।

মূল সাক্ষাৎকার: জো হারম্যান, সূত্র: উইজডেন ডটকম