Published : 06 Aug 2026, 09:36 PM
নাটকে অভিনয় করবেন বলে দশ বছর বয়সে মায়ের শাড়ি দিয়ে স্ক্রিন বানিয়ে মঞ্চ সাজিয়েছিলেন, যদিও তারও আগে মায়ের কোলে বসে নাটক দেখতে দেখতে টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল তার; তিনি নাটক ও সিনেমার দাপুটে অভিনেতা আবুল হায়াত।
শুরুটা সেই ১৯৬৫ সালে, চট্টগ্রাম বেতারে। পরের কয়েক দশক মঞ্চ থেকে টেলিভিশনে কাজ করেছেন চুটিয়ে। এরই মাঝে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে অভিষেক হয় বড় পর্দায়।
দেশের একটি প্রজন্মের দর্শকের কাছে তিনি টিভি নাটকের বাবা চরিত্রের পরিচিত মুখ। তবে সহজাত চরিত্রাভিনেতা আবুল হায়াতের তাতে কোনো সমস্যা নেই। নিজের বিচারে তিনি সবসময়ই ‘নায়ক’।
গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ ‘আড্ডানামা’য় অতিথি হয়ে এসে আবুল হায়াত শুনিয়েছেন তার জীবনে টুকরো টুকরো গল্প, আনন্দের জন্য কাজ করে যাওয়ার দর্শন।
সাক্ষাৎকারে তার জীবনকথন শুরু হয়েছে তিন বছর বয়স থেকে। পরিবার, স্বজন, নিজের সাংস্কৃতিক বোধের গোড়ার কথা বলেছেন। এত মাধ্যমে কাজ করলেও মঞ্চকেই কেন শেকড় ভাবেন, টেলিভিশন পর্দাই কেন তার বেশি আপন মনে হয়, বলেছেন সে কথাও।
আবুল হায়াত কেবল নিজের কথা বলে যাননি; পূর্বসূরী আর সমসাময়িক শিল্পীদের কথাও এসেছে তার গল্পের পরতে পরতে। এসেছে নিজে মুমূর্ষু থাকা অবস্থায় কন্যা বিপাশা হায়াতের জন্মের সময়ের কিছু ঘটনা। ফাঁস করেছেন বিরাশি বছর বয়সেও উদ্যমী থাকার রহস্য।
আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল। বৃহস্পতিবার রাতে প্রচার হয়েছে ‘আড্ডানামা’র প্রথম পর্ব।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
‘ইঞ্জিন কুউউ করে ডাক দিল, মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম’
আড্ডায় বসে আবুল হায়াত বললেন, ১৯৪৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তার জন্ম। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামে আসা, তখন বয়স তিন বছর।
“তখন তো কিছুই বুঝি নাই। বোঝার মধ্যে এইটুকু বুঝেছি যে, আমরা লটবহর নিয়ে ট্রেনে উঠলাম, একটা কালো ইঞ্জিন কুউউ করে ডাক দিল আর আমি চিৎকার করে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এইটা শুধু মনে আছে আমার তিন বছর বয়সের এই দৃশ্যটা।"
ট্রেনের যাত্রা মনে না থাকলেও গোয়ালন্দ থেকে চাঁদপুরের স্টিমারের স্মৃতি এখনও চোখে ভাসে এই অভিনেতার। তারপর সোজা চট্টগ্রাম, যেখানে কেটেছে তার শৈশব, কৈশোর।
বাবা খন্দকার মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, মা শামসুন নাহার বেগম; চারবোনের এক ভাইয়ের পরিবারে বিরাজ করত সাংস্কৃতিক আবহ।
আবুল হায়াতের কথায়, রেলওয়ের অফিস সুপারিনটেনডেন্টে পদে চাকরি করা তার বাবা ছিলেন নাটক পাগল মানুষ। রেলওয়ে এমপ্লয়িজ ক্লাব ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউটের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনির যাবতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা।
বাবার অনুপ্রেরণাতেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন আবুল হায়াত। শেষ পর্যন্ত বাবাকেই জীবনের আদর্শ মানেন।
