চিশতী বাউল কেন প্রতিযোগী হয়ে রিয়েলিটি শোতে?

“আমি বাউল মানুষ হঠাৎ করে মনে চাইছে, গেছিলাম। আবার মনে চাইছে, আইস্যাও পড়ছি,” বললেন এই শিল্পী

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Sept 2022, 06:00 PM
Updated : 23 Sept 2022, 06:00 PM

‘যদি থাকে নসিবে’, ‘বেহায়া মন’সহ বেশ কিছু গানে পরিচিতি পাওয়া চিশতি বাউলকে দেখা গেছে গানের রিয়েলিটি শো ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’য়; যা দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকে।

এই শিল্পীর ভাষ্য, অনেকেই তার গানগুলো ‘ভুল’ সুরে গাইছে। তাই এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজে গেয়ে ভুল শুধরে দেওয়ার ইচ্ছা থেকেই ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানায় তার অংশগ্রহণ।

৫৭ বছর বয়সী চিশতির পুরো নাম শামসেল হক চিশতী। তিনি বর্তমানে থাকেন সাভারে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তার পরিচিতি আছে।

বছর তিনেক আগে কলকাতার টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলায় গানের রিয়েলিটি শো ‘সা রে গা মা পা’র মঞ্চে অতিথি শিল্পী হিসেবে চিশতী বাউলের উপস্থিতি তাকে আরও পরিচিত করে তোলে। এছাড়া আন্তর্জাতিক লোকগীতি উৎসবসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গান করেছেন তিনি।

সেই চিশতী বাউল এবার প্রতিযোগী হয়ে অংশ নিয়েছেন মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত রিয়েলিটি শো ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’য়। শোতে বাউল শিল্পীর ছবি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। কেউ কেউ বিচারকদের নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, আবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

চিশতী বাউল টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন কি না- এমন প্রশ্নও এসেছে তার ছবি ঘিরে।

প্রতিযোগী হিসেবে ম্যাজিক বাউলিয়ানায় কেন অংশগ্রহণ করছেন, সেই প্রশ্নে চিশতী বাউল গ্লিটজকে বলেন, “আমি বাউল মানুষ হঠাৎ করে মনে চাইছে, গেছিলাম। আবার মনে চাইছে, আইস্যাও পড়ছি।

“অনেক দিন থেইক্যাই আমার গান এসব অনুষ্ঠানে ভুল সুরে গাওয়া হয়। আমার কাছে মনে হইছিল, সেখানে গিয়া যদি আমি নিজে গানগুলো গাই। তখন সারা দেশের মানুষের কাছে সঠিক কথা-সুরে গানটা ছড়াইব।”

কোনো ধরনের আর্থিক প্রলোভনে সেখানে যাননি বলেও জানান চিশতী বাউল।

অনেকে লিখেছেন, চিশতী বাউল তো লোকসংগীতের এই প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে থাকার কথা, তিনি কেন প্রতিযোগীর আসনে?

চিত্রশিল্পী চারুপিন্টু তার ফেইসবুকের ওয়ালে লিখেছেন, “চিশতি বাউলকে বিচারকের আসনে বসিয়ে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারত। আমি ধিক্কার জানাচ্ছি।”

মাছরাঙা টেলিভিশনে ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র চতুর্থ আসর চলছে। এই সিজনে বিচারক হিসেবে আছেন বাউল শফি মণ্ডল, শাহনাজ বেলী ও আরিফ দেওয়ান।

সারা দেশের ৫০ হাজারের বেশি প্রতিযোগী অংশ নেন, সেখা থেকেবাছাই করে মূল পর্বে আছেন ১৮ জন শিল্পী। এর মধ্যে ছয়জন করে তিনটি গ্রুপে সাজানো হয়েছে স্টুডিও রাউন্ড। তারই একটি গ্রুপে ছিলেন চিশতি বাউল।

বিষয়টি নিয়ে গ্লিটজ কথা বলেছে ম্যাজিক বাউলিয়ানার প্রযোজক ও বিচারকদের সাথেও। প্রযোজক সাইফুল ইসলাম গ্লিটজকে বলেন, “চিশতী বাউল প্রতিযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তিনি বিচারকদের বিচারে সেরা ১০ থেকে বাদ পড়েছেন।”

বিচারক শফি মণ্ডল অবশ্য বলছেন, চিশতী বাউলকে বাদ দেওয়া হয়নি। তাকে বুঝিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে সরে যেতে বলা হয়েছে।

“চিশতী বাউলকে বিচার করার যোগ্যতা আমার নেই। উনাকে প্রতিযোগিতায় দেখার পর থেকেই উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছি, আপনি এখানে কেন? তখন উনি আমাকে বলেছেন, যে তার গানগুলো অনেকে ভুল সুরে গায়। এজন্য তিনি এসে ভেতর থেকে দেখতে চেয়েছেন।”

চিশতী বাউলকে আয়োজকরা যথেষ্ট ‘সম্মান’ দিয়েছেন মন্তব্য করে শফি মণ্ডল বলেন, “উনি যখন প্রাথমিক পর্বে আসেন। তখন উনাকে দেখে সবাই প্রথমে ভেবেছিল, উনি হয়ত কোনো প্রতিযোগী নিয়ে এসেছেন। পরে উনি বললেন, নিজেই নাকি প্রতিযোগী। তখন সবাই একটু অবাক হয়ে যায়। সবাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এটা তার জায়গা না। তিনি আরো বড় মানুষ। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা।

“তিনি প্রতিযোগিতায় থাকতে চান। প্রতিযোগিতার নীতিমালা অনুযায়ী কেউ আসতে চাইলে তো তাকে না করার সুযোগ নাই। পরে তাকে প্রতিযোগিতায় নেওয়া হয়।”

চিশতী বাউলকে ‘গুণী’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে শফি মণ্ডল বলেন, “আমি যখন উনাকে প্রতিযোগির আসনে প্রথম দেখি, দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছি। অনেকবার বুঝিয়ে বলেছি, এটা আপনার জায়গা না। উনি তখন বলছেন, এর শেষ পর্যন্ত থাকতে চান।”

প্রতিযোগিতার একটি পর্বের ভিডিওতে দেখা যায় চিশতী বাউলের গান শেষ হওয়ার পর শফি মণ্ডল বলছেন, “আপনাকে বিচার করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি সর্বোচ্চ নাম্বার আপনাকে দেব।”

সেই পর্বে শাহনাজ বেলীও ছিলেন বিচারকের আসনে। এছাড়া কণ্ঠশিল্পী ইবরার টিপু প্রতিযোগীদের মাইক্রোফোনের ব্যবহার নিয়ে একটি গ্রুমিং সেশন করানোর সময়ও দেখা যায়, প্রতিযোগীদের সাথে বসে আছেন চিশতী বাউল।

শফি মণ্ডল বলেন, “এই প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী সেরা ১০-এ যখন আসবেন, তখন প্রতিযোগীকে বিভিন্ন রকম গান গাইতে হবে। চিশতী বাউলের মেধা নিয়ে তো আমাদের কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু সব রকম গান গাইতে গেলে উনি কতটা পারবেন, সেটাও বিবেচ্য।

“যেমন আমাকে যদি অন্য ধারার গান করতে বলা হয়, আমিও পারব না। বিষয়টি চিশতী বাউলকে বুঝিয়ে বলা হয়েছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক