‘লক্ষণ দাস সার্কাস’র প্রিমিয়ার ফিরিয়ে আনল সার্কাসের স্মৃতি

সরকারি অনুদানে নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি।

গ্লিটজ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2022, 07:40 PM
Updated : 21 Sept 2022, 07:40 PM

সার্কাস শিল্পীদের টিকে থাকার লড়াইয়ের কাহিনী নিয়ে ঝুমুর আসমা জুঁই নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য লক্ষণ দাস সার্কাস’। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে নির্মিত সিনেমাটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে সিনেমাটির উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।

ষাটের দশকে বরিশালের গৌরনদীর লক্ষণ দাসের হাত ধরে যাত্রা করা সার্কাসের যে দলটি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, স্বাধীনতার অর্ধশতকে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটির দীর্ঘ পালাবদলের গল্প ওঠে এসেছে সিনেমাটিতে।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বলেন, “সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে ধর্মের অপব্যবহারী দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধ করতে হবে। তাদের জবাব দেওয়ার অন্যতম মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে সার্কাস, নাটক, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।”

স্মৃতিচারণ করে মোজাম্মেল বলেন, “চিত্তবিনোদনের জন্য খুব জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল সার্কাস। প্রায় ৭০ বছর আগে আমি চতুর্থ শ্রেণিতে থাকাকালীন প্রথম সার্কাস দেখি। তারপর প্রতিবছর নিয়মিত সার্কাস দেখতাম। তখন গাজীপুরে রথযাত্রা উপলক্ষে নিয়মিত সার্কাস প্রদর্শন করা হত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সে সার্কাস অনেকটাই হারিয়ে গেছে।”

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, চলচ্চিত্র যদিও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন, তবে সংস্কৃতির উপাদান হিসাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান দেওয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জাতির পিতার বড় ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদানে প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

Also Read: ‘দ্য লক্ষণ দাস সার্কাস’ আসছে ২১ সেপ্টেম্বর

নিজের সার্কাস দেখার স্মৃতি স্মরণ করে খালিদ বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় কমলা সার্কাসের খুব নামডাক ছিল। সার্কাসশিল্পীদের বিভিন্ন ধরনের কসরত, তারের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, হাতি, বাঘ দেখে খুব আনন্দ উপভোগ করতাম। পরবর্তীতে মৌলবাদীদের উৎপাতে সার্কাস অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।

“সার্কাস নিয়ে নির্মিত দ্য লক্ষণ দাস সার্কাস প্রামাণ্যচিত্রটি হতে পারে এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবনের একটি প্রধান অস্ত্র। মহান সার্কাস শিল্পী লক্ষণ দাসের জীবনকাহিনী নিয়ে মূলত প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে। লক্ষণ দাস মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শুধু তাকেই হত্যা করেনি, বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে তার আদরের হাতিটাকেও।”

নাট্যজন অনন্ত হীরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মানজারে হাসীন মুরাদ, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাহিন ইসলাম, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক মো. নিজামুল কবীর ও সূর্য দীঘল বাড়ি-খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মসিহ উদ্দিন শাকের। 

অনুভূতি ব্যক্ত করেন ‘দ্যা লক্ষণ দাস সার্কাস’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের প্রযোজক ও পরিচালক ঝুমুর আসমা জুঁই। তিনি বলেন, “সার্কাস শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া মানুষগুলোর পাশে থাকা এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির মূল উদ্দেশ্য। সামান্য প্রাপ্তি আর নির্মম বাস্তবতা। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তারপরও প্রদর্শনী শেষে বিশ্বজয় করার অনাবিল প্রশান্তি। একজন সত্যিকারের শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব নিজেকে বিলিয়ে অন্যকে আনন্দ দেওয়া।”

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী।

নির্মাতা ঝুমুর আসমা জুঁই জানান, গৌরনদীর লক্ষণ দাস ষাটের দশকের শুরুতে ‘দি রয়্যাল পাকিস্তান সার্কাস’ নামে একটি সার্কাসের দল খোলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সহযোগিতা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এ কারণে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয় তাকে; আহত হন তার স্ত্রী। তাদের টাকাপয়সা, সোনার অলঙ্কার লুটপাটের পাশাপাশি সার্কাস দলের হাতিটিকেও হত্যা করা হয়। তবে লক্ষণ দাসের সেই সার্কাস দল নিঃশেষ হয়ে যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘দি রয়্যাল বেঙ্গল সার্কাস’ ও ‘দি লক্ষণ দাস সার্কাস’ নামে আত্মপ্রকাশ করে দলটি। লক্ষণ দাসের ছেলে অরুণ দাস ও বিরেণ দাস সার্কাসের দল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সংগ্রাম’ করে যাচ্ছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক