১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

রফি-কণ্ঠ সনু নিগমের ‘সেরা’ হয়ে ওঠা

পঞ্চাশ পেরিয়ে আসা এই সংগীত শিল্পীকে নিয়ে ভক্তদের প্রশ্ন- ‘সনু জি এত নিখুঁত কেন?’

রফি-কণ্ঠ সনু নিগমের ‘সেরা’ হয়ে ওঠা

সনু নিগম

আইরিন সুলতানা আইরিন সুলতানা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2023, 09:52 PM

Updated : 12 Oct 2026, 01:38 PM

জীবনের পঞ্চাশটি সুরেলা বসন্ত পেরিয়ে এলেন ভারতের সংগীতশিল্পী সনু নিগম। এরমধ্যে কখনও তাল কাটার মত বিতর্কেও জড়িয়েছেন, কখনও হুট করে গান থামিয়ে অবসরে ডুব দিয়েছেন, আবার বুড়োর সাজসজ্জায় ফুটপাতে বসে গানে নিমগ্ন থেকে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তিনি।  

জন্মকথা

১৯৭৩ সালের ৩০ জুলাই ভারতের হরিয়ানার ফরিদাবাদে জন্ম নেন সনু নিগম। বাবা আগাম কুমার নিগম আর শোভা নিগম দুজনেই ভালো গান করতেন। ২০০৫ এবং ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া আগাম কুমার নিগমের ‘বেওয়াফায়ি’ ও ‘ফির বেওয়াফায়ি’ অ্যালবাম দুটো বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

মিনাল ও নিকিতা সনুর দুই বোন। নিকিতাও গান করেন। সনু নিগদের সঙ্গে বেশ কিছু স্টেজ শোতে গাইতে দেখা গেছে তাকে।

মোটে তিন বছর বয়সে সংগীত জগতে পা রাখেন সনু নিগম; স্টেজে বাবার সঙ্গে মোহম্মদ রফির ’কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা’ গানে কণ্ঠ মেলান তিনি। এরপর থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে, পার্টিতেও বাবার সঙ্গে গাইতে শুরু করেন।

ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন না সনু নিগম। তাকে গিটার বা তবলা কিনে দেবার মতো সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। সনু বেঞ্চে তাল তুলে রেওয়াজ করতেন।

সনু নিগমের ছোটবেলা কেটেছে পড়াশোনা, রেওয়াজ, স্টেজ শো আর হারমোনিয়ামের সঙ্গে।

শিল্পী হওয়ার পথে জীবন সংগ্রাম

ওস্তাদ গোলাম মোস্তফা খানের কাছে ধ্রুপদী সংগীতের তালিম নেওয়া সনু নিগম সংগীতশিল্পী হিসেবে বলিউডে কাজ পেতে ১৮ বছর বয়সে মুম্বাই চলে আসেন।

সনু যখন মুম্বাই পা রাখেন তখন রাজত্ব করছেন তার প্রায় দ্বিগুণ বয়সী কুমার শানু, উদিত নারায়ণ আর অভিজিৎ।

সুরকাররাও তখন নতুন মুখের কারো সঙ্গে সহজে কাজ করতে চাইতেন না। কিন্তু সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে দেখা করতে সুন নিগম ঘণ্টার পর ঘণ্টা জুতার র‌্যাকেও বসেছিলেন।

Image

সনু নিগম

১৯৪২ লাভ স্টোরি সিনেমার এক লাড়কি কো দেখা তো গানটি হয়ত আজকে সনু নিগমের কণ্ঠেই শোনা যেত যদি কুমার শানু আর খানিকটা দেরি করে রেকর্ডিং স্টুডিওতে আসতেন।

গানটি কুমার শানু গাইবেন বলেই ঠিক ছিল। এদিকে সেদিন কুমার শানুর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তাতে ক্ষেপে ওঠেন সিনেমার পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া। সেসময় পঞ্চম অর্থ্যাৎ আর ডি বর্মন বলে ওঠেন, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি কুমার শানু এসে না পৌঁছান তবে সনু নিগমই গাইবেন এ গান।

