Published : 21 Feb 2026, 04:24 PM
ভাষা আন্দোলনের আবহে নির্মিত রাজনৈতিক রূপকধর্মী চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেওয়া' সিনেমার দৃশ্যধারণের সময় একুশের প্রভাতফেরির ভিড়ে মিশে অভিনয় করেছিলেন শিল্পীরা।
প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া মানুষেরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি সেখানে ক্যামেরা চলছে।
কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের অমর র্কীতি ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি নিয়ে এমন স্মৃতিচারণ করেছেন অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা।
সুচন্দা গ্লিটজকে বলেন, “শহীদ মিনারের দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারিতেই। আনোয়ার হোসেন, রোজী সামাদ, রওশন জামিল, শওকত আকবর, রাজ্জাক, বেবি জামান সবাই আমরা একসঙ্গে ছিলাম। শহীদ মিনারে অভিনয়ের সময় প্রভাতফেরিতে আমরা সবার সঙ্গে মিশে অভিনয় করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল সবাই আমাদের অভিনয়ের লোক।
“মানুষ প্রথমে কিছু টের পায়নি। পরে যখন বুঝল শুটিং হচ্ছে, আমরা গাড়িতে বসে শট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি হঠাৎ মনে হল গাড়ি ওপরের দিকে উঠছে। আমরা ঘাবড়ে গেলাম। তখন আনোয়ার ভাই হেসে বললেন, ‘এগুলো কিছু না, এগুলো জনপ্রিয়তা।’ মানুষ গাড়ি ধরছিল একটু দেখার জন্য। এখনো মনে হলে হাসি পায়।”

সিনেমা মুক্তি না দিতে পাকিস্তানি সরকার সে সময় নানা পাঁয়তারা করে, শুটিংয়ের সময় জহির রায়হানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নেওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টেও। পরে জনদাবির মুখে ছাড় মেলে সিনেমাটির।
সেই ঘটনা স্মরণ করে সুচন্দা বলেন, “শুটিং করছিলাম, একদিন আর্মি চলে এল। ওকে (জহির রায়হান) নিয়ে যাবে ক্যান্টনমেন্টে। আমরা সবাই হইচই শুরু করে দিলাম। জহির তাকিয়ে দেখলেন, আর চলে গেলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে এসে বললেন, ‘শুটিং শুরু কর’। পরে জেনেছি, ওরা বলেছিল, এই সিনেমা বানানো যাবে না। আর্মিদের এমন কথায় জহির রায়হান বলেন, ‘সেন্সর বোর্ড আছে, তারা নির্ধারণ করবে, এই সিনেমা মুক্তি দেওয়া যাবে কী না। আপনারা তো শুটিং আটকাতে পারেন না’।”
জহির রায়হানের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় রাষ্ট্রের অধিকার আদায়ের গল্পের সিনেমা 'জীবন থেকে নেয়া' মুক্তি পায় ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল। এর দুবছর আগে সুচন্দাকে বিয়ে করেন জহির রায়হান।
সিনেমাটি চিরচেনা পারিবারিক কাহিনীর আবহে নির্মিত হলেও এর ভেতরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও অধিকার আদায়ের প্রতীকী ভাষ্য ছিল। পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি দেখানো হয়েছে সিনেমায়। সিনেমার পোস্টারে লেখা ছিল একটি দেশ, একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন।
'জীবন থেকে নেয়া' সিনেমায় বড় বোন রওশন জামিল, স্বামী খান আতাউর রহমান, দুই ভাই শওকত আকবর ও রাজ্জাক, দুই ভাইয়ের বউ রোজী সামাদ ও সুচন্দা, বাড়ির গৃহপরিচারক এবং রোজী-সুচন্দার বড় ভাই রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে তৈরি।
এতে বড় বোনের চরিত্রে রওশন জামিলকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক হিসেবে রূপক অর্থে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। আর আনোয়ার হোসেন সে সময়ের জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, রাজ্জাক প্রতিবাদী বিদ্রোহী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি।
সিনেমায় ব্যবহৃত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’, ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানগুলো এখনো অমর হয়ে আছে। সংগীত পরিচালক ছিলেন খান আতাউর রহমান।