পালাগানের মঞ্চ থেকে কোক স্টুডিওতে ইসলাম উদ্দিন
সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের নৌকা বাইচের গান ‘হাত ছেড়ে দাও সোনার দেওরা রে’ প্রীতমের সংগীতায়োজনে প্রকাশ করেছে কোক স্টুডিও।
কোক স্টুডিওর আলো-ঝলমলে মঞ্চ এবার মাতলো পালাগানে। শিল্পী ইসলাম উদ্দিন ‘দেওরা’ শিরোনামের গান নিয়ে অন্যরূপে মেলে ধরলেন নিজেকে।
কোক স্টুডিও বাংলায় রোববার প্রকাশ করেছে নতুন গান ‘দেওরা’। সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের নৌকা বাইচের গান ‘হাত ছেড়ে দাও সোনার দেওরা রে’র নতুন সংগীতায়োজন করেছে কোক স্টুডিও।
গানের শুরুতে গায়ক ও সংগীত পরিচালক প্রীতম হাসান যখন ‘এত সুরে রঙিন, সোনার তরী’ গাইতে গাইতে মঞ্চে প্রবেশ করেন, তখন বোঝার উপায় থাকে না, নানা ধরনের ইন্সট্রুমেন্টের বাজনায় কিছুক্ষণ পর কী শুরু হতে যাচ্ছে।
এরপর ‘দেওরা’ গান গেয়ে সহশিল্পীর সঙ্গে নাচের হুল্লোড় তুলে দেন পালাগানে আসর মাতানো শিল্পী ইসলাম উদ্দিন। ইসলাম ও প্রীতম ছাড়াও গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আরমীন মুসা এবং তার কয়্যার ‘ঘাসফড়িং’।
ইসলাম উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘দেওরা’ গানের মূল স্রষ্টা সিরাজগঞ্জের ফজলু মাঝি (ফজুলুল হক), গানের সুরও বেঁধেছেন তিনি।
আর গায়ক ইসলাম উদ্দিনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার নোয়াবাদ গ্রামে। সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি গানে নতুন কিছু কথাও যুক্ত করেছেন গায়ক ও সংগীত পরিচালক প্রীতম হাসান।
প্রকাশের পর ৩২ লাখের বেশি মানুষ গানটি দেখছেন। ইউটিউব ট্রেন্ডে বুধবার গানটি ৩ নম্বরে দেখা যায়।
মঙ্গলবার ফোনে কথা হয় ইসলাম উদ্দিনের সাথে। গ্লিটজকে তিনি বলেন, এরকম প্ল্যাটফর্মে কাজ করার সুযোগ পেয়ে অনেক কিছু শিখেছেন।
“প্রীতম ভাইয়ের নির্দেশনায় কোক স্টুডিও যেভাবে চাইছে আমি সেভাবে গানটা করছি। গত ডিসেম্বরের ১২ তারিখ আমরা শুটিং করছি। তার আগে গানটা রেকর্ড হইছে। গানটা করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখছি।"
‘দেওরা’ সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গান জানিয়ে ইসলাম উদ্দিন বলেন, “এটা তো নৌকা বাইচের গান। কিন্তু গানটার সাথে আরও কিছু কথা দিয়ে নতুন করে করা হইছে। প্রীতম ভাই গানটার বড় কারিগর। কিন্তু গানটা মূল যারা আছে, তারাও আছে গানটাতে।"
নিজের এলাকার মানুষের কাছেও প্রশংসা পাচ্ছেন পালাকার ইসলাম।
“গানটি প্রকাশ হওনের পর এলাকার অনেকে আমারে ফোন করছে। তারা বলছে, গানটা ভালো হইছে।“
এই গানের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের অনেকে কোক স্টুডিওর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন বলে জানান এ পালাকার।
“কিশোরগঞ্জে আমার এলাকার অনেকেই কোক স্টুডিও চিনত না। কিন্তু আমি এখানে গান করি বইলা, এখন তারা কোক স্টুডিও চিনছে। তারা আমারে অনেকেই ফোনও করছে।”
এই গানে কীভাবে যুক্ত হলেন জানতে চাইলে ইসলাম উদ্দিন বলেন, "আমি তো গ্রামীণ পালাগান করি। এই গানটাও গ্রামীণ গান, বাইচের গান। এজন্যই মনে হয় উনারা আমারে বাছাই করে নিছে।”
ইসলাম উদ্দিনের জন্ম ১৯৬৯ সালের ২ অগাস্ট, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার নোয়াবাদ গ্রামে। অল্প বয়সেই গ্রামীণ নাট্যপালার অভিনয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ১২/১৩ বছর বয়সে ‘কাশেম-মালা’ ও ‘দস্যু বাহরাম’ নামের দুটি ঝুমুর যাত্রাপালায় অভিনয় করেন।
১৯৮৯ সালের দিকে তিনি গড়ে তোলেন ‘ইসলাম উদ্দিন পালাকার ও তার দল’। এই দল নিয়ে দেশের নানা অঞ্চলে পালাগান পরিবেশন করেছেন এই শিল্পী। মঞ্চস্থ করেছেন ‘কমলা রাণী সাগর দিঘি’, ‘আমির সাধু’, ‘সুন্দরমতি’, ‘রাম-বিরাম’, ‘জাহাঙ্গীর বাদশা’, ‘মতিলাল’, ‘ফিরোজ খাঁ’, ‘রূপকুমার’সহ নানারকম কিচ্ছা ও পালাগান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন একসময়।
অধ্যাপক ও নাট্য নির্দশেক সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশনায় নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ মঞ্চে এসেছিল ‘কমলা রাণী সাগর দিঘি’। ওই প্রযোজনায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার।
গবেষক ও রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুর রহমান লিপন অভিনয় করেছিলেন 'কমলা রাণী সাগর দিঘি' পালাটিতে।
সেই স্মৃতি স্মরণ করে লিপন গ্লিটজকে বলেন, "পালাগানের ভক্ত যারা, তারা ইসলাম উদ্দিন পালাকারকে এক নামেই চেনেন। ঢাবি নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ যখন 'কমলা রাণী সাগর দিঘি' মঞ্চে আনে, তখন তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন।"