সনু নিগমের ভাষ্যে, ওই সময় তিনি প্রার্থনা করছিলেন ‘শানু দা’ যেন স্টুডিওতে এসে না পৌঁছান।

যদিও এই প্রার্থনার ফল মেলেনি; দেরিতে হলেও কুমার শানু সেদিন ঠিক স্টুডিওতে আসেন এবং তার কণ্ঠেই এই গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।  

সনু নিগমের ক্যারিয়ারের শুরুতে বহু গান তিনি টি-সিরিজের জন্য রেকর্ড করেছিলেন, যা পরে আবার ভিন্ন শিল্পীকে দিয়ে গাওয়ানো হয়। এতে করে ভেঙ্গে পড়েছিলেন তিনি। 

হতাশ সনু নিগম এরপর দেখা করেন সংগীত পরিচালক উষা খান্নার সঙ্গে। অভয় দিয়ে উষা খান্না তাকে বলেন, “তোমার সময়ও আসবে।”

জয়যাত্রা

হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, ১৯৯০ সালে একটি সিনেমার জন্য প্লেব্যাক করেন সনু নিগম। কিন্তু ওই সিনেমা পরে আর মুক্তি পায়নি। 

আজা মেরি জান সিনেমার ‘ও আসমান ওয়ালে’ গানের মধ্যে দিয়ে ১৯৯২ সালে বলিউডে অভিষেক হয় সনু নিগমের।

এরমধ্যে গুলশান কুমারের নজরে পড়ে যান তিনি। বেওয়াফা সনম সিনেমার একটি গানের জন্য তাকে প্রস্তাব করা হয়। সিনেমা মুক্তির পর সনু নিগমের গাওয়া ‘আচ্ছা সিলা দিয়া তুনে মেরে পেয়ার কা’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৯৭ সালে বর্ডার সিনেমার গানে আবারও সফলতা ধরা দেয় সনু নিগমের ঝুলিতে।

সনু নিগমের কণ্ঠ ভারতের কিংবদন্তি মোহাম্মদ রফির সঙ্গে মিলে যায় বলে মনে হত অনেকের। মোহাম্মদ রফির নকল বলা হত তাকে। যারা তাকে রফির নকল কণ্ঠ বলতেন, তাদের উপযুক্ত জবাব দিলেন পরদেশ সিনেমার ইয়ে দিল দিওয়ানা গানটি গেয়ে।

Image

সনু নিগম

সনু নিগম সব ঘরানার গান গাইতে পারেন সেটা বুঝতে কারো বাকি ছিল না। তাই তো তাল, পুকার, সাথিয়া সিনেমার মত একের পর একে সিনেমায় গাওয়ার ডাক পড়ে তার।

ভক্তদের কাছে ভারতের এলভিস প্রিসলি হয়ে ওঠেন সনু নিগম বেশ কয়েকটি একক অ্যালবাম রিলিজ করেন। জান, দিওয়ানা, চান্দা কি ডোলি, কিসমত, ইয়াদ সবকটি অ্যালবামের গানই তুমুল সাড়া ফেলেছিল সনুভক্তদের মাঝে।   

ভারতে তো অবশ্যই আমেরিকা ও ইউরোপেও অসংখ্য স্টেজ শো করেছেন সনু নিগাম। বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে কনসার্ট মাতিয়ে গেছেন এই তারকা শিল্পী।

২০০৫ সালে ওয়াল্ট ডিজনির অ্যানিমেশন সিনেমা আলাদিন হিন্দি সংস্করণে মুক্তি পায়। আর তাতে আলাদিনের কণ্ঠ দিয়েছিলেন সনু নিগম।

হঠাৎ বিরতি

২০১৩ সালে চুক্তিনামা নিয়ে এক মিউজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সনু নিগম ভক্তদের হতবাক করে দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন।

ওই সময় তিনি ভক্তদের উদ্দেশে একাধিক টুইট করে চুক্তি নিয়ে ঝামেলার কথাও জানান।

টুইটে এই গায়কের অভিযোগ ছিল, মিউজিক কোম্পানি যেভাবে চুক্তি লেখে তা অসম্মানজনক ও অবৈধ।

চুক্তি নিয়ে এই গোলমাল মিউজিক লেবেল কোম্পানি টি-সিরিজের সঙ্গেই হয়েছিল বলে অনেক খবরেই প্রকাশ পায়।

গায়ক যখন নায়ক

কিশোর কুমার যেমন গানে নাম কামিয়েছেন, তেমনি অভিনয় করেছেন ৮০টিরও বেশি সিনেমাতে। ১৯৮২ সালে জয়াপ্রদা ও রাকেশ রোশান অভিনীত কামচোর সিনেমায় অভিনয় করে শিশুশিল্পী সনু নিগম। ১৯৮২ সালে মিঠুন চক্রবর্তী ও বিনোদ মেহরা অভিনীতি উস্তাদ উস্তাদি সে সিনেমাতেও কাজ করেন। ১৯৮৩ সালে বেতাব সিনেমায় সানি দেওলের ছোটবেলার চরিত্রেও ছিলেন সনু নিগম।

এরপর গায়ক সনু নিগমের একক নায়ক রূপে আবির্ভাব ঘটে ২০০৩ সালে। সেই সিনেমার নাম ছিল কাশ আপ হামারে হোতে। তার বিপরীতে নায়িকা ছিলেন রাজ বাব্বারের মেয়ে জুহি বাব্বার।

Image

সনু নিগম

তবে এর আগে ২০০২ সালে সানি দেওল, অক্ষয় কুমার, সুনীল শেঠির সঙ্গে জানি জুশমন: এক আনোখি কাহানি সিনেমা করেন। তার অভিনীতি লাভ ইন নেপাল মুক্তি পায় ২০০৪ সালে।

গায়ক সনু নিগম ততদিনে পরিচিতি পেলেও নায়ক সনু নিগমের সিনেমা বক্স অফিসে সাড়া জাগাতে পারেনি।

সেই খেদ অবশ্য পূরণ করেছে ২০১৯ সালের একটি শর্টফিল্ম।

এসিড আক্রান্ত নারীর যন্ত্রণা নিয়ে সাড়ে নয় মিনিটের এই শর্টফিল্ম সিকেএফ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, ইন্টারন্যাশনাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভাল অফ ইন্ডিয়ার মত অনেক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেই বোদ্ধাদের প্রশংসা কুড়ায়।

এই ছবি নিয়ে ভারতের শিল্পী সনু নিগম বলেন, “স্পটলেস খুব জরুরি একটি সিনেমা যাতে এখনও এ দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

”এসিড আক্রান্ত হলে মানুষের শরীর ও মনে কী হতে পারে তার উপলব্ধি জাগাতে চেয়েছি আমরা।যেন কেউ এমন কাজ করার কথা ভাবতেও না পারে। যদি এই সিনেমা দিয়ে আমরা ভালো কিছু পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে আমি মনে করি আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করেছি।”

বুদ্ধা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল এই শর্টফিল্মের জন্য সেরা পরিচালক হন সওরভ এফ পান্ডে। আর সনু নিগমের ঝুলিতে আসে সেরা অভিনয় শিল্পীর পুরস্কার।  

২০২০ সালের ২৫ জুন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে এই শর্টফিল্মটি রিলিজ দিলে প্রশংসায় মেতে ওঠেন ভক্তরা।।

সনুভক্তদের কেউ কেউ মন্তব্য করে বলেন, “সনু জি এত নিখুঁত কেন? অভিনয়ে, উপস্থাপনায়, গানে, নাচে সবটাই...কেন?” 

