'অনেক দূর চলে আসার পর খেয়াল করি আমি সেখানকার কিছু চিনতে পারছি না।'
Published : 01 Apr 2025, 09:02 PM
তখন আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি, ২০১৬ সালের কথা। ঈদ উদযাপন করতে আমরা এসেছি গ্রামের বাড়িতে।
আমার জন্মদিন এবং রোজার ঈদ একইদিনে পড়েছিল বলে বাড়িতে অনেক আয়োজন করা হয়। তাই আনন্দের মাত্রাটাও ছিল বেশ ভিন্ন।
সকালে বড় আপুসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে একত্রে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে যাবে এমন আরেকজনকে নিয়ে আসার জন্য তাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম।
সেই পথটা ছিল কর্দমাক্ত, যা আমি খুবই অপছন্দ করতাম। কিন্তু, আমার কথায় কেউ কর্ণপাত না করে কাদা মাড়িয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল। তাই খুব রাগ হয় আমার।
ছোট ছিলাম, বেশি কিছু বুঝতাম না। তাই জেদ করে কিছু না ভেবেই পেছনে আমাদের বাড়ির দিকে দৌড় দেই। সবাই আমাকে ধরার জন্য আসতে থাকে, কিন্তু ওই বাড়ি থেকে বের হতে হতে তারা আমাকে আর ধরতে পারে না। আর এদিকে আমি দৌড়াতেই থাকি।
অনেক দূর চলে আসার পর খেয়াল করি আমি সেখানকার কিছু চিনতে পারছি না। অর্থাৎ, আমি বাড়ির পথে না গিয়ে অন্য কোথাও চলে এসেছি। তখন আমার মনে পড়ে গেল, মায়ের কথা। মা বলতেন, ছোটরা একা একা কোথাও গেলে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যায়। কথাটা মনে পড়া মাত্রই ভয় কাজ করছিল।
এরপর রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এখন কী করা যায়। তবে আমি যে হারিয়ে গিয়েছি, সেটা কাউকে বললে সে এটার সুযোগ নিতে পারে। আর ছোট থেকেই কান্নাকাটি করার অভ্যাস নেই আমার।
এখন হাস্যকর মনে হলেও তখন মনে মনে ভাবছিলাম, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা হাফেজের মত দেখতে কাউকে বলে তার ফোন থেকে বাবাকে ফোন করতে হবে। কারণ, আমার মনে গৎবাঁধা ধারণা ছিল, হাফেজরা যেহেতু নিজেদের ধর্মকে অনেক সম্মান করে, তাই তারা কখনও ছেলেধরা হতে পারে না।
ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আসলেই এরকম একজনকে দেখতে পেলাম, যার কাছে ফোন ছিল এবং দেখে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল। আর অনেক ছোট থেকেই যেহেতু বাবার নম্বর মুখস্ত ছিল, তাই ওই ভাইয়াটাকে আমি বলি যে, একটি প্রয়োজনে আমার বাবাকে ফোন করতে চাই। বলার পর তিনি আমাকে ফোনটাও দেন।
ওই দিকে ততক্ষণে আমাদের বাড়িতে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছে। বড় আপুরাও গিয়ে সবাইকে সব বলে দিয়েছে। বাড়ি থেকে বাবা, চাচারা আরও মানুষদের জানিয়ে আমাকে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে।
ওই ভাইয়ার কাছ থেকে ফোন নিয়ে বাবাকে কল করে সব জানানোর পর বাবা দ্রুত আমার পাশে থাকা একজন লোকের কাছ থেকে ঠিকানা শুনে সেখানে মানুষ পাঠিয়ে দেন। তারপর তাদের সঙ্গে আমি বাড়ি পৌঁছাই।
বাড়িতে গিয়ে দেখি মা প্রচুর কাঁদছেন। আমাকে পেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। আমিও নিজের ভুল বুঝতে পারি। রাগ দেখিয়ে একা একা চলে যাওয়ার কারণে আপুদের কাছে আমি ক্ষমা চাই।
একদিকে ঈদ, অন্যদিকে আমার জন্মদিন, আবার গেছি হারিয়ে। এটাকে রোমাঞ্চকর ঈদ না বলে উপায় নেই। এই ঘটনা মাঝেমধ্যেই আমার মনে পড়ে।
প্রতিবেদকের বয়স: ১৩। জেলা: ঢাকা।