মায়ের শাড়ি দিয়ে স্ক্রিন আর চাদর দিয়ে যবনিকা
চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনির মঞ্চে অভিনেতা অমলেন্দু বিশ্বাসের অভিনয় যাদু দশ বছর বয়সি আবুল হায়াতকে আকৃষ্ট করে।
তিনি বলেন, "একজন লোককে আমি দেখতাম প্রায়ই মঞ্চে। ওই লোকটাকে আমি ভুলতে পারি না। সেই লোকটার নাম হল অমলেন্দু বিশ্বাস। মঞ্চের ওপর একটা লোক, প্রচণ্ড রকমের কণ্ঠ তার, চেহারা সেরকম, তার হাঁটা সেরকম, তার ফিগার সেরকম! তখনই মনে হত আরে বাপরে বাপ, এই লোক কী করে! সব লোকে তালি দেয় তাকে, তার অভিনয় দেখে। তো মনে হলো যে আচ্ছা এগুলো আমরা তো করতে পারি।
"তো আমি আর আমার বন্ধু, মিন্টু, মানে জামালউদ্দিন হোসেন। আমরা দুজনেই ওই একই পাড়াতেই ছোটবেলা থেকে মানুষ হয়েছি। তো দুজনেই যুক্তি করলাম চলো আমরা দুজনে করি নাটক। কী করে করা যায়, তারপরে যাই হোক, আমার বাড়িতে এক মামা ছিলেন, উনি একটা নাটকের বই জোগাড় করে দিলেন 'ছোটদের টিপু সুলতান'।
এরপর দুই অভিনেতা নিজেরাই বাড়িতে বানিয়ে ফেলেন মঞ্চ। চৌকি, শতরঞ্জি, মায়ের শাড়ি দিয়ে স্ক্রিন আর চাদর দিয়ে যবনিকা। নিজেরই মঞ্চস্থ করেন 'ছোটদের টিপু সুলতান'। বয়স তখন দশ; নাটকের সঙ্গে সখ্য কেবল শুরু।
তবে আবুল হায়াত আনুষ্ঠানিক মঞ্চে ওঠেন আরো পরে, স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়, 'কলির জিন' নাটক দিয়ে।
অভিনয় কীভাবে রক্তে মিশে গেল, তা বোঝাতে আবুল হায়াত ফিরে যান ষাট-সত্তর দশক আগে
“সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে কতটা ঋদ্ধ ছিলাম আমরা! প্রতি বছর, রেলের প্রত্যেকটা এলাকায় একটা বিচিত্রানুষ্ঠান হত। তো ওইগুলো কিন্তু আমাদের ইন্সপায়ার করত। গান, নাটক, কমেডি নিজেদের মধ্যে রপ্ত করতে করতে অভিনয় রক্তের ভেতর ঢুকে গেল।”
‘বুয়েটে নাটক তখন রমরমা’
চট্টগ্রামে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে আবুল হায়াত পা রাখেন ঢাকায়। বুয়েটে ভর্তি হন, পড়ার সুযোগ হয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বুয়েটে পড়ার সময় নাটকের প্রতি তার অনুরাগ আরও গাঢ় হয়।
তার কথায়, বুয়েটে নাটক তখন ‘রমরমা’; জামালউদ্দিন হোসেন, সিরাজুল মজিদ মামুন, আবুল কাসেম ও গোলাম রাব্বানিসহ একদল বন্ধু মিলে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন।
কোনো নাটক মঞ্চায়নের পর রেস্তোরাঁয় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্লেষণ চলত। বুয়েট জীবনে তার অভিনীত শেষ নাটক ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শেষ রক্ষা'।
রসিকতা করে বললেন, “ওই সময়ে আমাদের দেখলেই সবাই বলত, ‘ওই যে ঘেটুপার্টির লোক’।”
‘আমরা সবাই নাগরিকের হয়ে গেলাম’
জীবনতরঙ্গে এরপর আবুল হায়াতের কাছে ধরা দেয় চট্টগ্রাম বেতার। ১৯৬৫ সাল। এরপর যোগ দেন ঢাকা বেতারে। সেখানে সাত দিন সংবাদ পাঠ করেন।
এর তিন ব্ছরের মধ্যে ১৯৬৮ সালে সেই মাধ্যমটির আবুল হায়াতের যোগাযোগ ঘটে যায়, যা পরবর্তীতে জড়িয়ে যায় তার অভিনেতা সত্ত্বায়। এমনকি তিনি এও ভাবতেন, কেবল টেলিভিশনে অভিনয় করেই যদি জীবনধারণ করা যেত, তাহলে চাকরি করে কে!
