০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সংস্কৃতি সম্প্রীতি তৈরি করে, মানুষকে শুদ্ধ করে: ‘আড্ডানামায়’ শামীম আজাদ

"আমার মনে হয়েছে যে দেশ ছাড়লে কেউ তোমাকে কোনো দায়িত্ব দেয় না। কিন্তু তুমি একটা দেশের দূত, এই দায়িত্বটা তোমার ঘাড়ে চলেই আসে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Oct 2026, 09:51 PM

Updated : 01 Oct 2026, 09:53 PM

সংস্কৃতি মানুষকে ‘বড়’ করে, মানুষে-মানুষে ‘সম্প্রীতি’ জাগায় এবং ‘শুদ্ধ’ করে; তাই সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প দেখেন না কবি শামীম আজাদ।

সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বাস করেন লন্ডনে। তাকে বলা হয় দ্বিভাষিক কবি। অর্থাৎ বাংলা ও ইংরেজি দুভাষায় কবিতা লিখে চলেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি গল্পকার, সংগঠক ও গল্পকথকও।

গল্প লেখা শুরু করেছিলেন স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে, আর কবি হওয়ার তীব্র ইচ্ছায় আশির দশক থেকে কলম ধরে ভিড়ে যান কবি রফিক আজাদ, বেলাল আহমেদদের দলে। দেশ ছাড়ার আগে শিক্ষকতা করেছেন সানবিমস স্কুল, হলিক্রস, তিতুমীর ও ঢাকা কলেজে। বিলেতে পাড়ি জমান শিক্ষকতার চাকরি নিয়েই।

সেখানেই এক সময় ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেন। তবে সাহিত্যের মূল শক্তি তিনি পেয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে। দেশে থাকতে সাংবাদিকতা করেছেন সাপ্তাহিক বিচিত্রায়, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বানিয়েছেন বিটিভির জন্য।

গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ 'আড্ডানামার’ নবম পর্বে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শামীম আজাদ। সেখানে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে কথা বলেছেন এই কবি।

আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।

আগের আট পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, আফজাল হোসেন, চঞ্চল চৌধুরী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।

‘মানুষের জন্মস্থান দুটো’

কবি শামীম আজাদের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটে; জন্মেছেন ময়মনসিংহে। বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব-কৈশোর কেটেছে জামালপুরে। বাবা আবু আহমদ মাহমুদ তরফদার এবং মা আনোয়ারা তরফদার।

শামীম আজাদ মনে করেন, মানুষ যেখানে জন্মায় এবং যেখানে বড় হয়, দুটো মিলিয়ে তার জন্মস্থান দুটো।

“একটি হচ্ছে তার জৈবিক জন্মস্থান, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার মনের জন্মস্থান। তো সেই হিসেবে আমি মনে করি জামালপুর আমার দ্বিতীয় জন্মভূমি।”

শিল্প সংস্কৃতির প্রতি শামীম আজাদের অনুরাগের শেকড় তার পরিবার। রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তার বাবা-মায়ের থাকত সক্রিয় অংশগ্রহণ।

তিনি বলেন, “মায়ের শাড়িগুলো দিয়ে উইংস হত স্টেজে, আব্বা উপস্থাপনা করছেন, সেই তো শুরু। সেখানে রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী হয়, নাটক হয়। বাবা কিছু কিছু নির্দেশনা দিতেন, সরকারি চাকুরে হলেও এটা তার শখ ছিল।”

নিজেকে নিয়ে শামীম আজাদের কথা হল, স্কুল জীবনেই তিনি হয়ে গিয়েছিলেন ‘বিরাট মাতব্বর’।

“যখন আমি এসএসসি দেব, তার আগে স্কুলের জিএস হয়ে গেলাম। মহামাতব্বরী একটা ভাব চলে এল, ডিবেট করি, নাচি, কবিতা আবৃত্তি করি। একুশে ফেব্রুয়ারি আসতেই দিলাম ঘণ্টা বাজিয়ে, স্কুলকে ছুটি করে দলবল নিয়ে গিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ফিরলাম।”