আত্মজীবনী লেখার চ্যালেঞ্জ

নিজের জীবনের হতাশা, গুঞ্জন, আবেগ ও আত্মিক দিক নিয়ে ২০২১ সালের মার্চে বই লেখার ঘোষণা দেন সনু নিগম।

এই আত্মজীবনীকে সবচেয়ে ’কাঙ্খিত’ বলে জানান প্রকাশনা সংস্থা ব্লুমসবারি ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিভ বেরি।

নিজেকে সনু নিগমের ভক্ত জানিয়ে প্রকাশক প্রাভীন তিওয়ারি বলেন, ”এই আত্মজীবনী যাত্রার অংশ হতে পারাটা বিরাট সুযোগ। ভক্তদের জন্য এই বই হবে আজীবনের উপহার।”

Image

সনু নিগম

তবে আত্মজীবনী লেখার সময়ে পৌঁছাতে হবে এমন কখনও ভেবে দেখেননি আগে বলে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন সনু নিগম।

তিনি বলেন, “এটা রোমাঞ্চকরও বটে। ব্যক্তিগত জীবনের অলিগলি আবারও ঘুরেফিরে দেখতে হবে।

”...তারপর সব ঢেলে দিতে হবে শব্দে। আমি অবশ্য নিশ্চিত আমার সাহস আমাকে পাল তুলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।”

উপস্থাপক থেকে বিচারক

অন্নু কাপুরের উপস্থাপনায় ক্লোজআপ আন্তাক্ষরি অনুষ্ঠানে উদিত নারায়ন, অভিজিৎ, সাধনা সরগমের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন সনু নিগমও। এরপর অনুষ্ঠানের পরিচালক সনু নিগমকেই এই অনুষ্ঠান উপস্থাপনার প্রস্তাব দিয়ে বসেন। কিন্তু সনু নিগম সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

এরপরই গানের প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান সারেগামা পরিকল্পনা করা হয় যার উপস্থাপক হয়ে টিভি পর্দায় আসেন সনু নিগম।

২০০১ সালে বিবিসিকে এসব কথা জানান পাঁচ বছর ধরে সারেগামার জনপ্রিয় মুখ হয়ে থাকা এই শিল্পী।

ভারতের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ইনডিয়ান আইডলে একাধিক সিজনে বিচারকের চেয়ারেও দেখা গেছে তাকে।

যদিও এমন অনুষ্ঠানে দর্শককে আকৃষ্ট করতে অনেককিছু বানোয়াট ও অতিরঞ্জিত করা হয় বলে ক্ষোভ জানিয়ে সেখান থেকে সরে আসেন সনু নিগম।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মিউজিক রিয়েলিটি শো সুপার সিংগার সিজন থ্রিতে বিচারক হিসেবে দেখা গেছে তাকে।

পুরানো খবর:

আজানের শব্দকে ‘গুন্ডাগিরি’ বললেন সনু, ক্ষুব্ধ ভক্তরা

বিতর্কের জেরে যখন ন্যাড়া

২০১৭ সালে আজান নিয়ে  এক টুইটের জেরে বিতর্কের মুখে পড়েন বলিউডি সিনেমার গান দিয়ে জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠা সনু নিগম। তার সেই টুইট বিভক্ত করে দেয় ভারতের শিল্পী সমাজকেও।

তবে সনু নিগম বলেন, তিনি টুইটে মন্দির ও গুরুদুয়ারার কথাও বলেছিলেন; কিন্তু সবাই আজান নিয়ে বলা কথা নিয়েই মেতে আছে।

ওই ঘটনায় সনু নিগমের মাথা মুড়িয়ে তাকে জুতার মালা পরিয়ে কেউ ঘোরালে তাকে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেবেন বলে ফতোয়া জারি করেন পশ্চিমবঙ্গের মৌলবি সাইদ শাহ আতিফ আলি আল কাদেরি।

এই ফতোয়ার প্রতিবাদে সনু নিগম নিজেই মাথার চুল কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে ওই মৌলবিকে ১০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলেন।

Image

সনু নিগম

তবে পরে ভারতের পরিবেশ অধিদপ্তর, মুম্বাই পুলিশ, পৌরসভা কমিশনারে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড থেকে বলা হয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আদেশকে মানছে না। 