টেলিভিশনের কথা বলার মধ্যেই আবুল হায়াতকে সঞ্চালক টেনে নিয়ে যান মঞ্চনাটকের কথায়।
আবুল হায়াত বলেন, টেলিভিশনে যাত্রা শুরুর সময় তার কাছে খবর আসে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় শিল্পী খুঁজছে।
“নাট্যকার জিয়া আনসারী এবং আতাউর রহমান দুজনে মিলে লোক খুঁজছে, গ্রুপ করবে। তখন আমাকে ধরেছে ইনাম আহমেদ, ইনামুল হক, গোলাম রাব্বানি আরো দু-চারজন ছিল যারা, আমরা ওই মিটিং হত, আমরা যেতাম, পিছনে বসে থাকতাম। তারপরে দেখেছি আরকি যে একটা গ্রুপ তৈরি করতে কত গর্ভযন্ত্রণা হয়! ঝগড়াঝাঁটি, মারপিট প্রায় এরকমই অবস্থা। তারপরে গ্রুপ তৈরি হওয়ার আগেই ভেঙে গেল গ্রুপ। অর্ধেক হয়ে গেল। অর্ধেক চলে গেল, অর্ধেক থাকল।
“তো জিয়া ভাই আমারে বললো, জিয়া ভাই আতা ভাই বলল, ‘তোমরা কি আমাদের দলে থাকবা কি না?’ তখন আমি ইনাম ভাইরে বললাম, কি ইনাম ভাই কী বলেন? ইনাম ভাই বললেন যে ‘আমি থাকব’। আমি বলি, তাহলে আমিও থাকব। রাব্বানি ভাই বললেন যে ‘আমিও থাকব’। তো আমরা সবাই নাগরিকের হয়ে গেলাম।”
এরপর তারা নাটক নিয়ে মঞ্চে আসেন স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে। 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ', ‘বাকি ইতিহাস’সহ আরও কিছু কাজ করে মঞ্চের নিয়মিত অভিনেতা বনে যান।
'বাকি ইতিহাস' নাটকে অভিনয়ের জন্যই আবুল হায়াত তার জীবনের প্রথম স্বীকৃতি হিসেবে 'সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অফ মেরিট' অর্জন করেন।
পরে 'বহিপীর', 'দেওয়ান গাজীর কিসসা', 'অচলায়তন', 'মুখোস' ও 'মাদার কারেজ' এর মত জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে তিনি অভিনয় করেন।
২০১৭ সালের পুরো পরিবারের সঙ্গে মালয়েশিয়ায়। (সামনে বাঁ থেকে) বিপাশা হায়াত, নাতাশা হায়াত ও আবুল হায়াত; (পেছনে বাঁ থেকে) শিরিন হায়াত, তৌকীর-বিপাশার মেয়ে, শাহেদ শরীফ খান, শাহেদ-নাতাশার মেয়ে ও ছেলে, তৌকীর-বিপাশার ছেলে এবং তৌকীর আহমেদ
'বহিপীর' নাটক ঘিরে একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন আবুল হায়াত। তিনি বলেন, "'বহিপীর' কিন্তু আমার খুব একটা ভালো কাজ ছিল। নাটকটির ১০টা না ১৫টা শো হয়েছিল, এরপর এন্টারটেইনমেন্ট ট্যাক্সের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। ম্যাজিস্ট্রেট আসল হলের মধ্যে। গটগট করে দুটো পুলিশ নিয়ে আসল, দুই পুলিশের হাতে দুই রাইফেল। এসে বলে 'নাটক বন্ধ করেন।' আর আমাদের বাচ্চাগুলা এই যে বিপাশা, শমী পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গেল। তো আমরা নাটক বন্ধ করে বসে রইলাম।
