Published : 17 Jan 2023, 11:06 PM
ভারত ভাগের সময় বাংলাদেশের পাব্না থেকে থেকে কলকাতায় থিতু হওয়া মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের অভিনয়ের শুরুটা নাটকীয়।‘নটীর পূজা’ নাটকে অভিনয় করে ছড়ান মুগ্ধতা, পরে স্বামী-শ্বশুরের উৎসাহে সিনেমায় আসা। কিন্তু তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’ মুক্তি পায়নি। এরপর ‘সাত নম্বর কয়েদি’ সিনেমা দিয়ে জীবনে মোড় ঘুরে যায়, সেই সাথে নাম ‘রমা দাশগুপ্ত’র বদলে ‘সুচিত্রা সেন’ এ নবজন্ম ঘটে এই নায়িকার। এর পরে আরেক কিংবদন্তি উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমাতেই ‘সুপারহিট’
উত্তম-সুচিত্রার অনবদ্য জুটিতে দিনে দিনে আলো ছড়ান তিনি। তার কথা বলার ঢং, বাঁকা চোখের চাহনি, বৈদ্যুতিক হাসি, চুলের স্টাইল, শাড়ি পরার ধরন, চলাফেরা, কথা বলার ধরনে সেকালের নারীদের কাছে সুচিত্রার স্টাইল ক্রমশ অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। বলা হয়, আভিজাত্য ও ফ্যাশনে কয়েক প্রজন্মের প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি
চলচ্চিত্রে অধিকাংশ সময়ই সুচিত্রার সহঅভিনেতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার। উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছাড়া সে সময় কোনো ছবি ‘হিট’ হবে, এটা ভাবা নির্মাতাদের জন্য কঠিন হত। তারা ৩১টি সিনেমায় জুটি বাঁধেন
১৯৫৪ সালে একটি পোস্টার ঝড় তোলে উত্তম-সুচিত্রার সংসার জীবনে। সুচিত্রার সই দেওয়া ওই পোস্টারে লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হল অগ্নিপরীক্ষা’। ভারতীয় পত্রিকাগুলোর খবর, সেই পোস্টার দেখে উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী সারাদিন কেঁদেছিলেন। আর সুচিত্রাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন স্বামী দিবানাথ। অভিনয় ছেড়ে দিতেও চাপ দেন
১৯৫৭ সালে উত্তম কুমার তার প্রযোজিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলে সুচিত্রা বলেছিলেন, “তোমার জন্য সব ছবির ডেট ক্যান্সেল করব।”
১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় হিন্দি ‘দেবদাস’ সিনেমায় দীলিপ কুমারের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান সুচিত্রা। ‘পার্বতী’ চরিত্রে তার অভিনয়ে বিমোহিত হয় দর্শক। এ ছবি তাকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সুচিত্রাকে। একে একে অভিনয় করেন শাপমোচন, সাগরিকা, পথে হলো দেরি, দীপ জ্বেলে যাই, সবার উপরে, দত্তা, গৃহদাহ, রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্তর মতো দর্শকপ্রিয় সব সিনেমায়
ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে এসে বলিউডের ‘আঁধি’ সিনেমায় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান সুচিত্রা। ততদিনে রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে সুচিত্রা সেন দর্শকের হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। কিন্তু পলিটিক্যাল-রোমান্টিক ‘আঁধি’তেও সুচিত্রা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। সিনেমাটির কাহিনী গড়ে উঠেছিল বিহারের রাজনীতিক তারকেশ্বরী সিনহার জীবনী অবলম্বনে। কিন্তু সুচিত্রা সেন পর্দায় হাজির হয়েছিলেন ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ‘স্টাইল’ নিয়ে। চলচ্চিত্রটির কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মুক্তি দেওয়ার ২০ সপ্তাহ পরে ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছিল আঁধি
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে ‘মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে’ সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান সুচিত্রা। ভারতীয় কোনো অভিনেত্রীর জন্য সেটিই ছিল বড় মাপের প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এছাড়া তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার পান ১৯৭২ সালে; ২০১২ সালে পান পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পুরস্কার বঙ্গবিভূষণ
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ সিনেমায় অভিনয়ের পর আকস্মিকভাবেই সুচিত্রা চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। এরপর প্রথম তিনি আড়াল ছেড়ে বাইরে আসেন মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর। আর শেষ জনসম্মুখে আসেন ১৯৮৯ সালে, তার গুরু ভরত মহারাজের মৃত্যুর পর। ২০০৫ সালে সুচিত্রাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলেও ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নিতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দিল্লি যেতে রাজি হননি তিনি
কিন্তু নিজের পারিবারিক ও অন্তরালের জীবন নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা মেনে চলেন সুচিত্রা। শুধু তিনিই নন, তার মেয়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন সেন, হালের নায়িকা দুই নাতনি রিয়া ও রাইমা সেনও কখনও মুখ খোলেননি
অভিনয় জীবনের পুরোটা সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা মানুষটি ছিলেন তার নিজের এবং পরের দুটি প্রজন্মের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তার অন্তরালের জীবন নিয়েও কৌতূহলের অন্ত ছিল না। একান্ত ব্যক্তিগত চিকিৎসক, হাসপাতালের নার্স, পত্রিকার সাংবাদিক কেউ তার অন্তরালে থাকা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি কখনও। স্বেচ্ছা নির্বাসনের বেশিরভাগ সময়ই তার কাটতো রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায়। একবার জাতীয়য় পরিচয়পত্র তৈরির সময় ছবি তোলার জন্য কেন্দ্রে আসেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু সে কাজটিও খুব গোপনে সেরে চলে যান তিনি
দুই যুগের অভিনয় জীবনে বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে ৬০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করা এই নায়িকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার অন্তরালের জীবন টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী বেলভিউ হাসপাতালে তার কক্ষটিও ছিল কঠোর গোপনীয়তার ঘেরাটোপের মধ্যে। তিন যুগের স্বেচ্ছা নির্বাসনে নিজের চারপাশে রহস্যের যে জগৎ গড়ে তুলেছিলেন, তার ভেতরে থেকেই চিরদিনের জন্য চলে যান তিনি