তবে তার এমন জীবনীশক্তি বাবার দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শামীম আজাদ বলেন, “আব্বা আম্মাকে ডেকে বললেন, আনোয়ারা এই মেয়েটাকে তো এখন গ্রেপ্তার করতে হবে। কিন্তু ওর এত এনার্জি, এমন একটা জায়গায় দিতে হবে, তার সেই এনার্জিটা, তার শক্তিটা, তার সাহসটা, যাতে অন্য একটা কোথাও না কোথাও তার যেতে হবে, উল্টোপাল্টা পথে না হাঁটে। তো সেটা হল সংস্কৃতি।”

শামীম আজাদের কথায়, সংস্কৃতি মানুষকে বড় করে, সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির জাগায়, সংস্কৃতি মানুষকে শুদ্ধ করে।

স্কুলের পর তাকে ভর্তি করা হয় টাঙ্গাইলে শহীদ রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠা করা কুমুদিনী সরকারি কলেজে।

‘পেলাম প্রবল স্বাধীনতা, শুরু হল প্রেমের গল্প লেখা’

কলেজে পা রাখার পর শামীম আজাদ মনে করলেন এবার তিনি বড়দের গল্প লেখা শুরু করবেন। কারণ মাথার ওপর বাড়ির শাসন নেই, হঠাৎ করে জীবনে ধরা দেয় প্রবল স্বাধীনতা।

ওই সময়ে প্রেমের গল্প লেখার ইচ্ছা জাগে তার মনে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। গল্প লিখে পাঠিয়ে দিলেন 'বেগম' পত্রিকার ঠিকানা।

শামীম আজাদ বলেন, “আমার গল্পের নাম হল এক পশলা বৃষ্টি। লেখা উঠল বেগম পত্রিকায়, হাশেম ভাইয়ের (চিত্রশিল্পী হাশেম খান) ইলাস্ট্রেশন। আমি তো মহা ফুর্তিতে, হাশেম খান আমার ইলাস্ট্রেশন করেছে!"

প্রেমের গল্প নিয়ে বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা নিয়ে ভয় পাচ্ছিলেন শামীম আজাদ। তবে সব শঙ্কা কেটে যায় ছুটিতে বাড়ি ফেরার পর।

"আমরা তো সিলেটি। আব্বা মানে দেখলাম খুব গর্বিত হয়ে এই পত্রিকাটা হাতে নিয়ে তার বন্ধুদেরকে চা খাওয়াচ্ছেন আর বলছেন, “’তাইন অহন বড় অই গেছে, বড়তার গল্প লেখে'। তো আমি ভাবলাম যে যাক এটা গেল।”

এর পরের জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাবা চাইলেন মেয়ে পড়ুক ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে, কিন্তু মেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, পড়বেন বাংলা নিয়ে। এ নিয়ে বাড়িতে মহা হুলস্থুল।

"এই নিয়ে বাপ বেটিতে ঝগড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই ভর্তি হয়ে যাচ্ছে, শেষে আম্মা রেফারির কাজ করলেন। বললেন, একটা সমাধান করো। তখন আব্বা বললেন, শামীম, তুই ইংলিশ লইলা সাবসিডিয়ারি, তোরে পড়তে দিমু। তাই হল।”

বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ার জন্য জেদ কেন ধরেছিলেন জানতে চাইলে শামীম আজাদ বলেন, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশার শিক্ষার্থী হবেন বলে স্বপ্ন লালন করতেন আরও অনেক আগে থেকে।

‘কত বড় চাপানো যুদ্ধ আমাদের!’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় শামীম আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে সোবহানবাগ কলোনিতে। রণাঙ্গনে গিয়ে অস্ত্র ধরার সুযোগ না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন এই কবি।

"আমার বন্ধুরা তো সব মুক্তিযোদ্ধা। তারা আসত লুকিয়ে, সহযোদ্ধাদের পাঠাতো ওদের রসদ লুকিয়ে রাখতাম।”

এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার তাদের বাড়িতে আসার গল্প তুলে ধরেন শামীম আজাদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক খুঁজেও যার দেখা আর পাননি শামীম আজাদ। সেই হাহাকারা আজও বুকে বাজে তার।

তিনি বলেন, "একদিনের ঘটনা সেটা একটু বলি। সবাই ঘুমিয়ে গেছেন রাতে। আমার বন্ধুরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছেন, তারা হঠাৎ শহরে এসে থাকার জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজত। তো টুকটুক টুকটুক দরজায় শব্দ হল। দরকার কড়ার জায়গায় ছিদ্র দিয়ে বাইরে দেখি কি, চেক চেক জামা পরা কেউ একজন।

“আস্তে করে ছেলেটি বলে, শামীম আপা দরজা খোলেন। খুলতেই ঝুপ করে এসে ঢুকল। ওর নাম হচ্ছে আব্দুর রহিম বুলবুল। হতবাক হয়ে গেলাম, এত ছোট ছেলে, একটা কিশোর ছেলে, সে মুক্তিযুদ্ধে! বলল আপা আমি কয়দিন আসবো। আমি ভাত বেড়ে দিলাম, খেলো। খেয়ে মুখটা মুছে বলে কি, আপা মজা হইছে।

“তারপর বুলবুল খেয়ে তো বেরিয়ে গেল দরজাটা খুলে, আম্মারা ঘুমে। আমি ওই পেছনের ওই রান্নাঘরে জানালা দিয়ে এরকম করে তাকিয়ে দেখলাম, মনে হল আহারে, কোথায় তার মা? ওর কি কোনো বোন আছে? এই ছেলেটিও এত একটা কিশোর ছেলে জীবন দিয়ে দিচ্ছে! কত বড় চাপানো যুদ্ধ আমাদের।”

পরিচিতি হয়ে গেল ‘বিচিত্রার শামীম আজাদ’

যুদ্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে শিক্ষকতা শুরু করেন শামীম আজাদ। শুরু সানবিমস স্কুল ও হলিক্রস কলেজে।

এরপর বিসিএস পরীক্ষায় বসেন। নির্বাচিত হয়ে যোগ দেন টাঙ্গাইল মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে। তারপর ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং ঢাকা কলেজেও পড়িয়েছেন।

পাশাপাশি কাজ করেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনেও।

শামীম আজাদ বলেন, “বিটিভিতে আমিই প্রথম নারী যে ধারাবাহিক ম্যাগাজিন 'জীবন যেমন' অনুষ্ঠান করতাম। নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখতাম, সম্পাদনাও করেছি। বিটিভিতে প্রথমবার ক্যাটওয়াক নিয়ে এলাম। দেশি পোশাক, দেশি শাড়ি, দেশি পোশাক নিয়ে। কারণ বিচিত্রায় ততদিনে লাইফস্টাইল লিখতে শুরু করেছি।”

বিচিত্রায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনো উচ্ছ্বসিত শামীম আজাদ। তিনি বলেন, "আমার জীবনের যে স্পার্কগুলো, বিচিত্রা হচ্ছে অন্যতম। কত মানুষ খালি বলে এখন আপনি বিচিত্রার শামীম আজাদ না? আমার পরিচিতি হয়ে গেল বিচিত্রার শামীম আজাদ।”

‘ছিলাম গল্পকার, কিন্তু খুব ইচ্ছা কবি হব’

শামীম আজাদ বলেন, তিনি ছিলেন গল্পকার, ললনা পত্রিকায়, ইত্তেফাক, চিত্রালীতে তার লেখা ছাপা হত। অথচ তীব্রভাবে চাইতেন কবি হতে।