সনু নিগমের স্পষ্ট কথার কারণে বহুবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে তাকে।

সালমান খান অভিনীত কিক সিনেমার হ্যাংওভার গানটি প্রথমে রেকর্ড করেন সনু নিগমই। তারপর তাকে না জানিয়ে ওই গান থেকে কণ্ঠ সরিয়ে নিয়ে সালমান খান নিজে গানটি গান। এই নিয়ে মন কষাকষি চলে দুই তারকার মাঝে।

অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার ঘটনার পর ভিডিও বার্তা সনু বলেন, “কাল হয়ত একজন গায়ক, একজন কম্পোজার, একজন গীতিকারের আত্মহত্যার খবর শুনতে হবে। কারণ দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের এই সংগীতাঙ্গনে... সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে বড় বড় মাফিয়ারা বাসা বেঁধেছে।”  

রাস্তার মোড়ের ওস্তাদ

পাকা চুল, চোখে কালো চশমা, মলিন জামা পরে হারমোনিয়াম নিয়ে ফুটপাতে চটের উপর বসে আবার কখনও পথের ধারে গাছতলায় বসে এক মনে গাইছেন বৃদ্ধ। মুম্বাইয়ের জুহুর ব্যস্ত পথে কেউ কেউ কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে শুনে আবার ছুটে যাচ্ছিল গন্তব্যে।কখনও ভ্যানগাড়ির সবজিওয়ালা দাঁড়িয়ে শুনছিল। কেউ বুঝতে পারছিলেন না কে এই বৃদ্ধ।

সনু কখনও সঙ্গে নেওয়া তার ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কেনা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গলা সাধছেন; কখনও গেয়ে উঠছেন  নিজেরই গাওয়া গান ‘হার ঘড়ি বদল রেহে হ্যায় ধুপ জিন্দেগি’।

সনু নিগমের সামনে দিয়ে অনেকেই চলে যাচ্ছিলেন, কেউ দাঁড়াচ্ছেন না; আবার কখনও জটলা করে দাঁড়িয়ে শুনছেন উৎসুক পথচারীরা।

এরমধ্যে এক তরুণ এসে তার কণ্ঠের প্রশংসা করে মোবাইলে রেকর্ড করার অনুমতি চান। এই তরুণ তারপর সনু নিগমের সঙ্গে হাত মেলান এবং তাকে  ‘আংকেল’ ডেকে জানতে চান, “আপনি নাস্তা করেছেন?”

পরে সনু নিগম বলেন, “ছেলেটি আমার সাথে হাত মেলালো। আর কাউকে দেখতে না দিয়ে সে আমার হাতে ১২ রুপি গুঁজে দিল। আমার এত ভালো লেগেছিল, মনে হল আমি লাখ লাখ অর্থ কামিয়ে নিলাম।”

ওই সময় ‘রোডসাইড ওস্তাদ’ পরিচিতি পাওয়া সনু নিগম অপরিচিত তরুণের দেওয়া সেই অর্থ ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখেন।

পরে শাহবাজ আলি নামের সেই তরুণকে খুঁজে বার করেন আয়োজকরা।  ওই বৃদ্ধ সনু নিগমই ছিলেন তা এক সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন এই তরুণ।

সনু নিগমের সঙ্গে সাক্ষাতে তাকে শাহবাজ আলি বলেন, “আমি আসলে ওই বৃদ্ধকে বলতে চেয়েছিলাম তিনি আপনার থেকেও ভালো গান।”

আপ্লুত এই তরুণ সনু নিগমকে সামনে পেয়ে বলেন, “আমার মনে হল, আমি জীবনে সবকিছু পেয়ে গেছি।”

বিপদমুক্ত সনু

সংসার জীবন

সাত বছরের প্রেমের পর ২০০২ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মধুরিমা ও সনু নিগম। মধুরিমা কলকাতার মেয়ে হওয়াতে এরপর সনু নিগমকে অনেকে ’কলকাতার জামাই’ বলতে শুরু করে। ২০০৭ সালে এই যুগলের সন্তান নাভিন নিগাম জন্ম নেয়।

মধুরিমা ও সনু নিগমের সংসার জীবনেও এসেছে টানাপোড়ন। সেসময় গায়িকা সুনিধি চৌহান ও স্মিতা থাকরের সঙ্গে তার প্রেমের গুঞ্জনও ওঠে।

২০১৪ সালে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই গায়ক বলেন, “আমার সন্তানই আমাদের সংসারকে জুড়ে রেখেছে। নয়তো আমি সম্মানের সঙ্গে এবং কোনো ক্ষোভ ছাড়াই হয়ত আমার স্ত্রীকে জানিয়ে দিতাম, আমাদের আর বনিবনা হচ্ছে না।

Image

সনু নিগম

”আমার স্ত্রী চমৎকার চমৎকার একজন মানুষ। কিন্তু আমরা সবাইর নিজের মত করে বেড়ে উঠি। আমরা দুজনেই খুব পরিণত মানুষ। আমরা একে অন্যের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করতে একসাথে আছি। যদি আমার সন্তান না থাকত, তাহলে আমি হয়ত ভিন্ন এক কক্ষপথে থাকতাম। আমি হয়ত ছয় মাস কাজ করতাম আর ছয় মাস হিমালয়ে আমার মায়ের গ্রামে কাটাতাম।”

এখন অবশ্য সনু নিগম বলেন, বিয়ের পর সংসার জীবনের সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে মানসিকভাবে আজ খুব গোছানো।

পুরস্কার প্রাপ্তি ‍

গত বছর ভারতের চতুর্থ জাতীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার মেলে এই গুণী শিল্পীকে। যদিও এমন সম্মাননা জানাতে তার কাছে সরকারি আমলাদের ফোন এলে তিনি তাদের বিমুখ করেছিলেন শুরুতে।

শুরুতে এই শিল্পী ও সংগীত পরিচালক সাফ জানিয়ে দেন, “আমি এই সম্মাননা নিতে পারছি না। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আপনারা আমাকে এখন এসে পদ্মশ্রী দিচ্ছেন। আমি এর আশা করার পর্যায় পার হয়ে এসেছি আগেই।”

পরে অবশ্য ‘বাবা সঙ্গে কথা বলে দেখবেন’ জানিয়ে ফোন রাখেন তিনি।   

এ ধরনের সম্মাননা পেতে অনেক তদবির চলে জানিয়ে তদবিরে পাওয়া পুরস্কার নিতে নিজের বরাবরে অনাগ্রহের কথাও জানান সনু নিগম।

তবে এবার এই পুরস্কার তার কাছে নিজেই এসে ধরা দিয়েছে; আর তাই শেষ পর্যন্ত তিনি পদ্মশ্রী সম্মাননা নিতে রাজি হন। 

তিন দশকের সংগীত জীবনে সনু নিগমের ঝুলিতে জুটেছে আরও অসংখ্য সম্মাননা। গেয়েছে ছয় হাজারেরও বেশি গান একাধিক ভাষায়।

হিন্দি ও কানাড়া গানে সনু নিগমের বেশি পরিচিতি হলেও ইংরেজি, বাংলা, ভোজপুরি, তামিল, তেলেগু, নেপালি, মারাঠি ভাষাতেও গান করেছেন তিনি।

’মেলডি কিং’ সনু শুধু রোমান্টিক গানই নয়, গেয়েছেন ভজন, দেশাত্ববোধক, রক ও গজলও।

সনু নিগম রাজনীতিতে আসতে পারেন এমন একটি গুঞ্জন উঠেছে জানিয়ে ২০২১ সালে টাইমস অফ ইন্ডিয়া এই নিয়ে প্রশ্ন করেন এই শিল্পীকে।

জবাবে হেসে উঠে সনু নিগম বলেন, “আমি রাজনীতি করার মত যোগ্য নই। কারণ আমি নিষ্ঠুরভাবে সৎ একজন মানুষ। আমি আমার দলের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে উঠব।”