২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

নারীরা জীবনে কতটা, জানালেন ‘ডক্টর জি’ আয়ুষ্মান

“গৎবাঁধা বাণিজ্যিক সিনেমায় নারী নির্মাতাদের হয়ত তেমন কিছু করার নেই, কিন্তু যেখানে প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটানো সম্ভব, সেখানে নারীরা অনেক কিছু দিতে পারেন।”

নারীরা জীবনে কতটা, জানালেন ‘ডক্টর জি’ আয়ুষ্মান

ডক্টর জি সিনেমার পোস্টার

গ্লিটজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Oct 2022, 03:41 PM

Updated : 16 Oct 2022, 03:41 PM

বলিউড অভিনেতা আয়ুষ্মান খুরানার কাছে জীবন যেন ‘গুগলি’; বাস্তবে হতে চেয়েছিলেন অর্থপেডিক ডাক্তার, কিন্তু পর্দায় হয়ে গেলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ‘ডক্টর জি’! 

২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়টা তার গেছে স্বপ্নের মত। উপহার দিয়েছেন ‘বেরেলি কি বরফি’, ‘আন্ধাধুন’, ‘বাঁধাই হো’ ‘ড্রিম গার্ল, ‘বালা’র মত হিট সিনেমা। আবার ভিন্ন ধারার কিছু সিনেমা করে ফ্লপের খাতাতেও আয়ুষ্মান খুরানার নাম আছে। 

সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘ডক্টর জি’তে আবারও আলোচনায় এনেছে এই নায়ককে। সিনেমাটি মুক্তির পর টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নারী নির্মাতাদের কাজের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছেন।

নতুন-পুরনো পরিচালকদের কাজের ধরনে পার্থক্যগুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নিজের জীবনে নারীদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন আয়ুষ্মান খুরানা।

Image

ডক্টর জি সিনেমার একটি দৃশ্যে আয়ুষ্মান খুরানা

প্রশ্ন: ব্যতিক্রমী সিনেমা 'ভিকি ডোনারে' স্পার্ম ডোনারের চরিত্র করার পর পেরিয়েছে ১০ বছর, এখন আপনি 'ডাক্তার জি' হয়ে ব্যস্ত শিশু প্রসব করানোর কাজে। জীবনের এই বৃত্তে কি তবে পূর্ণতা এল? বেশ বোঝা যাচ্ছে, আপনি সিরিয়াস সিনেমার জন্য নিজেকে গড়েপিটে নিচ্ছেন।

খুরানা: আমি বিশ্বাস করি, সিনেমা পরিবর্তন আনতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকে আমার প্রথম ছবি 'ভিকি ডোনারে' কাজ করা। এরপর থেকে আমার অক্লান্ত পথচলা। যখন কোনো সিনেমা কোনো বিশেষ বার্তা ছড়িয়ে দিতে তৈরি হয়, তখন সেটি বেশি গ্রহণযোগ্য হয় বলেও মনে করি। এবং হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমার জীবন একটি পূর্ণ বৃত্ত এঁকেছে। একজন চিকিৎসকের ভূমিকায় নিজেকে দাঁড় করানোর সুযোগ পেয়েছি, সেটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। এ ধরনের বিষয় সবসময়ই আমাকে আকর্ষণ করে।

প্রশ্ন: ডক্টর জি-তে আপনাকে দেখা গেছে ড. উদয় গুপ্ত চরিত্রে, জেন্ডার প্রশ্নে যার ধ্যান-ধারণা গতানুগতিক। কিন্তু বাস্তব জীবনে আপনি ওই ঘরানা থেকে অনেক দূরে। আপনার চারপাশের নারীরা আপনার জীবনে কী ধরনের প্রভাব রেখেছে সে বিষয়ে বলুন।