"পরে অনুরোধ করে বললাম, 'আচ্ছা নাটকটা আমরা শেষ করি।' তো নাটক শেষ করার পরে উনি (ম্যাজিস্ট্রেট) মেকআপ রুমে গিয়ে বললেন যে 'আপনারা তো কোটি কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দেন। আপনারা এত কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন, এগুলো চলবে না। বন্ধ।'"
‘বহিপীর’ হুট করে বন্ধ হওয়ার আক্ষেপ এখনো রয়ে গেছে আবুল হায়াতের মতে। তার কথায়, “একেবারেই খামোখা কাজটি করা হয়।”
সে সময় বেইলি রোডে মহিলা সমিতির দরজায় তালা পড়ে যায়। সে প্রতিবন্ধকতা কাটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে।
অভিনেতা বলেন, "তখন সব নাটক, মহিলা সমিতি বন্ধ করে দিল। তখন একটাই উপায় ছিল বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে বলা। এই লোকটা নাটক পছন্দ করে, সবাই জানে। তখন দল বেঁধে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়া হল। বঙ্গবন্ধু বললো, 'অ্যাঁ! আমার পোলাপানে নাটক করব, তার আবার ট্যাক্স কীসের? যা!' তো ওই এককথায় যাত্রাও ফ্রি হয়ে গেল, যাত্রার ট্যাক্সও ফ্রি হয়ে গেল।"
স্টেজ আর টেলিভিশনে ‘চুটিয়ে’ কাজ
নাটক ভালোবাসতেন বলে আবুল হায়াত এমন চাকরি খুঁজতেন, যেখানে বদলির ঝামেলা নেই। তেমনটা মিলেও গেল।
"আমি তখন ঢাকা ওয়াসায় চাকরি করি। ঢাকা ওয়াসার চাকরিটা আমি খুব সেধে নিয়েছিলাম, আরও অনেকগুলো চাকরি ছিল হাতের মধ্যে আমার। কিন্তু সেগুলো সব ঢাকার বাইরে বেশিরভাগ। আমি বললাম যে না, যত ভালো চাকরিই হোক, আমাকে ঢাকাতে থাকতে হবে। সুতরাং ওয়াসার চাকরি একমাত্র আমার জন্য উপযুক্ত চাকরি, এর কোনো ট্রান্সফার নাই ঢাকার বাইরে।"
তবে সেধে নেওয়া সেই সরকারি চাকরিতে পরে তিনি ইস্তফা দেন অভিনয়ে আরও বেশি সময় দেওয়ার জন্য।
মাঝে এবার চাকরির জন্য বিদেশে পাড়ি জমালেও সেই নাটকের টানেই দেশে ফেরেন। কারণ ততদিনে অভিনয়ের সঙ্গে ঘর-সংসার পেতেছেন তিনি। আর নাট্যচর্চা চালিয়ে নিতে তিনি ঢাকা শহর কখনো ছাড়তে চাননি। পরে দশগুণ বেশি বেতনে বেসরকারি চাকরি শুরু করেন। তাতে জীবনযাপন সহজ হয়ে যায়।
আবুল হায়াতের কথায়, দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন টেলিভিশনে।
“আমাদের গ্রুপে একমাত্র আমিই, যে স্টেজ আর টেলিভিশন একেবারে চুটিয়ে একসাথে করতাম।”
টেলিভিশনে কাজ করার জন্য বন্ধুবান্ধবদের গঞ্জনাও কম শুনতে হয়নি।
“আমার বন্ধুবান্ধব অনেকে গালাগালি করত টেলিভিশনে অ্যাকটিং করার জন্য, পরে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল টেলিভিশনে অভিনয় করার জন্য। সেগুলো আমার মনে আছে। যাই হোক, আমি সবসময় ভাবতাম যে আহা, টেলিভিশনে অভিনয় করে যদি জীবনধারণ করা যেত, ওই চাকরি বাকরি কে করে।”
‘চুল ছাড়াই তো ভালো লাগে, যা পাস’
বড় পর্দায় আবুল হায়াতের অভিষেক প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ দিয়ে।
সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অভিনেতা বলেন, “শুরু হল বিখ্যাত একজন লোকের হাত ধরে, সেটাও কপাল।”
অভিনেতা হাসান ইমামের মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে যোগাযোগ হয় আবুল হায়াতের।
“হাসান ভাই আমাকে এসে ধরল, ‘হায়াত সিনেমা করবা?’ আমি চিন্তাও করিনি কোনোদিন সিনেমা করব বা আমি কোনোদিন সিনেমা আর্টিস্ট হব। ‘ঋত্বিক বাবু এসেছেন তোমাকে একটু দেখবে চল।’ এই তো লাফ দিয়ে গেলাম।”
এফডিসিতে যাওয়ার পর মেকআপ নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল আবুল হায়াতকে।
“উনি আবার এক ঘণ্টা শুটিং টুটিং করতেছে ওইদিকে। এসে বললো, ‘কই, হেই পোলাডা কই? হেই পোলাডা কই?’, আমি বসে রয়েছি চুল লাগিয়ে মেকআপ নিয়ে বসে রয়েছি। আমার দিকে দেখলেন, ওইযে যা হয় আরকি, এরকম করে থুতনি ধরে এদিক ওদিক নিয়ে, আমার মাথায় চুলটা (পরচুলা) খপ করে তুলে ফেলে দিলেন। বললেন, ‘এই চুল ছাড়া তো ভালো লাগে, জমিদারের মত, এই চুল বাদ। পাস, যা।’ আমি পাস। ঢুকলাম সিনেমায়।”
এপর রাজেন তরফদারের 'পালঙ্ক' সিনেমায় কাজের প্রস্তাবও আসে দ্রুতই। পরে বেবী ইসলাম, মাজেদ মল্লিক, সুভাষ দত্ত, আর কাজী জহিরের সিনেমাতেও অভিনয় করেন আবুল হায়াত।
‘আমি তো সব সময় নায়ক’
একটি প্রজন্ম আবুল হায়াতকে সাধারণত ‘বাবা’ চরিত্রে বেশি দেখেছে। সঞ্চালক জানতে চাইলেন, “তোমার কি কখনো নায়ক হতে ইচ্ছে করেনি?”
আবুল হায়াতের চটজলদি উত্তর, “আমি তো সবসময় নায়ক।”
তিনি বলেন, নাটকে তিনি কখনো অভিনেত্রী ফেরদৌসী রহমানের স্বামীর চরিত্রে কাজ করছেন, কখনো বাবার চরিত্রে। সুবর্ণা মুস্তাফার টেলিভিশনের প্রথম নাটক ‘ইডিয়ট’ এ তার বাবা হয়েছিলেন। আবার ‘আর রবিবার’ নাটকে তার প্রেমিকে চরিত্রে কাজ করেন। একইভাবে প্রয়াত অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদের সঙ্গে দুটি নাটকে আবুল হায়াত তার বাবা ও ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেন।
“অনেকের মধ্যে কাজ করে যে আমি বাবা করব না, বা এরকম কিছু… আমার মধ্যে ওই জিনিসটা নাই। ক্যারেক্টার অ্যাকটিংয়ের দিকে আমার ঝোঁক ছিল সবসময় বেশি। কারণ একজন আর্টিস্ট তাকে নিজেরটা নিজেকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে দর্শকের কাছে, এটাই তো ব্যাপার। সুতরাং আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে, আমার ডায়লগ দিয়ে, ডেলিভারি দিয়ে আমি করতে পারি কতটা, সেটার ওপর নির্ভর করে সবকিছু।”
‘সহজ স্বাভাবিক’ এই অভিনয় শৈলী কীভাবে রপ্ত করলেন আবুল হায়াত?