কিন্তু তার উপলব্ধি হয়েছিল, “তুমি চাইলেই তো কবি হতে পারো না। এটা হয়ে যায়।”

কবি রফিক আজাদের উৎসাহে শামীম আজাদের কবিতা লেখা শুরু।

“আমার গুরু রফিক আজাদ একদিন ডাকলেন, বাংলা একাডেমিতে তার একটা অফিস ছিল। ডেকে বললেন, ‘শামীম শোনো, আমাদের আসলে কবিতায় কিছু মেয়েদের আসা উচিত, মেয়ে কম। আর তোমার গদ্য খুব লিরিক্যাল। এবার তুমি কবিতা লেখো।’”

১৯৮৩ সালের একুশে বইমেলায় শামীম আজাদের কবিতার বই প্রকাশিত হয়।

“যুগলবন্দী প্রকাশনা থেকে বের হল 'ভালোবাসার কবিতা'। আট কবির চারখানা বই, এপিঠ-ওপিঠ করে শক্তি-সুনীলের যেরকম ছিল। জুটি করে করে। চিন্তা করো, আর আমার জুটি হচ্ছেন বেলাল ভাই (বেলাল চৌধুরী)। তাহলে আমার কবি না হয়ে উপায় আছে?”

কবিতা পড়ায় গতি আনতে সে সময় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন সে সময়ের কবিরা।

শামীম আজাদ বলেন, “আমরা প্রথম এই দেশে দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা পাঠ করেছি। আমি পড়েছিলাম মহিলা সমিতি মিলনায়তনে।”

ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করার সময় দৈনিক অবজারভারে একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে শামীম আজাদের।

“সেটি ছিল বিলেতে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক স্বল্পতা। ওরা আন্তর্জাতিকভাবে কিছু শিক্ষক নেবে। আমি তো পড়াই এই বড় বড় ছেলেদের, কিন্তু ওই যে সানবিমসে পড়ানো, ওই অভিজ্ঞতা দিয়ে অ্যাপ্লাই করলাম।”

সেখানে পড়ানোর সুযোগও মিলল শামীম আজাদের। দেশ ছেড়ে বিলেতে গেলেন তিনি।

সেখানে কিছুদিন বসবাসের পর কবি হওয়ার তাড়না ফের অনুভব করেন শামীম আজাদ। দেশে বিচিত্রা, ২০০০ এবং দৈনিক পত্রিকাগুলোয় নিয়মিত লেখা পাঠাতেন।

"ওখানে পোয়েট্রি ডে হয় আন্তর্জাতিকভাবে, একদিন রাইটার্স ডে হয়। এসব দিসে স্কুলগুলোতে আসে মানুষ। আবার আমাদের শিক্ষকদের ইংরেজি ক্লাসে ছেলেমেয়েদের কবিতা লেখা শেখাতে হয়। ওরা প্রথম জানল, যে আমি একজন কবি।

“আমি ভাবলাম যে করেই হোক ওই ভাষায় চর্চা শুরু করতে হবে, আমি ক্লাসে যদি ছেলেমেয়েদের লেখাতে পারি, আমি কেন লিখতে পারব না? বিলম্বে শুরু হলেও ভিন্ন ভাষায় কবিতা লেখা তখন থেকে শুরু। ক্রমে ক্রমে আমি দ্বিভাষিক কবি হলাম।”

তবে শামীম আজাদ মানেন, তার লেখার মূল শক্তি বাংলা। কোনো অনুষ্ঠানে যদি হলের ভেতরে তার নামটা উচ্চারিত হয়, তাহলে নাম আসবে বাংলাদেশের।

"আমার মনে হয়েছে, দেশ ছাড়লে কেউ তোমাকে কোনো দায়িত্ব দেয় না। কিন্তু তুমি একটা দেশের দূত, এই দায়িত্বটা তোমার ঘাড়ে চলেই আসে।”