খুরানা: এটা আসলে নির্ভর করে আপনার চারপাশের নারী এবং পুরো পরিবেশের উপর। খোলাখুলি না বললে ঠিক বোঝাও যাবে না। আমার ঠাকুমা একজন খাঁটি শিল্পী ছিলেন এবং গান গাইতেন গুরুদুয়ারায়। শিল্পের নানা মাধ্যমে তার আগ্রহ ছিল। তার আগ্রহ ছিল সিনেমার প্রতি। ঠাকুর্দা কঠোর ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন, কিন্তু ঠাকুমা তার পাঁচ ছেলেকে সিনেমা দেখাতে হলে নিয়ে যেতেন। অভিনেতা রাজ কাপুর এবং দেবানন্দের বিরাট ভক্ত ছিলেন, তাদের অভিনয় অনুকরণ করে দেখাতেন, ওই সময়ে নারীরা এসব কথা ভাবতেও পারতেন না। বলা যায়, তিনি তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।

এবার আসি আমার মায়ের কথায়, তিনি আমাকে হিন্দি শিখিয়েছিলেন। আমাকে স্কুল-কলেজে পড়ার সময় বিতর্কে অংশ নিতে আগ্রহী করে তুলতেন। এরপর জীবনে আসে তাহিরা (স্ত্রী)। সে রীতিমত তার কায়দায় আমাকে ভদ্রলোক করে তুলতে উঠেপড়ে লাগে। আমার জীবনে এই তিন নারীর ভূমিকা অসামান্য, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন: আপনি এ বছর হিন্দি সিনেমায় এক দশক পূর্ণ করেছেন। আপনার যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগে একজন থিয়েটার শিল্পী হিসেবে। পরে আরজে, টিভি রিয়েলিটি শোয়ের সেলিব্রেটি অতিথি এবং সবশেষে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে আপনাকে দেখা যায়। এই যাত্রার মধ্য দিয়ে আপনি নিজের কোন বিষয়টি অপরিবর্তিত দেখতে পান।

খুরানা: আমি মনে করি মূল জায়গা থেকে আমার বিচ্যুতি ঘটেনি। প্রথম জীবনে সামাজিক সমস্যাকে উপজীব্য করে নির্মিত প্রচুর থিয়েটার করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার সিনেমাগুলো থিয়েটারেরই বৃহত্তর সংস্করণ। প্রাসঙ্গিক, বিষয়ভিত্তিক, যা মানুষের কাছাকাছি। সেইসব কাজকে বেছে নেওয়ার বোধ তৈরি হয়েছে থিয়েটার থেকে। আমি মনে করি, আমি চণ্ডীগড়ের সাধারণ একটি ছেলে। নিজেকে নিয়ে আড়ম্বরে রাজি নই। জানি, সিনেমা পেশাটির সঙ্গে অনেক অলঙ্কার জড়িত। কিন্তু সেসব থেকে দূরে থাকতে চাই।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, নির্মাতা আপনার মধ্যে একধরনের স্ফূলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন, যিনি নানান বাধা বিনা প্রশ্নে ঠেলে নিয়ে এগিয়ে যাবেন, যা বেশিরভাগ বাণিজ্যিক অভিনেতাই করতে সাহস পাবেন না। নির্মাতাদের উদ্যোগ আপনাকে একটি স্বতন্ত্র স্থান তৈরিতে সহায়তা করেছে কি?

খুরানা: সবসময় নিজেকে প্রথাগত অভিনেতা ভাবিনি। মনে মনে বলতাম, আমাকে অপ্রচলিত ধারায় এগোতে হবে। তাহলে শুরুর কথা বলতে হয়। যখন আমি একজন সঞ্চালক এবং রেডিওতে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলাম, তখনই আমার শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। ওই কাজগুলো আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মনে আছে, আমি যখন 'ভিজে' ছিলাম, ছয়টি সিনেমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ তাতে 'অহঙ্কারী' হিসেবে আমার বেশ দুর্নাম রটে। কিন্তু আমার চিন্তা ছিল, যদি আমি কাজ বাছাই করতে ভুল করি, তাহলে দ্বিতীয় সুযোগ আমার জীবনে আর আসবে না। তাই পরিকল্পনা ছিল, প্রথম কাজ যেন অবশ্যই মনে রাখবার মত হয়। আমি আনন্দিত যে 'ভিকি ডোনার' এর মত চরিত্র আমি পেয়েছি। ওই সিনেমাটি অবশ্যই আলাদা কিছু।

প্রশ্ন: ডক্টর জি সিনেমার মধ্য দিয়ে আপনি তৃতীয়বার কোন নারী নির্মাতার সঙ্গে কাজ করলেন। যদিও কাজের ভালো-মন্দের মাপকাঠিতে নারী-পুরুষ কোন সূচক হতে পারে না। তবুও আপনার কি মনে হয় না, ক্ষেত্রবিশেষে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো তফাৎ তৈরি করে, অন্তত কোনো কোনো বিষয়ে? 