তিনি বললেন, “আসলে রপ্ত করার কিছু নাই, এটা গড গিফটেড। আমি সবসময় বলি যে এটা গড গিফটেড।
“ক্লাস টেনে যখন পড়ি, আব্বার মঞ্চে যখন কাজ করেছি। ওখানে আবার আব্বার সব বড় বড় আর্টিস্ট যারা ওই মঞ্চের, তারা সবাই অভিনয় দেখেছে। তারা আব্বাকে বলেছে, ‘আরে তোমার ছেলে তো অভিনয় করেছে, এ তো মনেই হয় না অভিনয় করে।’ এটা বুঝলাম, যখন জিয়া ভাইয়ের (নাট্যকার জিয়া আনসারী) সাথে কাজ করতে গেলাম। যারা পণ্ডিত ব্যক্তি, তারা বলেন, অভিনয়টা মনে হবে না অভিনয় করছ, এটাই হল সবচেয়ে বড় কথা।”
স্ত্রী মাহফুজা খাতুন শিরিন এবং দুই মেয়ে বিপাশা হায়াত (সবার ডানে) ও নাতাশা হায়াতের (সবার বাঁয়ে) সঙ্গে আবুল হায়াত।
‘কাজেই আনন্দ’
কথায় কথায় অভিনেতা বললেন, তিনি গুরু মানেন লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে। লেখকের একটি কথা তিনি মেনে চলেন।
একবার কলকাতায় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে সস্ত্রীক নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন আবুল হায়াত। সে সময় লেখকের একটি কথা তার মনে দাগ কেটে যায়।
আবুল হায়াত বলেন, “তিনি (সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়) বললেন ‘হায়াত সাহেব একটা কাজ করবেন শোনেন, যদি বেশিদিন বাঁচতে চান ভালোভাবে, তাহলে আনন্দ করবেন’। কীভাবে আনন্দ করব? ‘কাজ করলেই আনন্দ। ওই আনন্দই আপনাকে সুস্থ জীবন দেবে এবং অনেক দীর্ঘ জীবন দেবে’। আমি কিন্তু সেটাই করে আসছি। আমি আনন্দ পেতে চেষ্টা করি কাজের মাধ্যমে।”
১৯৭০ সালে বিয়ে করেন আবুল হায়াত। সে প্রসঙ্গে রসিকতা করে বলেন, “একটা বিয়ে করেছি, একটাই প্রেম করেছি।”
‘এই লও তোমার বিপাশা’
মেয়ে বিপাশা হায়াতের জন্মের সময় জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন আবুল হায়াত।
একাত্তরের মার্চে শহীদ মিনারে হাসান ইমামের নির্দেশনায় 'রক্ত দিলাম স্বাধীনতার জন্য' নাটকের প্রদর্শনীর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু রিহার্সালের ১০ দিনের মাথায় হঠাৎ নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয় আবুল হায়াতের।
“কোনো চিকিৎসাতেই রক্তক্ষরণ থামছিল না। ২৩ মার্চ আমার অবস্থা এতই আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে যে চিকিৎসক শহীদ ফজলে রাব্বি আমাকে দেখে বলেছিলেন 'হি ইজ আ লস্ট কেস'।"
স্ত্রী শিরিন হায়াত তখন সন্তানসম্ভবা; ওই সময়ে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অন্যদিকে অভিনেতার শরীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হতে শুরু করে যে, ধীরে ধীরে তার চেতনা লোপ পেতে শুরু করে। অচেতন হওয়ার আগে তিনি কেবল জানতে পেলেছিলেন হাসপাতালে তার মেয়ের জন্ম হয়েছে।
আবুল হায়াতের কথায়, পাঁচ থেকে ছয় দিন তিনি ‘কোমায় ছিলেন’। ২৯ মার্চ যখন তার জ্ঞান ফেরে, তখন ঢাকা শহর থমথমে। শ্বশুরবাড়ি রূপগঞ্জের বেরাইদ গ্রামে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পরিবার সেখানে চলে গেছে আগেই। বেরাইদে গিয়ে তিনি মেয়েকে প্রথম দেখেন জন্মের সাত দিন পর।
“আমাকে নৌকা থেকে নামাল কাঠের চেয়ারে করে, স্ট্রেচার তো নাই। আমাকে নামালো শ্বশুরবাড়ির উঠানে, কয়েক হাজার লোক জমা হয়ে গেছে, বলছে ‘জামাই আইছে জামাই আইছে!’ একটা হইচই পড়ে গেল। আমার মা কাঁদছে, শাশুড়ি কাঁদছেন, বউ কাঁদছেন। হঠাৎ আমার ফুফু শাশুড়ি এসে একটা বাচ্চা আমার কোলে দিয়ে বলল, ‘এই লও তোমার বিপাশা’।
“নামটা আমরা আগেই রেখেছিলাম যে যদি আমাদের মেয়ে হয় তাহলে এই নাম রাখব। সেই নামই রেখেছে তারা।”
লেখালেখির নেশা
অভিনয়কে পেশা আর লেখালেখিকে নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন আবুল হায়াত। এ পর্যন্ত ৪০টি বই প্রকাশিত হয়েছে তার। সেগুলোর মধ্যে স্মৃতিকথাও আছে।
তিনি মনে করেন, লেখালেখিটাই থেকে যাবে।
“চলচ্চিত্র থেকে যাবে। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, যেটা সবচেয়ে ভালোবাসি আমরা মঞ্চ, সে মঞ্চের কোনো কিছুই থাকবে না।”