খুরানা: একজন পরিচালকের পরিচয় শুধুই একজন পরিচালক। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা হল, একজন নারী নির্মাতা ইন্ডাস্ট্রির জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসেন। আমি মনে করি প্রগতিশীল কাজে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বেওয়াকুফিয়ান সিনেমায় নুপূর আস্থানা, বরেলি কি বরফিতে অশ্বিনী আইয়ারতিওয়ারি এবং ডক্টর জিতে অনুভূতি কাশ্যপ, এক কথায় তারা অসাধারণ। বলেই ফেলি, বাণিজ্যিক সিনেমায় নারী পরিচালকদের তেমন কিছু করার নাই। কারণ সেখানেতো গৎবাঁধা কাজকর্ম। কিন্তু ডক্টর জি-এর মত সিনেমা, যেখানে প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটানো সম্ভব, সেই ময়দান শুধুই নারীদের দখলে থাকাটাই শ্রেয়।

প্রশ্ন চরিত্রের প্রয়োজনে আপনি অনেক সময় নিজেকে ভেঙেছেন, যেমন চুল ঝরে যাওয়া সমস্যা নিয়ে মাথায় টাক নিয়ে আপনাকে দেখা গেছে। আরেকটি সিনেয়া নারীর ছদ্মবেশ নিয়ে চলা এক চরিত্রেও দেখা গেছে। এবং এই সিনেমাগুলোর সবই ওটিটিতে নয়, মূলধারার কাজ ছিল। সেই অর্থে পছন্দ এবং চিন্তাভাবনায় আপনি কি সমসাময়িকদের তুলনায় এগিয়ে?

খুরানা: আমার ধারণা, লেখকদের প্রতি আস্থার বিষয়টি আমার প্রথম কাজেই প্রকাশ পায়। চিত্রনাট্যকাররা আমাকে ব্যতিক্রমী ভাবতে শুরু করেন। ২০১৭ সাল থেকে দুর্দান্ত সব গল্প আমি পেতে শুরু করি। আমি মনে করি, তারা (চিত্রনাট্যকার) আমার কথা মাথায় রেখে লিখতে শুরু করেন এবং আস্থা ছিল কাজটি হয়ত আমাকে দিয়ে হবে। আরেকটি বিষয়, আমার বেশিরভাগ হিট সিনেমার পরিচালকও নতুন ছিলেন। আমি ঝুঁকি নিতে এবং নতুন প্রতিভা নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। নতুন কারও সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি আমাক সেরাটা দেওয়ার অনুপ্রোরণা যোগায়।


প্রশ্ন: এবং তারা নির্ভয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ শুরু করেন, তাইতো?

খুরানা: আমার কাজের ধারা হল ‘নির্ভীকতা’ এবং নতুন পরিচালকে বেছে নেওয়া। আপনি যত বেশি সাফল্যের সিঁড়ি আরোহণ করবেন, ভবিষ্যৎ কাজ নিয়ে তত ভীত হয়ে উঠবেন। নবাগতরা সেদিক থেকে নির্ভার থাকেন।

প্রশ্ন: আপনার কথায় মনে হচ্ছে ব্যতিক্রমী ধারার সিনেমায় সাফল্য আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

খুরানা: আমি অবশ্যই রোহিত শেঠি, জয়া আখতার এবং রাজু হিরানির মত নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ করতে চাই। কিন্তু নতুন নির্মাতাদের কাছ থেকে আমি সবসময় ভালো চিত্রনাট্য পেয়েছি। কিছু সিনেমা, যেমন ‘আন্ধাধুন’. ‘আর্টিকেল ১৫’– এগুলো জীবনের অদেখা ছবি দেখিয়েছে। দুই/তিনটা কাজের পরই আমার মনে হয়, গণ্ডি থেকে বের হতে হবে। সেই চেষ্টাই করি। নার্ভাস হয়ে যাই কিন্তু সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ।